একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী কমরেড বংশী বদন সাহা

একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী কমরেড বংশী বদন সাহা
ছবিঃ সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম (০১-০৯-২০২১)বাংলাদেশ জন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে মাইল ফলক হয়ে আছে গেল শতকরে ষাটের দশকটি। ্এই দশকেই এদেশের ছাত্র সমাজ গণবিরোধী শিক্ষা কমিশনের বিলটি বাতিলের দাবিতে আন্দালন গড়ে তোলে, এই দশকেই ধর্মবাদি পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যাবস্থার বিপরীতে ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তবাদের উন্মেষ ঘটে। এই দশকেই আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের ’ম্যাগনাকার্ট’ হিসেবে পরিচিত ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়। এই দশকেই গণঅভ্যুথানের মুখে প্রবল প্রতাপশালী শাসক আউব খান বিদায় নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনও বিস্তৃতি পায় এই দশকটিতে। সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ। তাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে ওঠে রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি।

সেই অগ্নিগর্ভের সময়কালে মানিকগঞ্জ সিংগাইর শহরে বিখ্যাত সাহা পরিবারে  ০৫ জুলাই ১৯৫৫ সালে স্বর্গীয় বংকেশ চন্দ্র সাহা ও প্রতিমা চন্দ্র সাহা এর ঘরে জন্মগ্রহন করেন কমরেড বংশী বদন সাহা।  
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ডানপিটে ধরনের। লেখাপড়[ায় বেশ মেধাবী ছিলেন। খেলাধুলা,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও তার সরব উপস্থিত ছিলো। তিনি সিংগাইর মডেল হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় শিশু সংগঠন খেলাঘর এর কর্মকান্ডে জরিয়ে পড়েন।বয়সে ছোট হলেও যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরিক্ষার্থী এবং  মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে তিনি বেশ আগ্রহী হলেও স্থানীয়রা তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ১৯৬৯ সালের পাকিস্তান বিরোধী উত্তাল গণ আন্দোলনের সময় একদিন সিংগাইর শহরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপ আয়োজিত একটি সমাবেশে বক্তৃতার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বাড়ি থেকে এগিয়ে রাস্তায় দাড়িয়ে নেতাদের বক্তৃতা শুনতে পান। কিছু কর্মী বিভিন্ন দাবি সম্বলিত হ্যান্ডবিল বিলি করছেন। বংশী বদন সাহা বলেন আমি একটি পেলাম পড়ে ভালো লাগলো এবং আরো কয়েকটি চেয়ে নিলাম বিলি করবো বলে তখন আমি ঐ কর্মীদের দৃষ্টিতে আসি। বিশেষ করে কৃষকনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড ডা: চিত্ত সাহা আমাকে ছারলো না। আমার সাথে গল্প করতে করতে আমাদের বাড়ীতে চলে এলা।কথায় কথায় আমার বাবা ও মায়ের সাথে একধরনের আত্মীয়তার পরিচয় হলো ও বেশ সখ্যতা গড়ে উঠলো। আমি ডা: চিত্ত সাহাকে বললাম আমাকে যদি মুক্তিযুদ্ধে নেন তাহলে আমি আপনাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন করবো। অন্যান্য নেতারা গরিমসি করলেও ডা: চিত্ত সাহা রাজী হলেন এবং আমি সিংগাইর অঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সকল কর্মকান্ড বাস্তবায়নের প্রতিশ্রতি দিলাম। পরে বুঝতে পারলাম যে কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ ছিলো তাই ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নই হলো রাজনীতির প্রধান নিয়ামক শক্তি।
এইভাবেই ডা: চিত্ত সাহার প্রেমে পড়েই বাম ধারার শেষনমুক্ত সমাজবিনির্মানের স্বপ্নের সাথে নিজের জীবন ও যৌবনকে উৎসর্গ করলাম। ডা: চিত্ত সাহা ছারাও আমার রাজনৈতিক আদর্শ ও আমাদের বাড়িতে আসতেন- এই অঞ্চলের প্রখ্যাত বামপন্থি আন্দোলনের পুরোধা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কমরেড সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী, নাবাগঞ্জ বালুখন্ডের ন্যাপ নেতা কমরেড জাহাঙ্গীর আলম, হরিরামপুর অঞ্চলের প্রথ্যাত কৃষক ও ক্ষেতমজুর নেতা ভাষা সংগ্রামী কমরেড আব্দুল খালেক মৃধা ও আমাদের রাজনীতি ও মার্কসবাদের অন্যতম শিক্ষক কমরেড প্রমথ নাথ সরকার।
এরই মাঝে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর সিংগাইর সরকারি কলেজে ভর্তি হই। চোখেমুখে সামাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেশায় লেখাপড়া ও ক্যারিয়ারের প্রতি কোন মৌহ ছিলনা  বলে একাডেমিক শিক্ষায় আর আগাতে পারিনি। তারপরও একদিন কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের বার্তা নিয়ে আসেন আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে শিক্ষিত মেধাবী ছাত্র নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আজাহারুল ইসলাম আরজু ও বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান হযরত ভাইয়ের সাথে তখনই ভালো করে পরিচয় হয়।হযরত ভাই আমাদের এলাকার ছেলে হলেও এতটা রাজনৈতিক সচেতন সেটি জানতাম না। অল্পসময়ের মধ্যেই তাদের প্রেমে পড়ে গেলাম। তারপর থেকেই আমি সার্বক্ষনিক কর্মী হিসেবে আরো শক্তিশালী হইলাম। ঢাকাসহ  মানিকগঞ্জে ন্যাপের সকল ধরনের সভা সেমিনারে যোগদান করতাম এবং এখনো করি। মানিকগঞ্জ সুবর্ণা এজেন্সি থেকে গাটসাটভাবে পরিচয় হয় ন্যাপের অন্যতম নেতা কমরেড ইকবাল হোসেন কচি ভাইয়ের সাথে। রাজনৈতিক উত্থান পতানসহ বৈশ্বিক পূজিবাদের ভয়ালো থাবায় অনেকের সাথেই সম্পর্কের রশি ছিরে গেলেও এখনো পর্যন্ত কচি ভাইয়ের সাথে সম্পর্ককটা শক্তভাবে ও গাটসাট ভাবেই আছে।
বামপন্থি রাজনীতিতে আমার জীবনে স্মৃতি ও ঘটনার শেষ নেই। একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো  ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের পর সারা দেশের মতো আমাদের সিংগাই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের নেতাকর্মীসহ সবাই নিরব নিস্থব্ধ হয়ে যায়। তারপরও আমরা পাঁচ অধম প্রতিবাদী মিছিল করি ও  বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই। এই আন্দোলনের সৈনিকরা হলেন-প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুর রহমান খান (বকচর,সিংগাইর), হাশেম আলী খান,(শাহরাইল), শাহাদত হোসেন মাস্টার (মানিকনগর),ইঞ্জিনিয়ার নুরুল ইসলাম ও একমাত্র জীবিত আমি অধম বংশী বদন সাহা।
আমাদের সিংগাইর অঞ্চলের ন্যাপের প্রিয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. ফজলুল হক খান এই অঞ্চলে ন্যাপ মনোনিত কুড়েঘরে নির্বাচনে করেন। সেই নির্বাচনে পোস্টার বিলি থেকে শুরু করে আমি ছিলাম সার্বক্ষনিক কর্মী আর আমাদের বাড়ী ছিলো লঙ্গরখানা। আমার মা ও আমার দাদী কখনই বিরক্তি হইতেন না বরং মানুষ সমাদর করে তারা আনন্দ পেতেন। 
কমরেড বংশী বদন সাহা আরো বলেন- সত্তরের দশকে আমাদের রাজনীতি ছিলো সবার উপরে। বামপন্থিদের নানা বিভেদের ফলে মধ্যপন্থি জাতীয়তাবাদী শক্তি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তারা বামপন্থিদেরকে বিভিন্ন কৌশলে ও চাপে রেখে বাকশালের ব্যানারে একিভুত করতে সফল হয়। ঐ সময়ই আমাদের বিপ্লব বেহাত হয়েছে বলে আমি মনে কিরি।।মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে বামপন্তিরা লাভবান হইতো এটাও আমি বিশ্বাস করি। তারপরও বাকশালের মধ্যে যে সমাজতান্ত্রিক ধারা ছিলো সেটিও কম নয়। দু:খজনক ঘটনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নানা ভুলের কারনে অকালে জীবন দিতে হলো এরং এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নেরও মুত্যু হলো। তারপর থেকেই অনাদির্শক চর্চা বিকশিত হইতে লাগলো। বর্তমানে অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদি প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলেও মৌলবাদি অন্ধকার শক্তিকে থামানো গেলো না বরং ডানপন্থি বামপন্থি ও মধ্যপন্থিদের নিয়ে জোটের রাজনীতি করে একটি নৈরাজ্য ও ফ্যাসিবাদি শাসন ব্যাবস্থা চলমান আছে।রাজনীতির সেই আনন্দ এখন আর নেই। আদর্শিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক চর্চা না থাকায়  বুর্জোয়া দলগুলো আরো বেপারোয়া  হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই নানা ঘটনাপ্রবাহে ন্যাপ কমিউনিস্টদের ভাঙ্গন  ধরে। বিশেষত সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের মাধ্যমেই আমারা বেশি আহত হই। কেন্দ্রে থেকে সংগঠন ভেঙ্গে গেলো কর্মীদের কান্না করা ছারা আরা কিছুই করার রইলো না। ন্যাপ কমিউনিস্টদের বেশিরভোগ  নেতা আওয়ামী ও বিএনপি শিবিরে প্রবেশ করেছে। আদর্শিক রাজনীতি ভাঙ্গনের সর্বশেষ পেরেক হলো ২০০৫ সালে  আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন  ১৪ দল গঠন। আমি শুরুতেই বলেছিলাম যে এই জোট জটে পরিনত হবে তাই হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা কিছু সুযোগ সুবিধা পেলেও  কর্মীদের অবস্থা খুবই খারাপ বুক ফুলিয়ে কথা বলার জো নেই। 
আগে অন্যায অনাচার শেষান বঞ্চনার বিরুধ্যে একাই বুক উচিয়ে কথা বলতাম। এখন জোটের  রাজনীতি করার কারনে  আর পরিনা। আমার যারা ওস্তাদ ছিলেন বেশিরভাগই মৃত্যুবরন করেছেন। সর্বশেষ ন্যাপের অন্যতম নোত বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড ফজলুল হক, কমিউনিস্ট নেতা এ্যাড আব্দুল হক ও এ্যাড.দিপক কুমার ঘোষদের বিএনপিতে ও আওয়ামীলীগে যোগদান আমাকে আরো আহত করে। সিংগাইর এর লুতফর রহমান ইলিচের গতিবিধিও ভালো না। আমারও শরীর আগের মতো তেজ নেই  কমিউনিস্ট পার্টি আজাহার ভাই ও হযরত ভাই খুবই অসুস্থ হওয়ায় আমি আরো আহত। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও আমরা কতেক প্রকৃত যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেও আমি এ্যাড.দিপক ঘোষ,অধ্যাপক জগদিশ চন্দ্র মালো ও মানিকগঞ্জের যুদ্ধকালীন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল সাহেবের ঘনিষ্ট বন্ধু গণফোরাম নেতা প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা কফিল মাসস্টারসহ অনেকেই এখনো তালিকাভুক্ত হইতে পারি নাই। এ কষ্ট আমরা কাকে বলবো,তারপরও স্বাপ্ন বুনি। নতুন প্রজন্মকে উজ্জিবিত করার মতো নেতার খুবই অভাব। এখন একধরনের হতাশা থেকেই বলতে হয় কাকে নিয়ে রাজনীতি করবো। তারপরও রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই আমি আসলে হতাশ নই মর্মাহত হই। আমি বিশ্বাস করি  মার্কসবাদ লেনিনবাদ সর্বশক্তিান। শত বাধা বিপত্তির মাঝেও বিশ্বের এ প্রান্তে থেকে ও প্রান্তে লাল পতাকা উড়ছে এবং লাল ঝান্ডার সংগ্রাম চলছে। গণমুখী দাবি নিয়ে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। একদিন আমাদের  সুদিন আসবেই এবং সামাজিক মালিকানার সমাজ বিনির্মান হবেই। জয় সমাজতন্ত্র জয় সর্বহারা।