উত্তরায় ফিটনেস বিহীনক্রেন চালাচ্ছিলেন হেলপার, মূল চালক ছিলেন বাইরে

উত্তরায় ফিটনেস বিহীনক্রেন চালাচ্ছিলেন হেলপার, মূল চালক ছিলেন বাইরে
ছবি: সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট।। রাজধানীর উত্তরায় প্রাইভেটকারের ওপর নির্মাণাধীন বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার পড়ার ঘটনার সময় ক্রেনটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী রাকিব (২৩)।  আর বাইরে থেকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন মূল অপারেটর আল আমিন। অন্যদিকে ক্রেনটি ছিল ফিটনেসবিহীন।

র‌্যাব বলছে, তিন মাস পূর্বে বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে রাকিব হোসেন।
 তার ক্রেন চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছিল না। আবার মূল চালক আল আমিনের হালকা যান চালানোর লাইসেন্স থাকলেও ভারী যানের লাইসেন্স ছিল না।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ১০ জন হলেন মো. আল আমিন হোসেন হৃদয় (২৫), সহকারী রাকিব হোসেন (২৩), দুর্ঘটনাস্থলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ফোর ব্রাদার্স গার্ড সার্ভিসের ট্রাফিক ম্যান মো. রুবেল (২৮), মো. আফরোজ মিয়া (৫০), ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সেফটি ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলফিকার আলী শাহ (৩৯), হেভি ইকুইপমেন্ট সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ইফকন বাংলাদেশ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. ইফতেখার হোসেন (৩৯), হেড অব অপারেশন মো. আজহারুল ইসলাম মিঠু (৪৫), ক্রেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিল্ড ট্রেড কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার তোফাজ্জল হোসেন তুষার (৪২), প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা (৩৩) ও মো. মঞ্জুর ইসলাম (২৯)

রাজধানীর জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, কালশী, সাভার এবং গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাট থেকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০১৬ সালে ক্রেন চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর দুই-তিনটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করেন। পরে ২০২২ সালের মে মাসে বিআরটি প্রকল্পে ক্রেন অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। হেলপার রাকিব তিন মাস আগে প্রকল্পের ক্রেন হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার ক্রেন চালানোর কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। দুর্ঘটনার দিন দুপুর ২টায় আল আমিন ও রাকিব ক্রেন চালানো শুরু করেন। একটি গার্ডার স্থাপন শেষে ২য় গার্ডার স্থাপনের সময় ক্রেনের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ওজনের গার্ডার উত্তোলন করতে গেলে ক্রেনটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। তখন ক্রেনে থাকা গার্ডারটি প্রাইভেটকারের উপর পড়ে। দুর্ঘটনার পর অপারেটর আল আমিন ও হেলপার রাকিব ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

তিনি বলেন, ক্রেনের মূল অপারেটর আল আমিনের হালকা গাড়ি চালানোর অনুমোদন থাকলেও ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নেই।

গ্রেপ্তারদের বরাত দিয়ে খন্দকার আল মঈন বলেন, ইফসকন কোম্পানি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিজিজিসি হতে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য ওয়ার্ক পারমিট প্রাপ্ত হয়। গার্ডার বহনের ক্রেন উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিকট না থাকায় বিল্ড ট্রেডার্স নামক প্রতিষ্ঠান হতে অপারেটর ও হেলপারসহ উক্ত ক্রেনটি মাসিক চুক্তিতে ভাড়া নেয়। ইসকন এর স্বত্বাধিকারী গ্রেপ্তার ইফতেখার ও হেড অব অপারেশন মিঠু অপারেটরদের দক্ষতা ও যোগ্যতা ও ক্রেনের ফিটনেস যাচাই না করেই গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল সড়কে ভারী গার্ডার স্থাপনের কাজে নিয়োজিত করছিলেন। এছাড়াও গার্ডার স্থাপনের সময় অতিরিক্ত একটি সহায়ক ক্রেন উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তা ছিল না।

তিনি বলেন, থার্ড পার্টি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিল্ড ট্রেড ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড মাসিক ভাড়ার চুক্তিতে উক্ত ক্রেন সরবরাহ করে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার রুহুল আমিন এবং মার্কেটিং ম্যানেজার তুষার ক্রেনের ভাড়া প্রদান, চুক্তি, ড্রাইভার নিয়োগ; ক্রেনসমূহের ফিটনেস যাচাইসহ অন্যান্য দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। রুহুল ২০১০ সালে এবং তুষার ২০১৫ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানে যোগদান করে। তারা অতিরিক্ত লাভের জন্য অল্প পারিশ্রমিকে ভারী গাড়ি চালনার লাইসেন্স ব্যতিত অপারেটর আল আমিনকে নিয়োগ প্রদান করে। এছাড়াও উক্ত ক্রেনের সর্বশেষ ফিটনেস যাচাই করা হয়েছিল সর্বশেষ ২০২১ সালে। কিন্তু ২০২২ সালে ক্রেনের কোন ধরণের ফিটনেস যাচাই করা হয়নি বলে জানা যায়।

গ্রেপ্তার জুলফিকার সিজিজিসি এর বিআরটি প্রকল্পের সেফটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ২০২১ সালে যোগদান করে। সে মূলত এসএসসি পাশ। তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সেফটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার কোন ধরণের বর্ণিত ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক দক্ষতা নেই। সে প্রকল্পের বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা হতে উত্তরার আজমপুর এলাকা পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। দুর্ঘটনার দিনে ভারী গার্ডার স্থাপনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সে কোন ধরণের নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন, পর্যাপ্ত ট্রাফিক নিয়োগ প্রদান করেনি। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হওয়া সত্ত্বেও সে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডিএমপি ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা ব্যতিরেইে উক্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। গ্রেফতারকৃত মঞ্জুরুল সাড়ে ৩ বছর যাবত এই প্রতিষ্ঠানে প্রকিউরমেন্ট অফিসার হিসেবে কাজ করে আসছে। সে চাইনিজ ভাষায় দক্ষ হওয়ায় উক্ত কোম্পানির সাথে যোগাযোগ স্থাপন ঠিকাদারী কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা করে।

গ্রেপ্তার রুবেল ৩ মাস পূর্বে এবং আফরোজ গত মাসে ফোর ব্রাদার্স গার্ডস সার্ভিস ট্রাফিক ম্যান হিসেবে যোগদান করে। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক তাদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না। দুর্ঘটনার সময় তারা দুর্ঘটনাস্থলে প্রকল্পের ট্রাফিকম্যান হিসেবে নিয়োজিত ছিল বলে জানান খন্দকার আল মঈন।

গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান র‍্যাবের এই কর্মকর্তা।