চট্টগ্রামের ফ্রন্টলাইনার রাঙ্গুনিয়ার সন্তান ডা. এটিএম রেজাউল করিম

চট্টগ্রামের ফ্রন্টলাইনার রাঙ্গুনিয়ার সন্তান ডা. এটিএম রেজাউল করিম
ছবিঃ সংগৃহীত
এম. মতিন, চট্টগ্রাম।।  ১১ আগস্ট, বুধবার।। পৃথিবীর মানুষকে আজ করোনার অদৃশ্য এক অণুজীব স্তব্ধ করে দিয়েছে। করোনার আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় চারদিকে মানুষের পলায়নপর অবস্থা। প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, বাড়ছে মৃত্যু। তৈরি হয়েছে আইসিইউ সংকট। মিলছে না সাধারণ শয্যাও। রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের ডাক্তারেরা। এ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন না সাধারণ রোগীও, এমন অহরহ অভিযোগ ও
অজস্র উদাহরণ রয়েছে। এরপরও এমন কিছু মানবিক চিকিৎসক আছে, যারা নিজের পেশাকে সম্মান করে কাজকে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধে আগলে রেখেছেন। করোনার এই দুঃসময়ে দুর্যোগেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবায় নিজেকে বিভোর রেখেছেন। তেমনি একজন ডাক্তার হলেন চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালের এমডি ডা: এটিএম রেজাউল করিম। 
করোনা অতিমারিতে যেখানে অধিকাংশ চিকিৎসক পলায়নপর ভূমিকায় ছিলেন, সেখানে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে প্রথম থেকেই নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে
নিয়মিত রোগী দেখেছেন মানবিক চিকিৎসকখ্যাত এই চিকিৎসক।
তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের আকবর সিকদার পাড়া এলাকার মৃত আব্দুল সত্তার ও মাবিয়া খাতুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ডা: এটিএম রেজাউল করিম। 
তিনি সিলেট ওসমানি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস (ডি,অর্থোঃ)ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমএস (অর্থো) পাশ করে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালে যোগ দেন। বর্তমানে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালের এমডি ও অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে কর্মরত আছেন। তার মানবিকতায় নিজ উপজেলার লালানগর ইউনিয়ন ৩ নং ওয়ার্ডের চৌধুরী বাড়ী গ্রামের মৃত সিহাব উদ্দিনের এতিম সন্তান হাফেজ জমির উদ্দিন (২০) পঙ্গুত্বের হাত উঠে দাঁড়ানোর আশার আলো দেখছে।
জমির উদ্দীন চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া আলমশাহ পাড়া কামিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিম ১ম বর্ষের ছাত্র। জন্মের ৫ বছর বয়সেই হারান বাবাকে, মা পরের বাড়িতে ঝি’য়ের কাজ করে সংসার চালান। গত ২৭ জুলাই আলমশাহ পাড়ায় মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে গাছের ছায়ার নীচে বসে বন্ধুদের সাথে গল্প করছিলো। হঠাৎ দক্ষিণা ঝড়ো হাওয়ায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে তাঁর ওপর। এতে কোমরের হাড়সহ মেরুদণ্ডের ৬নং হাড়টি ভেঙে যায়। ফলে আবশ হয়ে যায় কোমরের নীচের অংশ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা এক্স-রে রিপোর্ট দেখে জানান সুস্থ করতে জমিরের জরুরি অপারেশন প্রয়োজন। আর এতে খরচও পড়বে বেশ বড় অংকের।
এমন কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা বেবি আকতার। সে মানুষের বাড়ীতে ঝি'য়ের কাজ করে কষ্টসাধ্যে সংসার চালান। ছেলের চিকিৎসার এত টাকা কেমনে জোগাড় করবেন৷ চিকিৎসার এত টাকা জোগাড় অসম্ভব বিধায় বিষন্ন চেহারায় ফ্যাল ফ্যাল করে ছেলে পানে বাকহীন তাকিয়ে আছে মা। আর দু' চোখে ঝরছে অশ্রুধারা। ছেলেকে নিয়ে দেখা ভবিষ্যত অন্ধকার কি করে ঘুচাবেন তিনি। এমন সময়ে পরিচিত একজন সন্ধান দিলো এক মানবিক ডাক্তারের। যিনি নিজ এলাকা রাঙ্গুনিয়ার পাশাপাশি অসহায় দরিদ্র রোগীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন সব সময়।
বেবি আকতার ছুটে গেলেন পার্কভিউ হাসপাতালে, শরাপন্ন হন রাঙ্গুনিয়ার সন্তান ডা. এটিএম রেজাউল করিমের। বললেন নিজের অসহায়ত্বের কথা। আকুতি করেন ছেলের ভবিষ্যত অন্ধকার জীবন থেকে আলোতে আনার। ডা. এটিএম রেজাউল করিম একজন মায়ের এমন অসহায়ত্বে কথা শুনে কিছু না ভেবেই বিনা খরচে জমিরের অপারেশনের দায়িত্ব নেন। এসময় সাথে থাকা পার্কভিউ হাসপাতালের নিউরোসাইন্সের কনসালটেন্ট ডা. মো. ইসমাইল হোসেনও কোনো টাকা ছাড়াই অপারেশন করতে আগ্রহী হন। বিনা খরচে করালেন অপারেশন। গত ৬ আগস্ট শুক্রবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে অপারেশন। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার সেই অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করেন চিকিৎসকরা। বর্তমানে পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন জমির উদ্দিন। 
মা বেবি আকতার আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, 'আমি মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালাই। আমার পক্ষে এই ব্যয়বহুল অপারেশন করা সম্ভব ছিল না। ডাক্তার রেজাউল ভাই যদি আমার এতিম ছেলেকে অপরেশন না করত, তাহলে আমার সন্তান সারাজীবন পঙ্গুই থাকতো। এমন দরদী ডাক্তার আমি আমার জীবনে দেখি নাই। তিনি আমার সন্তানকে নতুন জীবন দিয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন,  'যারা আমার ছেলের অপারেশন বিনা খরচে করেছেন, আল্লাহ তা’আলা তাদের উত্তম প্রতিদান দেবেন। আমি তাদের প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। আল্লাহ তাদের মঙ্গল করুক।'
এই বিষয়ে পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা এ.টি.এম রেজাউল করিম বলেন, 'একজন চিকিৎসকের কাজ হচ্ছে জনগণকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা। আমি আমার সেই দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। তাছাড়া জমির আমার এলাকার ছেলে, তার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই, বিশেষ করে এতিম হওয়ায় বিনা খরচে তাঁর অপারেশনে সহযোগিতা করি।'
তিনি আরও বলেন, প্রশংসা কিংবা বাহবা নেওয়ার জন্য এ সেবা করিনি, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা আর ভালবাসা যেখানে হাত ধরে চলে, সেখানে কোন দুর্যোগই মানুষকে টলাতে পারেনা। একারণেই আমার চিকিৎসক জীবনের একটি দায়বদ্ধতা থেকে বিনা খরচে অপারেশন করেছি।জমির এখনো চিকিৎসাধীন আছে, বর্তমানে তাঁর অবস্থা উন্নতির দিকে। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর বাড়িতে পাঠানো হবে। অপারেশন ও পরবর্তী চিকিৎসার সব খরচ আমরা বহন করছি। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের চট্টগ্রাম পার্কভিউ হাসপাতাল লিমিটেড এর উত্তরোত্তর উন্নতি ও সফলতা বৃদ্ধি করেন সেই দোয়া কামনা করছি।'
ডা: রেজাউল করিম প্রসঙ্গে উপজেলা আ.লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন তালুকদার বলেন, 'আজ করোনার অদৃশ্য শক্তির কাছে আমরা দেখছি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়া মানবতাকে, পাশাপাশি প্রতিটি কর্তব্যকর্মে আত্মগোপন করা মানুষকে। সবাই যেন নিজেকে বাঁচাতে চায়। স্বামী তার প্রিয়তমাকে, সন্তান তার মাকে ছেড়ে পালিয়েছিল। এসব কিছুর ভিড়ে আমরা রাঙ্গুনিয়া সন্তান ডা. এটিএম রেজাউল করিমকে দেখেছি ফ্রন্টলাইনার হিসেবে। করোনার এই দুর্যোগের সময়ে সেবা প্রদানের মাধ্যমে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তিনি। তার সফলতা ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।'
ডা. রেজাউল সম্পর্কে ছোট ভাই আ.লীগ নেতা সিরাজুল করিম বিপ্লব বলেন, 'আমার বড় ভাই সবসময় মানুষের মঙ্গল ও সার্বক্ষণিক গরিব নিঃস্ব মানুষের কথা চিন্তা করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি পরোপকারী মানুষ। তিনি চিকিৎসক হিসেবে করোনাকালে যে মানবিক নজির স্থাপন করেছেন, তা এলাকার মানুষের হৃদয়ের মণি কোঠায় ভাস্বর। তাছাড়া তিনি স্বজন, অসহায়, নিঃস্বদের কাছ থেকে কখনো চিকিৎসা ফি নেন না। নিজেকে এই পথে বিলিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি আমাদের সুশিক্ষার পেছনেও তার অবদান রয়েছে।'
বিপ্লব আরও যোগ করেন, একজন চিকিৎসক এ বিপদের দিনে ঘরে বসে থাকতে পারেন না। সেটা আমার পিতৃতুল্য ভাই প্রমাণ করেছেন করোনার দুঃসময়ে চিকিৎসকরা মানবিক ত্রাতা।