চাঞ্চল্যকর মিতু হত্যা: বাদী স্বামীই এখন আসামি, ৫ দিনের রিমান্ডে বাবুল

চাঞ্চল্যকর মিতু হত্যা: বাদী স্বামীই এখন আসামি, ৫ দিনের রিমান্ডে বাবুল
ছবিঃ সংগৃহীত
এম. মতিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।। চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর পুলিশের সাবেক এসপির স্ত্রী মিতু হত্যার নতুন মোড় নিয়েছে। স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আক্তারই এখন এ মামলার প্রধান আসামি হয়েছেন। পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া এ হত্যা ঘটনার ক্লু বের করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
 এ ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে মিতুর স্বামী চট্টগ্রামের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। সেখানে হত্যার কারণ হিসেবে পরকীয়া সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
আজ (১২ মে) বুধবার দুপুরে নগরের পাঁচলাইশ থানায় মিতুর বাবা বাদী হয়ে মোশাররফ হোসেন ৮ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করেন।
তবে পাঁচ বছর আগে স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় বাদী ছিলেন স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তার। পাঁচ বছর পর বাদীই হলেন হত্যার মূল আসামি।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভুঁইয়া। 
তিনি জানান, দণ্ডবিধির ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবিরুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
বাকি আসামিরা হলেন- মো. কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসা (৪০), এহতেশামুল হক ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলাইয়া (৪১), মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম (২৭), মো. আনোয়ার হোসেন (২৮), মো. খায়রুল ইসলম ওরফে কালু (২৮), সাইদুল ইসলাম সিকদার (৪৫) ও শাহজাহান মিয়া (২৮)।
মামলায় বাবুল আক্তারকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
এর আগে সোমবার (১০ মে) মামলার বাদি হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে ডেকে আনা হয় বাবুল আক্তারকে। মঙ্গলবার (১১ মে) দিনভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। এই হত্যাকাণ্ডে মিতুর স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের ‘সম্পৃক্ততার প্রমাণ’ পাওয়ার কথা বুধবার জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই।
এদিকে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মিতু হত্যার পর সিসিটিভি ফুটেজের ছবি বাবুল আক্তারকে দেখানো হয়। তখন তিনি হত্যায় নেতৃত্ব দেয়া কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুছাকে তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও পারিবারিকভাবে পরিচিত সোর্স হওয়া সত্ত্বেও সুকৌশলে তাকে শনাক্ত না করে জঙ্গীদের দ্বারা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করে। উক্ত মামলাটি তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার বাদী বাবুল আক্তারসহ তদন্তে প্রাপ্ত ৮ আসামির সবাইকে মিতু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পান।
হত্যার কারণ তুলে ধরে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বাবুল আক্তার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কক্সবাজার জেলায় চাকুরি করাকালীন ইউএনএইচসিআরের ফিল্ড অফিসার (প্রোটেকশন) গায়ত্রী অমর শিং এর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এতে আমার মেয়ের পরিবারে চরম অশান্তি দেখা দেয়। বাবুল আক্তার পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ায় প্রতিবাদ করলে আমার মেয়ে মিতুকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে।
২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাবুল আক্তার সুদানে মিশনে কর্মরত থাকাকালীন তার ব্যবহার করা মোবাইল নম্বর চট্টগ্রামের বাসায় রেখে গেলে গায়ত্রী ওই নাম্বারে বিভিন্ন সময় ২৯ বার বিভিন্ন ম্যাসেজ দেন। এই ম্যাসেজগুলো আমার মেয়ে মিতু তার একটি খাতায় নিজ হাতে লিখে রাখে।
সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কয়েকমাস আগে বাবুল আক্তার চায়নাতে ট্রেনিংয়ে গেলে আমার মেয়ে গায়ত্রীর উপহার দেয়া ‘তালেবান’ ও বেস্ট কিপ্ট সিক্রেট’ নামক দুটি বই খুঁজে পায়। উক্ত দুটি বইয়ের তালেবান নামক বইয়ের তৃতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, “05/10/13, Coxs Bazar, Bangladesh.” hope the memory of m offering you this personal gift, shall eterrnalizeour wonderful bond, love you, Gaitree.”
একই বইয়ের শেষ পৃষ্টা ২৭৬ এর পরের পাতায় বাবুল আক্তারের নিজের হাতে ইংরেজিতে গায়ত্রীর সাথে সাক্ষাতের কথা লেখা আছে। তিনি লিখেছেন, “First meet: 11 sept, 2013, First PR in Cox. 07 oct 2013. G Birth Day, 10 Octobar, First kissed 05, Oct 2013; First beach walk: 8th Oct 2013, 11 Oct 2013, Marmaid with family, 12 oct 2013, Temple Ramu prayed togather, 13 oct 2013; Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk. এছাড়া বেস্ট কিপ্ট সিক্রেট নামক বইয়ের প্রথম দিকের দ্বিতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, “5/10/2013 with my sincere Love” Yours Gaitree. এজাহারের শেষের দিকে আরও লেখা হয়েছে, উল্লেখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে উভয়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি চরমে পৌঁছে। বাবুল আক্তারের এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে আমার মেয়ে মিতু প্রতিবাদ করলে তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের বিষয়টি আমার মেয়ে মিতু আমাদেরকে জানায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, আমার মেয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার বাদী বাবুল আক্তারসহ ৮ আসামি জড়িত আছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তার তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়ায় উক্ত মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এমতাবস্থায় আমার মেয়ে মিতু হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের নিমিত্তে ৮ বিবাদীর বিরুদ্ধে আমি নিজে এজাহার দায়ের করলাম।
আজ সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, 'বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি, তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি মহোদয়কে বিষয়টি জানালে ওনারা বলেছেন, তদন্তে যা আসবে, তাই করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমরা তাই করছি। নড়াইল ও ঢাকা থেকে তার দুই বন্ধুকে আটক করে তাদের জবানবন্দি নেয়া হয়েছে।'
পিবিআই প্রধান বলেন, 'আগে করা মিতু হত্যা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হচ্ছে। কারণ এই মামলার ডকেটে কোথাও বাবুল আক্তারের বিষয়ে কিছুই নেই। তাই নতুন করে হত্যা মামলা হবে। এই মামলায় বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।'
বাবুল আক্তার ৫ দিনের রিমান্ডে
মিতু হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর পর বাবুল আক্তারের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আজ বুধবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রট সরোয়ার জাহানের আদালত এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাবুল আক্তারের আইনজীবী মো.আরিফুর রহমান।
তিনি বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডের প্রতিবেদন ১০ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ও আর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয় বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতুকে।