কক্সবাজারে এক পরিবারে ২০০ রোহিঙ্গা ! পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

কক্সবাজারে এক পরিবারে ২০০ রোহিঙ্গা ! পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
ছবিঃ প্রতিকীরূপে

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার, ১৯ জুন।। কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের ৮ নাম্বার ওয়ার্ডের একটি পরিবারেই প্রায় ২০০ জন রোহিঙ্গা নাগরিকের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যারা ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানে স্থায়ী বসবাস করেছে।

দুদকের তথ্য মতে, এসব ব্যক্তি মিয়ানমারের নাগরিক হয়েও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারী বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের সহযোগিতায় পেয়েছেন জাতীয়তা সনদপত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, ভূমিহীন প্রত্যয়নপত্র, স্কুলের প্রত্যয়ন। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন রোহিঙ্গারা। তাদের হাতে এখন স্মার্টকার্ড ও বাংলাদেশী পাসপোর্ট। অনেকে স্বপরিবারে থাকে প্রবাসে। সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরিও করছে তারা।
এ জাতীয় এনআইডি হাতিয়ে নেয়ার নেপথ্যে রয়েছে মূলত প্রধান চার চক্র। এরা হচ্ছে ইসির (ইলেকশন কমিশন) বিভিন্ন কার্যালয়, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দুর্নীতিবাজ কিছু সদস্য, অসৎ কিছু জনপ্রতিনিধি ও দালাল চক্রের সদস্য।
কক্সবাজার সদরের ইসলামাবাদ ইউনিয়নে জালিয়াতির মাধ্যমে ১৩ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশী পাসপোর্ট ও ভোটার আইডিকার্ড পেতে সহযোগিতার অভিযোগে ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা দায়ের করেছেন।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বাদী হয়ে ১৭ জুন মামলাটি দায়ের করেন। যার মামলা নং-১৪/২১।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২০১/০৯/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
এজাহারে প্রত্যেক আসামির অপরাধের ধরণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে, কক্সবাজার সদরের ইসলামাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুর ছিদ্দিক কিভাবে জন্মনিবন্ধন বই গায়েব করেছেন; রোহিঙ্গাদের সহায়তা করেছেন, তা স্পষ্ট বিবরণীতে এনেছেন মামলার বাদি।
মামলার আসামীরা হলেন, কক্সবাজার স্পেশাল ব্রাঞ্চে (এসবি) সাবেক ওসি, বর্তমানে রংপুর ডিআইজি অফিসের পুলিশ পরিদর্শক প্রভাষ চন্দ্র ধর, কক্সবাজার এসবির সাবেক পরিদর্শক, বর্তমানে পটুয়াখালীর পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) এস এম মিজানুর রহমান, কক্সবাজার এসবির সাবেক পরিদর্শক, বর্তমানে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. রুহুল আমিন।
রোহিঙ্গা নাগরিকদের মধ্যে আসামিরা হলেন- মো. তৈয়ব, মোহাম্মদ ওয়ায়েস, মোহাম্মদ ইয়াহিয়া, মোহাম্মদ রহিম, আবদুর রহমান, আব্দুস শাকুর, নুর হাবিবা, আমাতুর রহিম, আসমাউল হুসনা, আমাতুর রহমান, নুর হামিদা, মোহাম্মদ ওসামা ও হাফেজ নুরুল আলম।
এ মামলায় নির্বাচন কর্মকর্তা, তিনজন পুলিশ কর্ককর্তাকে আসামি করা হলেও বাদ পড়েছেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুর ছিদ্দিক। যেটিকে স্থানীয়রা বাদিপক্ষের ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখছেন।
তবে, এ বিষয়ে মামলার বাদি এডি মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুর ছিদ্দিক সম্পর্কে আরো তথ্য প্রমাণ নিবে। পরে প্রতিবেদনে যোগ করা হবে। সাধারণত: দুদক এরকমই করে।
রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশীদের নামে নকল পাসপোর্ট ও এনআইডি তৈরী করে সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সীলমোহর নিজ হেফাজতে রেখে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ সম্পাদন করার অভিযোগে ১৮ জুন কক্সবাজার 
র‌্যাব-১৫ এর একটি টীম কক্সবাজারের চকরিয়ায় অভিযান চালায়। এসময় গ্রেফতার করা হয়, চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের মাইজঘোনা এলাকার ৬নং ওয়ার্ড মৃত নুরুল কবিরের ছেলে মো. ওসমান গনিকে (৩০) আটক করা হয়।
র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী এ তথ্য জানান।
এর আগে চট্টগ্রামে ৬ মামলায় ৫৫ হাজার ৩১০ রোহিঙ্গা এনআইডি পেয়ে যাওয়ার ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। মামলা হয়েছে ৬টি । ইসি, পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৫১ জনের বিরুদ্ধে হয়েছে মামলা। চট্টগ্রামে বর্তমানে এ সংক্রান্তে আরও ১২টি মামলার জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 
দুদক সদর দফতরের একটি সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট অবৈধ পথে প্রাপ্তি সংক্রান্তে জালিয়াতি এবং এর সঙ্গে জড়িত সরকারী সংস্থাসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দালালচক্রের অর্জিত সম্পদের অনুসন্ধানও এগিয়ে চলেছে। 
দুদকের অনুসন্ধান মতে, এসব পুরাতন রোহিঙ্গারা ভুয়া নাম-ঠিকানায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভোটার হয়েছেন। তারা একজন অপরজনের পরিবারের সদস্য দেখিয়ে পাসপোর্ট নিয়েছেন। অবৈধ সুবিধা নিয়ে তাদের ভোটার ও পাসপোর্ট পেতে সহযোগিতা করেছেন কিছু বাংলাদেশী ব্যক্তি। এসব রোহিঙ্গাদের অনেকে আবার জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনাসহ সামাজিক কার্যক্রম করছেন।