ত্রিশালের ৩ জন হত্যাকারী ঘাতক ড্রাইভার রাজু গ্রেফতার: মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির ফিটনেস, নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স 

দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ট্রাকটি থামায়। তখন সুযোগ বুঝে গ্রেফতারকৃত রাজু ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বাস থেকে সে ময়মনসিংহ বাইপাসে নেমে যায়। সেখান থেকে একটি সিএনজি-তে করে প্রথমে মুক্তাগাছা এবং পরে অপর একটি বাসে করে সে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌঁছায়। সেখান থেকে সে তার পরিচিত বিভিন্ন চালকের ট্রাকে উঠে আত্মগোপন করে আসছিল।

ত্রিশালের ৩ জন হত্যাকারী ঘাতক ড্রাইভার রাজু গ্রেফতার: মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির ফিটনেস, নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স 
ছবি: সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট।। চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত ময়মনসিংহের ত্রিশালে মহাসড়কে বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে বাবা-মাসহ এক সন্তানের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় ঘাতক ট্রাকচালক মো. রাজু আহমেদ ওরফে শিপনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

‘ট্রাকটির ধারণ ক্ষমতা সাতটন হলেও দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির ওজন ছিল সাড়ে ১৩ টন। এছাড়া চালকের হালকা যানের লাইসেন্স থাকলেও ছিল না ভারি যানবাহন চালানোর লাইসেন্স। গাড়িটির বর্তমানে ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদউত্তীর্ণ ছিল।’

র‌্যাব জানায়, দুর্ঘটনার আগে ট্রাকের হেলপার ঘুমাচ্ছিলেন। এ সময় পেছন থেকে আসা একটি বাসকে সাইড দিতে গিয়ে বামে চাপলে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ট্রাকটি তাদের ওপর উঠিয়ে দেয় চালক রাজু। রাজু ২০০২ সালে যশোরেরও দুর্ঘটনার শিকার হয়।

ওই দুর্ঘটনায় তার বাম পা মারাত্মকভাবে জখম হওয়ার ফলে চালক প্রায় ৬ বছর গাড়ি চালায়নি। তার এখনও বাম পায়ে সমস্যা রয়েছে। সে গত ১০ বছর ধরে নিয়মিত বিরতিতে ট্রাক চালাচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) দুপুরে কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

এর আগে গতকাল সোমবার (১৮ জুলাই) দিবাগত রাতে সাভার থেকে রাজু আহমেদ শিপনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।


র‌্যাব জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ট্রাকটি থামায়। তখন সুযোগ বুঝে গ্রেফতারকৃত রাজু ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে পড়ে। পরবর্তীতে বাস থেকে সে ময়মনসিংহ বাইপাসে নামে এবং সেখান থেকে একটি সিএনজি করে প্রথমে মুক্তাগাছা এবং পরে অপর একটি বাসে করে সে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌঁছায়। সেখান থেকে সে তার পরিচিত বিভিন্ন ট্রাক চালকের ট্রাকে উঠে আত্মগোপনে থাকে। গতকাল এমন একটি ট্রাক সাভারে পৌঁছালে সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

এর আগে গত ১৬ জুলাই দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রায়মনি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্না বেগমকে চেক-আপ করাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় তাদের কন্যা সন্তানও সঙ্গে ছিল। পথিমধ্যে রাস্তা পারাপার হওয়ার জন্য মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকাকালে ময়মনসিংহগামী একটি ট্রাক বেপরোয়া গতিতে তাদের চাপা দেয়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৫)। আর তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্না বেগম (২৬) এবং তাদের তিন বছর বয়সী কন্যা সন্তান সানজিদা আক্তারকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করে। দুর্ঘটনার সময় রত্না বেগমের উপর দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়ায় চাকার চাপে গর্ভে থাকা কন্যা সন্তান অলৌকিকভাবে ভূমিষ্ঠ হয়। ভূমিষ্ঠ শিশুটিকে আহত অবস্থায় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ সদরের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর আলমের পিতা বাদী হয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানায়  একটি মামলা দায়ের করেন।


নিহত জাহাঙ্গীর আলম পেশায় একজন নির্মাণ শ্রমিক। দুর্ঘটনায় নিহত কন্যা সন্তান ছাড়াও তাদের পরিবারে আট ও ১০ বয়সী দুই ছেলে-মেয়ে রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় ভূমিষ্ঠ শিশুটি বেঁচে থাকলেও ডান হাতের কনুইয়ের উপরের হাড়ে ফ্র্যাকচার ও কলার বোন ভেঙে গেছে বলে জানা যায়। বর্তমানে শিশুটি ময়মনসিংহের লাবীব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 


দেশব্যাপী এই দুর্ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। র‌্যাব ওই দুর্ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব সদর দফতর গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৪ এর অভিযানে গত রাতে ঢাকার সাভার এলাকা থেকে ট্রাক চালক মো. রাজু আহমেদ শিপনকে (৪২) গ্রেফতার করা হয়। তার বাড়ি রাজশাহীতে।


প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ট্রাক চালক নিহতদের গাড়ি চাপা দেওয়ার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতারকৃত রাজু গত ১১ জুলাই থেকে একটানা মালামাল পরিবহন করে আসছিল। এর মধ্যে সে একবার রাজশাহী থেকে আম নিয়ে কিশোরগঞ্জের তারাইলে মালামাল আনলোড করে সে আবার রাজশাহীতে ফিরে আসে। পরে গত ১৫ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট থাকে গাড়ির মালিকের আম বোঝাই করে এবং পরে রাজশাহীর নৌহাটা থেকে আরেক দফায় আলু বোঝাই করে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের এক ব্যবসায়ীর নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাত ১২টায় দিকে রওনা করে। পথিমধ্যে সে হালকা বিরতি নিয়ে দুর্ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত একটানা গাড়ি চালিয়ে আসছিল এবং কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে ময়মনসিংহের ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছালে রাস্তা পারাপারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা নিহত জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী-সন্তানকে চাপা দেয়। 


তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন ট্রাকটি থামায়। তখন সুযোগ বুঝে গ্রেফতারকৃত রাজু ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বাস থেকে সে ময়মনসিংহ বাইপাসে নেমে যায়। সেখান থেকে একটি সিএনজি-তে করে প্রথমে মুক্তাগাছা এবং পরে অপর একটি বাসে করে সে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌঁছায়। সেখান থেকে সে তার পরিচিত বিভিন্ন চালকের ট্রাকে উঠে আত্মগোপন করে আসছিল। গতকাল এমন একটি ট্রাক সাভারে পৌঁছালে সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 


গ্রেফতার রাজু আহমেদ শিপনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে গত ছয় থেকে সাত মাস আগে থেকে শতকরা ১০ শতাংশ কমিশনে দুর্ঘটনায় পড়া ট্রাকটি চালিয়ে আসছিল। গাড়িটিতে করে সবসময় কাঁচামাল পরিবহন করা হতো। গাড়িটির বর্তমানে ট্যাক্স টোকেন এবং ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদোত্তীর্ণ। 


জানা গেছে, গাড়িটির ধারণ ক্ষমতা ৭ টন হলেও দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির ওজন ১৩ দশমিক ৫ টন ছিল। গ্রেফতারকৃতের ভারী যানবাহন চালনার জন্য কোনও বৈধ লাইসেন্স নেই। আগে তার মধ্যম সারির গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল, যা ২০১৬ সালে হারিয়ে গেছে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, গ্রেফতারকৃত রাজুর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।