অনয়্যে গম আছননি?' প্রধানমন্ত্রীকে চট্টগ্রামবাসী

অনয়্যে গম আছননি?' প্রধানমন্ত্রীকে চট্টগ্রামবাসী
ছবি: সংগৃহীত
এম. মতিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো।।দীর্ঘ ১০ বছর পর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠের জনসভায় বক্তব্য দিতে এসেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সমবেত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেরা ক্যান আছন, গম আছননি?’ 'তোয়ারারল্লাই আঁরতে পেট পুরের। ইতেল্লাই আইসিদি।’
এসময় জনসভাস্থল থেকে সমোস্বরে নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রীকে জবাব দেন, 'আঁরা গম আছি, অনয়্যে গম আছননি? তখন মঞ্চ, অডিয়েন্সজুড়ে হাসি ও আনন্দের রোল পড়ে। পরে প্রধানমন্ত্রী শুরু করেন তাঁর বক্তব্য। 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এই চট্টগ্রামের সাথে আমার অনেক স্মৃতি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন সমাবেশ করতে পারিনি। তাই আপনাদের কাছে ছুটে আসলাম। এই স্মৃতিময় চট্টগ্রামে আমরা বারবার ছুটে আসতাম। আমার বাবা যখন জেল থেকে মুক্তি পেতেন আমাদের নিয়ে চট্টগ্রামে বেড়াতে আসতেন। আর ‘চট্টগ্রামে আসলেই ছুটে যেতাম এম এ আজিজ চাচা, জহুর আহমেদ চাচার বাসায়। এখন তারা নেই। সব এখন স্মৃতি।'
রবিবার (৪ ডিসেম্বর) দুপুর ৩ টা ৪৫ মিনিটে নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে চট্টগ্রাম নগর উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আ. লীগের উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে এসব কথা বলেন আ.লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান বিমানবাহিনী- সেনাবাহিনীর হাজার হাজার অফিসারকে হত্যা করেছে। শুধু তাই নয় আ. লীগের অনেক নেতাকর্মীকেও হত্যা করেছে। আ. লীগের মৌলবী সৈয়দকে তুলে নিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন করে হত্যা করেছে। ঠিক একইভাবে খালেদা জিয়াও তার আমলে আ. লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর এই চট্টগ্রামের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। সারা দেশেই এই তাণ্ডব চালিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। অনেক লাশ গুম করেছে। আমি তাদের সবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।’
তিনি আরও বলেন, বিএনপির দুই গুণ, ভোট চুরি আর মানুষ খুন। ‘খালেদা জিয়ারা পারে মানুষ হত্যা করতে। আমরা উন্নয়ন করি, আর বিএনপি মানুষ খুন করে। এই চট্টগ্রামেও বিএনপি বারবার বোমা ও গ্রেনেড মেরেছে। বিএনপি মানুষের শান্তি চায় না। আ. লীগ শান্তিতে বিশ্বাস করে। তাই আ. লীগ ক্ষমতায় আসলে জনগণ শান্তিতে থাকে।
তিনি বলেন, বিএনপি ভোটে যেতে চায় না। জিয়াউর রহমান যেমন জাতির পিতাকে হত্যা করে, সংবিধান লঙ্ঘন করে, সেনা আইন লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল করেছিল। ওদের ধারণা ওই ভাবেই তারা ক্ষমতায় যাবে। গণতান্ত্রিক ধারা তারা পছন্দ করে না। ওরা তা ভুলে গেছে, খালেদা জিয়া ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জনগণের ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিল। আর ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিল বলেই তাকে বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেয়নি। সারা বাংলাদেশ ফুঁসে উঠেছিল। দেড় মাসও ক্ষমতায় ঠিকতে পারেনি, পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের মনে রাখা উচিত, জনগণের ভোট যদি কেউ চুরি করে বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেয় না।
তিনি আরও বলেন, ১০ ডিসেম্বর বিএনপির খুব প্রিয় তারিখ।এ জন্যই তারা ওইদিন ঢাকায় সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১০ ডিসেম্বর নাকি তারা ঢাকা অচল করে দেবে। আর আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করবে। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর এ দেশে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মিশন শুরু হয়েছিল। ১০ ডিসেম্বর সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে যায়। পরে তাদের হত্যা করা হয়। অর্থাৎ, এই দিনে বুদ্ধিজীবী হত্যার মিশন শুরু হয়। এ কারণেই এই তারিখটা বিএনপির এত প্রিয়।
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আপনাদের কাছে এই বিজয়ের মাসে আমি উপহার নিয়ে এসেছি। কিছুক্ষণ আগে ২৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন, ৬টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছি। বিজয়ের মাসে চট্টলাবাসীর জন্য এটা আমার উপহার।
নগর আ. লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী সভাপতিত্ব ও  নগর আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঞ্চালনায় এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পাশে ছিলেন আ. লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ভূমিমন্ত্রী সাইফুইজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেল, দক্ষিণ জেলা আ. লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ এমপি ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান।
এর আগে সকালে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে ৮৩তম বিএমএ দীর্ঘ মেয়াদি কোর্সের কমিশন উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ-২০২২’ এ যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে তিনি হেলিকপ্টার যোগে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে নামেন। সেখান থেকে সিআরবি হয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠে আসেন। মাঠে এসেই ২৯টি প্রকল্পের উদ্বোধনসহ ৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। 
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে মুনাজাত পরিচালনা করেন জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের খতিব।
এদিকে আ. লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় যোগ দিতে সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা পলোগ্রাউন্ডমুখী জনস্রোতে যুক্ত হয়েছেন। ভোরের আলো ফুটতেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আ. লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রং বেরংয়ের টি শার্ট ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে জনসভাস্থলে এসে অবস্থান নিতে থাকেন। এসময় স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠে জনসভাস্থল ও চট্টগ্রামের রাজপথ।
অন্যদিকে জনসভাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। জনসভাস্থলসহ পুরো চার কিলোমিটার এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। বসানো হয়েছে বড় পর্দার মনিটর। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বিটিভিসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে। 
চট্টগ্রাম মহানগর আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, আমরা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছি। পুরো পলোগ্রাউন্ড মাঠসহ আশপাশের এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো আছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে আছেন। কেউ নিয়ম ভাঙলে আমরা সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারব। এখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক আছে। সুশৃঙ্খলভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতাকর্মীরা মিছিলসহকারে মাঠে প্রবেশ করছেন। জনসভা সফল করতে আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নগরজুড়ে এখন সাজসাজ রব উঠেছে। 
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, আজ ৪ ডিসেম্বর পলোগ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাকে ঘিরে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে সাড়ে ৭ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে। এরমধ্যে পলোগ্রাউন্ড মাঠসহ পুরো চট্টগ্রাম মহানগরে আমাদের ৬ হাজার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে। নিরাপত্তার বিষয়টি আরো জোরদার করতে বাইরে আরো দেড় হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে। 
উল্লেখ্য, সবশেষ ২০১২ সালের ২৮ মার্চ পলোগ্রাউন্ড মাঠে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের মহাসমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ১০ বছর ৯ মাস পর একই মাঠে আজ আবার তিনি উপস্থিত হয়ে ভাষণ দেন। এবারের প্রধানমন্ত্রীর জনসভার মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকার আদলে ৮৮ ফুট প্রস্থ ও ১৬০ মিটার লম্বা। এই মঞ্চে একসঙ্গে ২০০ অতিথি বসার ব্যবস্থা রয়েছে।