ঈদকে সামনে নিয়ে তৎপর ‘জাল টাকার চক্র’

ঈদকে সামনে নিয়ে তৎপর ‘জাল টাকার চক্র’
ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেট অফিস: পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সিলেটে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল টাকার চক্র। রমজানের আগে গোপন সংবাদের ভিত্তিত জাল টাকার কারবারি কয়েকজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাব-পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে সিলেট বিভাগে জাল টাকার কারবারিদের একাধিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তালিকা তৈরি করে এসব অসাধু কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, এই চক্রটি নিজেদের নেটওয়ার্কের লোকজনের মাধ্যমে গোটা বিভাগে জাল নোট ছড়িয়ে দেয় এই কারবারের সাথে জড়িতরা। এজন্য তারা বিভাগীয় ও জেলা শহরের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রকে টার্গেট করে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে। নানা কৌশলে তারা জাল নোট দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে।
জাল নোটের কাগজ তারা কখনো দেশের বাইরে থেকে নিয়ে আসে, আবার কখনো দেশ থেকেই সংগ্রহ করে তারা। এরপর বাসা-বাড়িতে গোপনে নোট ছাপিয়ে তা এজেন্টদের মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দেয়।


গ্রেফতার জাল নোট কারবারী ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাল নোট তৈরির জন্য প্রথমে টিস্যু কাগজের এক পার্শ্বে বঙ্গবন্ধ‚র প্রতিচ্ছবি স্ক্রিনের নিচে রেখে গাম দিয়ে ছাপ দেয়। এরপর ১০০০ লেখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের ছাপ দেয়। অতপর অপর একটি টিস্যু পেপার নিয়ে তার সাথে ফয়েল পেপার থেকে টাকার পরিমাপ অনুযায়ী নিরাপত্তা সূতা কেটে তাতে লাগিয়ে সেই টিস্যুটি ইতোপূর্বে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি জলছাপ দেয়া টিস্যু পেপারের সাথে গাম দিয়ে সংযুক্ত করে দেয়। এভাবে টিস্যু পেপার প্রস্তুত করে বিশেষ ডট কালার প্রিন্টারের মাধ্যমে ল্যাপটপে সেভ করে রাখা টাকার ছাপ অনুযায়ী প্রিন্ট করা হয়। ওই টিস্যু পেপারের উভয় সাইট প্রিন্ট করা হয় এবং প্রতিটি টিস্যু পেপারে মোট ৪টি জাল টাকার নোট প্রিন্ট করা হয়। এরপর প্রিন্টকৃত টিস্যু পেপারগুলো কাটিং গ্যাসের উপরে রেখে নিখুঁতভাবে কাটিং করা হয়। পরবর্তীতে কাটিংকৃত জাল টাকাগুলো বিশেষভাবে বান্ডিল করে এটি চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
এদিকে সিলেটে রমজান মাসের আগে র‌্যাব-পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে জাল টাকার চার কারবারি।জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
জানা যায়, গত ২২ মার্চ চুনারুঘাটের দেওরগাছ ইউনিয়নের কাচুয়া এলাকা থেকে ৩ লাখ টাকার জাল নোটসহ শফিকুর রহমান (৫৫) নামের এক কারবারিকে আটক করে র‌্যাব। শফিকুর রহমান চুনারুঘাটের গোবরখলার মৃত সিরাজ মিয়ার ছেলে।
র‌্যাব-৯ এর মিডিয়া অফিসার সোমেন মজুমদার জানান, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘ দিন ধরে সীমান্ত এলাকা থেকে জাল টাকা সংগ্রহ করে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে মানুষ মারাত্মকভাবে প্রতারণার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শফিকুর সেই চক্রের একজন সক্রিয় সদস্য।
র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে শফিকুর জানায়, ঈদ পূর্ববর্তী সময়ে এই প্রতারক চক্র বিশেষভাবে সক্রিয় থাকে। এ চক্রের সদস্যরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরকে টার্গেট করে জাল টাকা বানায় এবং বাজারে ছড়িয়ে দেয়। চক্রটি প্রতি ১ লক্ষ টাকার জাল নোট ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে।

এর আগে ২১ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে জাল নোট দিয়ে লেনদেনের খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে দুই যুবককে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলো- ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার বেলুয়া শ্যামপুরের তৈয়ব আলীর ছেলে মুন্না আহমদ ও সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শাহ সিকন্দর গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে সুজন আহমদ। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা সদৃশ্য ২১টি জাল নোট উদ্ধার করা হয়। গত ১৬ ফেব্রæয়ারি সিলেট সদরের তেমুখী সাহেবেরগাঁওস্থ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ভেতর থেকে পাঁচ হাজার টাকার জাল নোটসহ আবদুল আলীম শামীম নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশ। সে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শিমুলতলা নোয়াগাঁও’র মৃত আব্দুস সোবহানের ছেলে।
সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, ঈদকে সামনে রেখে যাতে জাল নোটের কারবারিরা মানুষকে প্রতারিত করতে না পেরে সে ব্যাপারে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। এই চক্রের উপর পুলিশের নজরদারি রয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার আজবাহার আলী শেখ জানান, রোজা ও ঈদ আসলে জাল টাকার কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। পুলিশের কড়া নজরদারির কারনে ইতোমধ্যে কয়েকজন ধরা পড়েছে। তাদের কাছে থেকে এই চক্রের ব্যাপারে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এই চক্রের সদস্যদের ধরতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।