ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর আদর্শে সমাজের আমূল পরিবর্তনে ঝাপিয়ে পরতে হবে

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর আদর্শে সমাজের আমূল পরিবর্তনে ঝাপিয়ে পরতে হবে
ছবিঃ সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি।।মো.নজরুল ইসলাম।।'বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চর্চা করি, নারীবান্ধব সমাজ গড়ি' এই স্লোগান কে ধারণ করে মানিকগঞ্জ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও বারসিক এর আয়োজনে গতকাল রাত ৯.৩০- ১১.০০ পর্যন্ত জুম প্লাটফর্ম এর মাধ্যমে সমাজ সংস্কারক ও বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর ২০১ তম জন্মদিন পালন করা হয়।

স্মরণ অলোচনা সভায় এ্যাডভোকেট দিপক কুমার ঘোষ এর সভাপতিত্বে ও বারসিক আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায়ের সঞ্চালনায়  প্রধান আলোচক ছিলেন চিকিৎসক আন্দোলনের নেতা বিশিষ্ট অর্থপেডিক্স ও সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডাঃ পঙ্কজ মজুমদার। আরো অংশগ্রহণ করেন লেখক ও ব্যাংকার রুহুল ইসলাম টিপু,  বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, ধর্মীয় নেতা এডওয়ার্ড জামান, সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান রাসেল, বিদগ্ধ পাঠক আলামিন,মীর নাদিম,মুক্তার হোসেন প্রমুখ।

বক্তারা বলেন- অধঃপতিত জাতির নাকি সবচেয়ে বড় লক্ষণ-
অকৃতজ্ঞতা। তার মহৎ সন্তানদের ভুলে যাওয়া। ফরাসীরা ভলতেয়ার রুশোকে মনে রাখে- তাদের কুসংস্কারের অন্ধকূপ থেকে বের হবার পথ প্রদর্শক হিসেবে। ইংরেজরা মনে রাখে প্রথম যুগের বেকনকে- যিনি পুরনো সব সংস্কার ভেঙে নিজের পর্যবেক্ষণের আলোতে বিশ্ব দেখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যে পথ ধরে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানের-বিজ্ঞানমনস্কতার। সেই পথেই তারা পেয়েছিল নিউটনকে। ইতালীয়রা মনে রাখে তাদের ভাষার জনক-দান্তে আর অন্ধযুগ ভেঙে দেওয়া গ্যালিলিওকে, দ্য ভিঞ্চিকে।      
আমাদেরও আছেন এমন পথ দেখানো পূর্বপুরুষ।বহুযুগের পুরনো অশিক্ষা আর অন্ধনিয়মের চক্র ভাঙতে শিখিয়েছিলেন তাঁরা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁদের একজন।সমাজ থেকে অনাচার কুসংস্কার দূর করতে তিনি ব্যয় করেছেন গোটা জীবন। যে বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের অহংকার- তার গদ্যশৈলীর জনক তিনি।তাঁর লেখা ‘বর্ণপরিচয়’ যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে সাক্ষর করেছে-নীতিবোধ শিখিয়েছে।
তিনিই প্রথম বাঙালি জাতির জন্যে শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করেন। শিক্ষক তো ছিলেনই। শিক্ষা উপকরণ তৈরি আর শিক্ষাকে  সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও  প্রথম তিনিই নেন।  সেকালে- পৌনে দু'শ বছর আগে রাস্তাঘাট যখন কল্পনামাত্র- বন বাদাড় হাঁটুকাদা ডিঙ্গিয়ে- জীবনে শত শত মাইল  তিনি হেঁটেছেন গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠায়।  


মেয়েদের শিক্ষার ধারণাও তিনিই প্রথম দেন- তারপর সারাজীবন ধরে চলেছে তাঁর সে ধারণার বাস্তবায়ন। নারী নিগ্রহ বন্ধে- বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে- নারী শিক্ষা বিস্তারে অক্লান্ত যোদ্ধার মতো যুদ্ধ করে গেছেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের সাথে। জাতি-বর্ণ-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রবল এক মানবতাবোধ জাগিয়ে দিতে চেয়েছেন বাঙালি জাতির মনে। 
অন্য জাতির সাথে এদেশের পার্থক্য এখানে যে- আমরা আলো দেখানো পূর্বপুরুষদের মনে রাখি না। উল্টো তাঁদের  নিয়ে কুতর্ক করার এক বিশেষ সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে দেশে। বাংলা ভাষাসূত্রে  আমরা বাঙালি। এই মৌলসূত্রে সাম্প্রদায়িক  ঘোলা জল মেশানোর কূট অভিপ্রায়ে তাঁরা প্রমিত ভাষা-এদেশি ভাষা, এপার-ওপার জাতীয় কুরঙ্গ কুনাট্যে তরুণদের নিরন্তর বিভ্রান্ত করে চলেছেন।এই ভাষার শ্রেষ্ঠসন্তানদের ধর্ম পরিচয় সামনে এনে নিজের মাতৃভাষার  ঐতিহ্য, গৌরবকে পর্যন্ত ভূলুণ্ঠিত করতে তাঁদের কোনো দ্বিধা নেই।
অথচ, তাঁর জীবনের শেষদিকে বর্ধমানে তখন ম্যালেরিয়া মহামারির আকার নিয়েছে। তখন কলকাতা থেকে ডাক্তার ওষুধ নিয়ে সেখানে বিদ্যাসাগর ছুটেছেন সেখানে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দ্বারে দ্বারে গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছেন। অসুস্থ মুসলমান বালককে কোলে নিয়ে শুশ্রূষা করেছেন। জাতিভেদের দেশে এমন বিশ্বজনীন প্রেমের উদাহরণ রেখে গেছেন তিনি।  এই সব নক্ষত্রের মতো নাম এদেশের মনন থেকে মুছে দেবার ষড়যন্ত্র চলছে শতধারায়। 
তাঁর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-
‘বিদ্যাসাগর চরিত্রের সর্বপ্রধান গুণ- যে গুণে তিনি পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালি জীবনের জড়ত্ব, সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া, হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে, করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।... বিদ্যাসাগর চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’
বাংলার নবজাগরণের অন্যতম এই স্থপতি -অক্ষয় মনুষ্যত্বের এই কাণ্ডারিকে দ্বিশতজন্মবর্ষের প্রণতি জানাই।