চাঁদাবাজি বন্ধ করায় নেতার রোষানলে ওসি আলমগীর, ৩ মাসের মাথায় বদলি 

চাঁদাবাজি বন্ধ করায় নেতার রোষানলে ওসি আলমগীর, ৩ মাসের মাথায় বদলি 
ছবিঃ সংগৃহীত
এম. মতিন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি।। ১৩ জুলাই, মংগলবার।। 
সম্প্রতি জাতিসংঘের অধীনে সাউথ সুদানে শান্তি রক্ষা মিশন শেষে দেশে এসে সিএমপি’র গোয়েন্দা (উত্তর) বিভাগের পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন আলমগীর মাহমুদ। ডিবিতে যোগদানের কিছুদিন পর করোনার হট স্পটে নগরের চকবাজারের সার্বিক আইন শৃংখলার অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ এপ্রিল চকবাজার থানার ইনচার্জের দায়িত্বে পদায়ন হন ওসি আলমগীর। থানায় যোগ দিয়েই তিনি মাদক ও থানার চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি অবৈধ টমটম, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, শপিং মলসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ ও ওসির কক্ষে মামলা সংক্রান্ত লোকজন ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ করে দেন। তবে, এসব কাজগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই চকবাজার থানা ছাড়তে হলো তাঁকে। 
জানা গেছে, ওসি আলমগীরের যোগদানের পর থেকেই চকবাজার এলাকার অপরাধ কর্মকাণ্ড অনেকটা কমে যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর কঠোরতার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে ছোট-বড় অনেক জুয়ার আসর। তিনি গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাদকের আস্তানা। আটক করেছে অনেক মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়াড়িদের। মাদকবিরোধী অভিযানের সময় গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের তদবীরও তিনি আমলে নেননি।
সে সাথে চকবাজার থানা ইনচার্জের দায়িত্ব নিয়েই অবৈধ টমটম, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, শপিং মলসহ বিভিন্ন খাত থেকে নিয়মিত চাঁদা উত্তোলন বন্ধ করে দেন তিনি। এতে শুরুতেই মাদক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েন নবাগত ওসি আলমগীর মাহমুদ। ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন নগরের এক শিল্পপতি। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য।
চকবাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ করার কারণেই ওই নেতা বিভিন্নভাবে ওসি আলমগীরকে ‘ডিস্টার্ব’ করা শুরু করেন। কারণ বন্ধ করে দেয়া চকবাজারের এসব খাত থেকে আদায় করা চাঁদার একটা অংশ (মাসিক প্রায় ২০ লাখ টাকা) ভাগ পেতেন ওই শিল্পপতি নেতা। এর সাথে আরো আছে থানার মামলা বাণিজ্যের বিষয়। এক্ষেত্রে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম কলেজের মারামারির ঘটনায় মামলা। তাছাড়া নেতার অন্যায় আবদার রক্ষা না করায় পুলিশ হেড কোয়ার্টারে অভিযোগ করেন ওই নেতা।
জানা যায়, গত ১৬ জুন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদুর করিম ও সাধারণ সম্পাদক সুভাষ মল্লিকের অনুসারীদের মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এঘটনায় প্রায় অর্ধ ডজনের বেশি লোক আহত হয়। দুইপক্ষই গেল থানায়, ওসি আলমগীর মাহমুদ দুই পক্ষেরই মামলা নেন। একপক্ষের করা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন নুর মোস্তফা টিনু। টিনুর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ায় ওসির ওপর ক্ষেপে যান সেই নেতা। মামলায় আসামির নাম দেয়া ও বাদ দেয়া নিয়ে ওই নেতার সাথে ওসির মতানৈক্যসহ নানা ঘটনায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। তারপর থেকেই ওসি আলমগীরকে চকবাজার থানা থেকে সরানোর কলকাঠি নাড়তে থাকেন তিনি।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ড. মইনুর রহমান চৌধুরী স্বাক্ষরিত আদেশে চকবাজার থানার ওসি আলমগীরকে রাজশাহী পুলিশ রেঞ্জে এবং বাকলিয়া থানার ওসি রুহুল আমিনকে রংপুর রেঞ্জে বদলির আদেশ আসে। যোগদানের তিন মাসের মধ্যে আকস্মিক বদলির অর্ডার আসায় এ নিয়ে স্থানীয় জনমনে আলোচনার ঝড় উঠে। এই আদেশে বিস্মিত খোদ সিএমপির কর্তাব্যক্তিরাও। তবে সিএমপির একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই বদলির পিছনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য এক শিল্পপতি জড়িত। কারণ এই দুই ওসিসহ চান্দগাঁও থানার ওসিও নেতার বিভিন্ন অনৈতিক আবদার রক্ষা না করায় লবিং তদবিরের মাধ্যমে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে ওই নেতা অভিযোগ করে এই বদলি করান।
অপরদিকে গত ১১ জুন বাকলিয়া থানা এলাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, চাকসুর প্রথম জিএস মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সন্তানদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। মরহুম ইব্রাহিমের পূর্বপুরুষের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত কবরস্থান দখল করতে তার পরিবারের সদস্যদের ওপর সিএমপির তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াকুব, ওসমান, মাসুদের নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে। 
এর পরপরই ওসি রুহুল আমিনের জালে আটকা পড়ে এজাহারভুক্ত প্রায় সব আসামি। জানা গেছে, সন্ত্রাসী ইয়াকুবের গডফাদারও ওই নেতা। ঘটনার পর ইয়াকুব ওই নেতার আশ্রয়ে প্রথমে ছিলেন চান্দগাঁও। পরে ঢাকায় গা ঢাকা দিলেও তাকে সেখান থেকে দেশি-বিদেশি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াকুবকে গ্রেপ্তার করে ওসি রুহুল আমিন পড়লেন ওই নেতার রোষানলে। তবে রুহুল আমিনের সাথে ঝামেলাটা পুরানো। ২০ জানুয়ারি রুহুল আমিন বাকলিয়ায় পদায়ন হওয়ার আগে চকবাজার থানার ওসির দায়িত্ব পালন করেন। তখন ওই শিল্পপতির বেশকিছু অন্যায় আবদার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
এছাড়া চান্দগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান সিএমপিতে নতুন। সিএমপিতে যোগ দেওয়ার পরপরই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে চান্দগাঁও থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন অন্যায় আবদার আসতে থাকে থানায়। ওসি মোস্তাফিজ ন্যায়সঙ্গত না হওয়ায় তাতে সহযোগিতা করেননি। এসব আবদার গড়ায় সিএমপি কমিশনার পর্যন্ত। কিন্তু নীতিতে অটল থাকেন সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর।
এর আগেই ওই শিল্পপতির নজর পড়ে পাঠানিয়াগোদা এলাকার আদিনিবাসী কয়েকটা পরিবারের সম্পত্তির ওপর। তাদেরকে বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকি দিলেও ওই পরিবারের এক সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা হওয়ায় সুবিধা করতে পারেননি। শেষমেষ ওই পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা করান নিজের লোকজন দিয়ে। ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা দায়ের করেন। নিয়ম অনুযায়ী ওসি সেই মামলা গ্রহণও করেন। গত ২৯ এপ্রিল ওই পরিবারের মহিলা সদস্যরা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে এসব জানান।
এরই মধ্যে ওই শিল্পপতির পারিবারিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল। জাতির পিতার ম্যুরাল পুরো জাতির আবেগের স্থান। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে ওই ম্যুরাল ভেঙেছে শিল্পপতিরই লোকজন। 
ওই শিল্পপতি দেশের প্রভাবশালী একটি করপোরেট গণমাধ্যমের পরিচালকও। সেই লবিং ব্যবহার করে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে এই তিন ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান হেড কোয়ার্টার ও সিএমপির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির এক কর্মকর্তারা বলেন, 'বদলি একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং এটি রুটিন ওয়ার্ক। তবে সম্প্রতি সিএমপি থেকে ডজনের বেশি কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করা হয়েছে। এটি যদি সৎ সাহস আর প্রকৃত পুলিশিংয়ের কারণে শাস্তিমূলক বদলির শিকার হতে হয়, তাহলে ফোর্সের মনোবল ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে ভিশন তা মুখ থুবড়ে পড়বে।'
তিনি আরও বলেন, 'যোগদানের পর এত অল্পদিনের মধ্যে দুই ওসির এমন আকস্মিক বদলি, সৎ ও দক্ষ অফিসারদের মধ্যে কিছুটা হলেও ক্ষোভ ও হতাশা কাজ করবে।' 
এ বিষয়ে একাধিকবার কল করেও ওসি আলমগীর ও রুহুল আমিন সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তাই তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।