তীব্র জোয়ারের বিলীন হচ্ছে কক্সবাজার সৈকত

তীব্র জোয়ারের বিলীন হচ্ছে কক্সবাজার সৈকত
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার, ১২ আগষ্ট।। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। সৈকতের কয়েকটি পয়েন্ট তীব্র জোয়ারের তোড়ে ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল থাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে দু'থেকে চার ফুট বাড়ছে জোয়ারের পানি। এতে  ঢেউয়ের তোড়ে ক্রমে ভাঙ্গছে কক্সবাজার সৈকত। 

অস্বাভাবিক জোয়ারের তাণ্ডবে ভাঙ্গন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ঢেউয়ের তোড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সৈকতের বালু। তলিয়ে যাচ্ছে ঝাউবীথি। এতে করে সৈকত হারাচ্ছে তার চিরচেনা রূপ ও সৌন্দর্য । ভাঙ্গনে ঝুঁকির মুখে রয়েছে সৈকতের ছাতা ও ঝিনুক মার্কেট। পূর্ণিমার জোয়ারের পানি আরো উচ্চতায় বাড়লে ভাঙন তীব্র হওয়ার আশংকা করছে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগের বালুর বস্তা দেয়ার কাজ শুরু করার পর থেকেই ভাঙ্গন আরও ভয়াহত আকার ধারণ করেছে।

১২ আগষ্ঠ (শুক্রবার) সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার সৈকতের ভাঙ্গনের দৃশ্য পরিদর্শন করেছেন
সৈকতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন সহ জিও ব্যাগ বসিয়ে ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। ভাঙ্গন ঠেকাতে জরুরি কাজের নামে লাখ লাখ টাকা অপচয়ের আপত্তি জানান স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের ডায়াবেটিক পয়েন্ট থেকে কলাতলীর ডলফিন মোড় পর্যন্ত লাবণী, সীগাল, সুগন্ধা ও কলাতলি সৈকত পয়েন্ট এলাকায় বড় বড় ঢেউয়ের তোড়ে বালু সরে গেছে। এই ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে সৌন্দর্য হারাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। 
ঢেউয়ের তোড়ে ভাঙ্গন সৈকতের লাবনী পয়েন্টে জেলা প্রশাসন নির্মিত উন্মুক্ত মঞ্চ পর্যন্ত চলে এসেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে জোয়ারের আঘাতে ঝুঁকির মুখে পড়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স। পরে তা জনতার সহায়তায় সরিয়ে আনা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম রেজা বলেন, জোয়ারের বাড়ন্ত পানির ঢেউয়ের তোড়ে পড়ে আমাদের ডিউটি ঘরটি তলিয়ে যাচ্ছিল। আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরটি কোন মতে খুলে সাগরে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করেছি।
লাবণী পয়েন্টে দায়িত্বরত লাইফ গার্ড কর্মী ওসমান বলেন, এত উচ্চতায় জোয়ার বিগত বছরগুলোতে দেখিনি। সৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকত ভাঙ্গছে। একই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের স্থাপনা। সৌন্দর্যহীন হয়ে পড়ছে সৈকত। ঢেউয়ের তোড়ে ফুট ওয়ের ইট উঠে গিয়ে এলোমেলো হওয়ায় সৈকতে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন অনেক পর্যটক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বর্ষা মৌসুমে সাগরে পানি বৃদ্ধি পায়। তবে ভাঙন এরকম তীব্র হয় না। আর সৈকতে অতীতে কোনো সময় এধরনের ভাঙ্গন দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারের সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা গ্রহণযোগ্য নয়। নাজিরারটেক থেকে ইনানী পর্যন্ত সৈকতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তাতে সাগর ফুঁসে ওঠে। এরকম অনেক নজির অতীতে দেখা গেছে। সম্প্রতি কক্সবাজার লাবনী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত সৈকতের একেবারেই কাছে গড়ে উঠেছে অনেক সুরম্য অট্টালিকা। অভিজ্ঞজনেরা মনে করছেন এই কারণেই সৈকতে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। প্রশাসন যন্ত্র এগুলো দেখেও দেখছে না। 
পাউবো সূত্র মতে, ২০২১ সালে সৈকতে ভাঙ্গন শুরু হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ারের নির্দেশে সৈকতের ভাঙ্গন রোধে সীমিত আকারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সৈকতের লাবনী পয়েন্ট থেকে এয়ারপোর্ট হয়ে নুনিয়াছড়া নাজিরারটেক পর্যন্ত কক্সবাজার শহর রক্ষা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। 
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের প্রধান আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ মিয়া জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখানো হয়েছে। লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল। উপকূলীয় এলাকায় মাঝারি বৃষ্টিপাত ও দমকা ঝড়ো হাওয়া চলছে। বুধবার সকাল হতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৪৫ মিলিমিটার। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৪ ফুট বাড়ছে। শুক্রবার পূর্ণিমার জোয়ারে পানি আরো বাড়তে পারে। গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছধরা ট্রলার সমূহকে পরবর্তী সংকেত না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।