চট্টগ্রামে স্ত্রী হত্যার দায়ে আসামি হয়ে স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আক্তার গ্রেফতার

চট্টগ্রামে স্ত্রী হত্যার দায়ে আসামি হয়ে স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আক্তার গ্রেফতার
ছবিঃ সংগৃহীত
এম. মতিন, চট্টগ্রাম।। চট্টগ্রামের আলোচিত মিতু হত্যার দায়ে স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আজ (১১ মে) মঙ্গলবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে নেওয়ার পর চট্টগ্রামেই তাকে গ্রেফতার করে পিবিআই।
এর আগে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী এলাকায় পিবিআই মেট্রো অঞ্চলের কার্যালয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে জানান পিবিআইয়ের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার।
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, 'মামলার বাদী হিসেবে বাবুল আক্তার মঙ্গলবার চট্টগ্রাম গেছেন। তিনি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এটাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া, যে কোনো কিছুই বলা যেতে পারে।'
তবে বাবুল আক্তার স্ত্রী হত্যা মামলার বাদী হলেও তার শ্বশুরের অভিযোগ, জামাই বাবুল আক্তারই তার মেয়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
জানা যায়, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর ও আর নিজাম রোডের বাসার অদূরে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। মোটরসাইকেলে আসা তিন হামলাকারী মিতুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, গত কয়েক বছরে চাকরিকালীন সময়ে চট্টগ্রামে জঙ্গি দমন অভিযানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন বাবুল আক্তার। আর এ কারণে জঙ্গিদেরই টার্গেটে ছিলেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। তবে ঘটনার দু’দিন আগে বদলিজনিত কারণে ঢাকায় আসেন এসপি বাবুল আক্তার। ঘটনার দিন ৫ জুন তার নতুন কর্মস্থলে যোগ দেয়ার কথা ছিল। আর এ দিনই ঘটে যায় মর্মান্তিক এ ঘটনা।
এ ঘটনায় নানা জল্পনা-কল্পনার পর বাবুল আক্তারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
আলোচিত এই হত্যা মামলা শুরু থেকে চট্টগ্রামের ডিবি পুলিশ মামলাটির তদন্ত করে। তারা প্রায় তিন বছর তদন্ত করেও চার্জশিট দিতে না পারায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মামলাটির তদন্ত ভার ডিবি থেকে পিবিআইকে দেন আদালত। পিবিআই দীর্ঘদিন মামলাটি তদন্ত করে হত্যার বেশ কিছু আলামত ও প্রমাণ পান বলে জানা যায়। তৎমধ্যে একটি ফোন রেকর্ডে শোনা যায়, এসপি বাবুল আক্তারের ফোন কিলার মুছাকে বলছিল ‘তুই কোপালি ক্যান’।
২০১৬ সালের ৫ জুন সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মুছার মোবাইল ফোনে কল যায় তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তারের মোবাইল ফোন থেকে। তাতে বাবুল আক্তার বলছিল ‘তুই কোপালি ক্যান?’ ৩/৪ সেকেন্ড থেমে আবার বলেন, ‘বল তুই কোপালি ক্যান? তোরে কোপাতে কইছি?’ ওপার থেকে মুছার কথা, ‘না মানে’। মাত্র ২৭ সেকেন্ডের মোবাইল ফোনের কথোপথনের রেকর্ডটিই এখন মিতু হত্যার প্রধান আলামত ও সাক্ষী। 
বাবুল আক্তারের ২৭ সেকেন্ড এই কলের কথোপথনের রেকর্ড পেয়েই হত্যাকান্ডের ১৯ দিন পর ২০১৬ সালের ২৪ জুন রাতে বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে বাবুলকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার কিছু দিন পর বাবুল আক্তার পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেন।
এদিকে এই মামলায় এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন দুই আসামী নূরুন্নবী ও রাশেদ পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। মুছাসহ দুই জন আসামী গুম হয়ে গেছে। আর যাকে ঘিরে ঘটনার মূল্য রহস্য; তিনিই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ কিছুই করছে না। নিহতের বাবা সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশারফ হোসেন অভিযোগ করেছেন, তার মেয়ের স্বামীই প্রকৃত খুনী।
উল্লেখ্য, বিগত ২০১৬ সালের ৫ জুন সকাল ৭টা ১৭ মিনিটে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে করে তিন দুর্বৃত্ত মিতুকে ঘিরে ধরে প্রথমে গুলি করে। এরপর কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। ওই সময় মিতুর স্বামী বাবুল আক্তার পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগ দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তার আগে তিনি চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন বাবুল আক্তার। মামলাটি চট্টগ্রামের নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে ৩ বছর ১১ মাস তদন্তে থাকার পর গত মে মাসে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তর করা হয়েছে। শিগগির এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানান পিবিআইয়ের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার।