কক্সবাজারে ৭২ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে মেগা দুর্নীতি!

কক্সবাজারে ৭২ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে মেগা দুর্নীতি!
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার, ৫ জুলাই।।কক্সবাজার এলএ শাখার সার্ভেয়ার আতিকুর রহমানকে শুক্রবার ২৩ লাখ টাকাসহ ঢাকায় গ্রেপ্তারের পর নতুন করে ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টি সামনে এসেছে। জেলায় সরকারের প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার ৭২টি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে জমির মালিকদের কাছ থেকে কমিশন বাণিজ্যসহ দুর্নীতি ও অনিয়মের। 

সার্ভেয়ার আতিকুর রহমানকে গ্রেপ্তার এবং তাঁর কাছ থেকে ২৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা জব্দ করার ঘটনায় মামলা হয়েছে। দুদক কক্সবাজার জেলার সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বাদী হয়ে কক্সবাজার স্পেশাল জজ আদালতে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার আবেদন করেন। মামলাটি রুজু করে ওই মামলার সার্ভেয়ার আতিক কে গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলা নং- স্পেশাল-৭/২০২২.দুদকের এফআইআর নং-১.। গত ৪ জুলাই মামলার বাদী  জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে এনে কার কার কাছ থেকে তিনি ওই টাকা নিয়েছেন, কীভাবে নিয়েছেন এবং ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যে জড়িত দালাল চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করবে দুদক।
এর আগে কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণে ‘ঘুষে'র টাকাসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন কয়েকজন। চাকরিচ্যুত দুদক কর্মকর্তা শরীফের তদন্তে উঠে এসেছিল অনেকের নাম।
২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব-১৫) সদস্যরা কক্সবাজার শহরে অভিযান চালিয়ে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার (এলএ) জরিপকারক বা সার্ভেয়ার ওয়াসিম উদ্দিন খান, ফরিদ উদ্দিন ও মো. ফেরদৌসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ঘুষে'র ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ৭ বস্তা ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নথিপত্র।
শুরু থেকে মামলাটির তদন্ত করছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। তিনি তদন্ত করতে গিয়ে কক্সবাজারের সাবেক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা বিজয় কুমার সিংহসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেন। মামলায় ৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। 
তাঁদের জবানবন্দিতে এলএ শাখার ৯৮টি লেনদেনে ঘুষের তথ্য উঠে আসে সেই সময়।
দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির আরও কিছু অভিযোগ তদন্ত করছিলেন। পরে তাকে প্রথমে বদলি করা হয়। 
গত ফেব্রুয়ারিতে তাকে করা হয় চাকরিচ্যুত। 
এদিকে ৯৩ লাখ টাকা উদ্ধারের ওই মামলায় গ্রেপ্তার ১৪ জনের ১২ জনই জামিনে বেরিয়ে গেছেন।
দুদক কক্সবাজার জেলার সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, বর্তমানে মামলাটি তদন্ত তদন্তাধীন। নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

শুধু এই মামলা নয়, কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম ও এলএ শাখার কর্মকর্তা- কর্মচারীদের দুর্নীতির মামলার বিচারকাজে অগ্রগতি কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পরও তদন্তই শেষ হয়নি। 
২০২০ সালে ঘুষের ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তার হন তিন সার্ভেয়ার। ২০১৯ সালে ৯১ লাখ টাকার চেক, নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার হন দুজন। এরআগে ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর দুদক ঘুষের ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ  মহেশখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কানুনগো আবদুর রহমানকে নিজের অফিস থেকেই গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় গত বছরের মে মাসে অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর শুধু তারিখ পড়ছে, সাক্ষ্য গ্রহণ হচ্ছে না।
২০১৭ সালে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কক্সবাজারের সাবেক ডিসি মো. রুহুল আমিন ও এডিসি (রেভিনিউ) জাফর আলমকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় অধিগ্রহণ করা জমি, চিংড়িঘের, ঘরবাড়িসহ অবকাঠামোর বিপরীতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয় ২৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫টি অস্তিত্বহীন চিংড়িঘের দেখিয়ে নানা কৌশলে ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার ৩১৫ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়।
কক্সবাজারে সরকারের প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার ৭২টি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে জমির মালিকদের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। এই টাকার ভাগ পান জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কক্সবাজার পৌরসভার পানি শোধনাগার প্রকল্পসহ তিনটি প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে দুদক ঘুষের তথ্য-প্রমাণ পায়। দুদকের তদন্তে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী, দালাল এবং জনপ্রতিনিধিসহ প্রায় আড়াই শত জনের জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির পেছনে বড় কর্তা যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বড় কর্তার ইশারা ছাড়া এভাবে ঘুষের লেনদেন সম্ভব নয় বলে জানান তারা।