জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র ৪ সদস্য গ্রেফতার

জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র ৪ সদস্য গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট।। নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র অর্থ বিষয়ক সমন্বয়ক ও হিজরত বিষয়ক সমন্বয়কসহ ৪ জনকে কুমিল্লার লাকসাম এলাকা হতে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব।

র‍্যাব বলছে, গ্রেফতারকৃতরা জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র দাওয়াতী, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ, হিজরতকৃত সদস্যদের তত্ত্বাবধানসহ অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমে জড়িত ছিল। তারা ২ থেকে ৪ বছর আগে নিকটাত্মীয়, বন্ধু, স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদে অনুপ্রানিত হয়ে সংগঠনের জেষ্ঠ সদস্যদের মাধ্যমে তাত্তি¡ক, শারীরিক সশস্ত্র প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। 

বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‍্যাব-১১ এর অভিযানে কুমিল্লার লাকসাম এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
 
গ্রেফতাররা হলেন, মো. আব্দুল কাদের, মো. ইসমাইল হোসেন, মুনতাছির আহম্মেদ, হেলাল আহমেদ জাকারিয়া। 

এসময় তাদের কাছ থেকে  উগ্রবাদী পুস্তিকা-২টি, প্রশিক্ষণ সিলেবাস-১টি, লিফলেট-৯টি, ডায়েরী-১ এবং ব্যাগ-৪টি  উদ্ধার  করা হয়। 

শুক্রবার (৪ নভেম্বর) সকালে কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, ইতোপূর্বে গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা জানতে পারি যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিরূদ্দেশ হওয়া তরুণের সংখ্যা ৫৫ এর অধিক। পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া নিখোঁজ তরুণদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পটুয়াখালী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সদস্যের তত্ত্বাবধানে সেইফ হাউজে রাখা হত। প্রশিক্ষণকালীন বিভিন্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে রেখে পটুয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন চর এলাকায় শারীরিক কসরত ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হত। এছাড়াও, আত্মগোপনে থাকার কৌশল হিসেবে তাদেরকে রাজমিস্ত্রী, রং মিস্ত্রী, ইলেকট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন পেশার কারিগরী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হত।

র‍্যাব আরও জানতে পারে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ তরুণদেরকে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির দুর্গম পার্বত্য পাহাড়ী এলাকায় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হত। বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় পরবর্তী ধাপের প্রশিক্ষণে তাদেরকে আগ্নেয়াস্ত্র চালানো, আইইডিসহ বিভিন্ন ধরণের বোমা তৈরি, চোরাগুপ্তা হামলা, প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার বিভিন্ন কৌশলসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হত বলে জানা যায়।

সংগঠনটির আমির মো. আনিসুর রহমান উরফে মাহমুদ নামক ব্যক্তি যার নেতৃত্বে উগ্রবাদী সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়। এছাড়াও, উগ্রবাদী এই সংগঠনে ৬ জন শূরা সদস্য রয়েছে যারা দাওয়াতী, সামরিক, অর্থ, মিডিয়া ও উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছে। শূরা সদস্য আবদুল্লাহ মাইমুন দাওয়াতী শাখার প্রধান, মাসকুর রহমান সামরিক শাখার প্রধান, মারুফ আহমেদ সামরিক শাখার ২য় ব্যক্তি, মোশারফ হোসেন ওরফে রাকিব অর্থ ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান, শামীম মাহফুজ প্রধান উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষণের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক এবং ভোলার শায়েখ আলেম বিভাগের প্রধান হিসেবে সংগঠনটিতে দায়িত্ব পালন করছে। তারা অস্ত্র চালনাসহ সশস্ত্র সংগ্রামের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গোপনে পরিচালনার জন্য বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকাকে বেছে নেয়।  

গ্রেফতারকৃত বাচ্চু সংগঠনটির অর্থ বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক, গ্রেফতারকৃত সোহেল ও হানজালা সমগ্র দেশে হিযরতকৃত সদস্যদের সার্বিক সমন্বয়ক এবং গ্রেফতারকৃত জাকারিয়া সামরিক শাখার ৩য় সর্বোচ্চ ব্যক্তি বলে জানা যায়। দেশব্যাপী ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ এর কার্যক্রমে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে র‍্যাবসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে তারা সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয়দের পরামর্শে কুমিল্লার লাকসাম এলাকায় আত্মগোপনে ছিল। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তারা বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সদস্য ও সহানুভ‚তিশীল/সমমনা/সমব্যথীদের নিকট থেকে অর্থ সংগ্রহ করত এবং সাংগঠনিক প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করত। এছাড়াও, তারা পাহাড়ে প্রশিক্ষণরত সদস্যদের পরিবারের নিকট প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতাসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করত এবং বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে প্রশিক্ষণরত সদস্যদের অর্থ প্রেরণ ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করত।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা সংগঠনটির আমীরসহ অন্যান্য শূরা সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। আরও জানা যায় যে, সংগঠনের আমীর মাহমুদ কুমিল্লা সদর দক্ষিনের একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ম্যানেজার হিসেবে চাকুরী করত। প্রায় দুই বছর পূর্বে সে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে প্রায় নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সে ১ বছর পূর্বে কুমিল্লার প্রতাপপুরে অবস্থিত তার সেমি পাকা বাড়িসহ জমি স্থানীয় এক ব্যক্তির নিকট ১৭ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে বান্দবানের নাইক্ষংছড়িতে সাড়ে তিন বিঘা জমি ক্রয় করে এবং পরিবার নিয়ে সেখানে স্থানান্তরিত হয়। সে সেখানে চাষাবাদ, পোল্ট্রি ফার্ম ও গবাদি পশুর খামার পরিচালনা করত বলে জানা যায়। এছাড়াও, তারা সংগঠনটির মহিলা শাখার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছে। আমরা বেশকিছু মহিলা সদস্যের বিষয়ে জানতে পেরেছি যারা সংগঠনের চাঁদা প্রদানসহ দাওয়াতী কার্যক্রমে জড়িত ছিল।
  
গ্রেফতারকৃত মুনতাছির আহম্মেদ ওরফে বাচ্চু চট্টগ্রামে একটি বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয় হতে ব্যাংকিং বিষয়ে অধ্যয়নরত ছিল। সে সংগঠনটির অর্থ ও গনমাধ্যম শাখার প্রধান মোশারফ হোসেন ওরফে রাকিব এর অন্যতম সহযোগী এবং অর্থ বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। জঙ্গি সদস্য শিশির এবং রাকিব এর মাধ্যমে উগ্রবাদে অনুপ্রানিত হয়ে দুই বছর পূর্বে সংগঠনে যোগদান করে। সে রাকিবের মাধ্যমে সংগঠনের কিছু অর্থ দিয়ে ২০২২ সালের শুরুর দিকে কুমিল্লায় একটি ফুড কার্ডে স্ট্রীট ফুড এর ব্যবসা শুরু করে। সে রাকিবের নির্দেশনায় সংগঠনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং পরবর্তীতে রাকিবের নির্দেশে পুনরায় প্রাপ্ত অর্থ সাংগঠনিক কার্যক্রমে পরিচালনার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করত।