ওসমানীনগরে বিষক্রিয়ায় প্রবাসী পিতা পুত্রের  মৃত্যু  রহস্যের শেষ কোথায়? 

ওসমানীনগরে বিষক্রিয়ায় প্রবাসী পিতা পুত্রের  মৃত্যু  রহস্যের শেষ কোথায়? 
ছবি: সংগৃহীত

শফিক আহমদ শফি।।প্রবাসী অধ্যূসিত সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় অচেতন অবস্থায় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী একই পরিবারের পাঁচজনকে উদ্ধারের পর বাবা-ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করেনি পুলিশ।

তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা তিনজনের মধ্যে ২ জনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) দুপুরে ওসমানীনগরের তাজপুর বাজারের স্কুল রোডের একটি বাসা থেকে একই পরিবারের ৫ যুক্তরাজ্য প্রবাসীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেয়ার পথে ২ জনের মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া দুজন বাবা-ছেলে।

তারা হলেন- ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের ধিরারাই (খাতুপুর) গ্রামের মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম (৫০) ও রফিকুলের ছোট ছেলে মাইকুল ইসলাম (১৬)। আর সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা রফিকুলের স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ছেলে সাদিকুলের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আর রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হুছনারা বেগম (৪৫) ও মেয়ে সামিরা ইসলাম (২০)-এর অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক মো. আবদুল গফফার।

তিনি বলেন- ‘অসুস্থ তিনজনের মধ্যে রফিকুলের বড় ছেলে সাদিকুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। বেশ কয়েকবার জ্ঞান ফিরেছে তার। তবে রফিকুলের স্ত্রী ও মেয়ের এখনো জ্ঞান ফেরেনি। তাদেরকে শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন- ‘বিষক্রিয়ায় তাদের এ অবস্থা হয়েছে কি-না, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট এক্সপার্টরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। আরও পরে বিস্তারিত বলা যাবে।’

এদিকে- ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে থানায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন সিলেট ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস.এম মাঈনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রবাসী পরিবারের বাবা-ছেলে মৃত্যুর ঘটনায় আজ (বুধবার) দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তবে স্বজনসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি। নিহত দুজনের লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

এ ঘটনায় পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ওসি।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করে আসছেন রফিকুল ইসলাম। অসুস্থ ছেলে মাইকুল ইসলামকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য গত ১২ জুলাই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দেশে এসে এক সপ্তাহ ঢাকায় থাকেন। চিকিৎসা শেষে গত ১৮ জুলাই উপজেলার তাজপুর স্কুল রোড এলাকার চারতলাবিশিষ্ট একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় বাসা ভাড়া নেন। সোমবার রাতের খাবার শেষে প্রবাসী রফিক মিয়া ও তার স্ত্রী সন্তানসহ ৫জন একটি কক্ষে এবং রফিকুল ইসলামের শ্বশুর আনফর আলী, শাশুড়ি বদরুন্নেছা, শ্যালক দেলোয়ার হোসেন, শ্যালকের স্ত্রী শোভা বেগম ও মেয়ে সাবিলা বেগম (৮) অন্যান্য কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন।

মঙ্গলবার সকালে বাসার সুস্থ স্বজনরা ডাকাডাকি করে প্রবাসী রফিকুল ইসলামসহ তার স্ত্রী-সন্তানরা ঘরের দরজা না খোলায় ৯৯৯ নম্বরে কল করেন। খবর পেয়ে দুপুর ১২টার দিকে ওসমানীনগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কক্ষের দরজা ভেঙে রফিকুল ইসলামসহ তার স্ত্রী হুছনারা বেগম, ছেলে মাইকুল ইসলাম, সাদিকুল ইসলাম ও মেয়ে সামিয়া ইসলামকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার রফিকুল ইসলাম ও মাইকুল ইসলামকে মৃত ঘোষণা এবং আশঙ্কাজনক অবস্থা হওয়ায় অসুস্থ তিনজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) প্রেরণ করেন।

এ ঘটনায় নিহত রফিক মিয়ার শ্বশুর আনফর আলী, শাশুড়ি বদরুন্নেছা, শ্যালক দেলোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী শোভা বেগম এবং বাসার কেয়ারটেকারসহ মোট ১২ জনকে মঙ্গলবার রাতে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। 
নিহত প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও তার ছেলে মাইকুল ইসলাম নিহত এবং পরিবারের অন্য তিন সদস্য বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার খবর পেয়ে নিহতের দুই ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম, বিজেকুল ইসলাম,বোন শাহীনা বেগম ও মা জরিনা বেগম গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত পিতা পুত্রের ময়না তদন্ত শেষে লাশ দুটি নিহতের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করেছে ওসমানীনগর থানা পুলিশ। নিহতদের লাশ আজ বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার দয়ামীর ইউপির বড় ধিরারাই গ্রামের তাদের পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন।

এদিকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ এ ভর্তি নিহত রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হুসনেআরা বেগম ও ছেলে সাদিকুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা ভাল রয়েছে তবে নিহত রফিকুল ইসলামের একমাত্র মেয়ে সামিরা ইসলামের অবস্থা আশংকাজনক অবস্থায় রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এদিকে গতকাল বুধবার দুপুর ১টার দিকে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মফিজ উদ্দিন পিপিএম তাজপুর স্কুল রোডে ঘটনাস্থলের বাসা পরিদর্শন করেন। এ সময় ডিআইজির সাথে ছিলেন, সিলেটের পুলিশ সুপার মো. ফরিদ উদ্দিন পিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওসমানীনগর সার্কেল রফিকুল ইসলাম ও ওসমানীনগর থানার ওসি এসএম মাঈন উদ্দিন।
সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মফিজ উদ্দিন পিপিএম বলেন, পুলিশ বিভিন্ন বিষয় মাথা নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। পরিবারের ভেতর থেকে কেউ বিষ প্রয়োগ করেছে নাকি বাহিরে থেকে কেউ বিষ প্রয়োগ করেছে সে বিষয়টি আমরা সর্বাধিক গুরত্ব দিয়ে দেখছি। এখন পর্যন্ত জানার মতো বড় ধরণের কোনো তদন্তের অগ্রগতি নেই। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনজনের মধ্যে দুইজনের অবস্থা ভাল আছে নিহতের একমাত্র মেয়ে সামিরার অবস্থা সংকটাপন্ন।
নিহত রফিকুলের যুক্তরাজ্যস্থ বাসবভন এলাকার কার্ডিফ শহরে তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যুক্তরাজ্য সহ বাংলাদেশ ওসমানীগরের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় দেখা দিয়েছে। তবে ঘটনা যাই হোক এর মুল  রহস্য উদঘাটন এখন সময়ের দাবী।