দৃশ্যপট- কক্সবাজার শহর- "ময়লা পানি, কাদা পেরিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের"

দৃশ্যপট- কক্সবাজার শহর- "ময়লা পানি, কাদা পেরিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের"
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার।। কক্সবাজার শহরের বৌদ্ধ মন্দির সড়ক ও তিন রাস্তার মোহনা বৃষ্টির পানি ব্রিজের নীচ দিয়ে নয় উপর দিয়ে যাচ্ছে।  

সড়ক আর নালা পানিতে একাকার। নালার ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি বাসা বাড়ির বারান্দায় আর দোকানের ভেতর ডুকে পড়ছে। উন্নয়নের জোয়ারে কক্সবাজার শহর! 
শহরে নবনির্মিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপরিকল্পিত হওয়ায় সড়কে জমেছে পানি। ভোগান্তি সাধারণ মানুষের।
বেসরকারি একটি কলেজ ছাত্রী রওনক আরা বেগম। তার কলেজ আলীর জাহালে। তিনি থাকেন শহরের বাজারঘাটা এলাকায়। আজ মঙ্গলবার সকালে কলেজ যাওয়ার জন্য বেরিয়ে গলির মুখেই দেখেন, বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। গলি পেরিয়ে সড়কেও একই দশা। বৃষ্টির মধ্যে রিকশা বা অন্য কোনো বাহন না পেয়ে নোংরা পানি পেরিয়ে কলেজ পর্যন্ত যেতে হয় তাঁকে।
রওনক আরা বলেন, রাস্তার উপর ড্রেনের ময়লা জমে পানি প্রায়ই জমা হয়ে থাকে। কিছুদিন আগে নির্মাণ কাজ করা হয়েছে, তবে আজ আবার দেখি, পানি জমে রয়েছে। আর সড়কেও পানি।
রওনক আরা বলেন, সড়কের পাশেই কক্সবাজার পৌরসভার পরিচ্ছন্ন কর্মীরা বর্জ্য জমা করে রাখে। ময়লাগুলো পানির সঙ্গে মিশে গেছে। উপায় না পেয়ে ময়লা পানি পেরিয়ে আসতে হলো। ময়লা পানিতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পা চুলকানো শুরু হয়ে গেছে। 
কক্সবাজারে গত সোববার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। এতে পর্যটন শহরে সব গলি ও সড়কে বৃষ্টির পানি জমে যায়। ফলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও কর্মস্থলে যেতে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, পৌর শহরে সড়ক ও ড্রেনেজে ব্যবস্থার কাজ চলছে। গত চার বছরেও সংস্কার কাজ শেষ না হওয়ায় এই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। পাশাপাশি সবকটি সড়কে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেন নির্মাণ ও নতুন পানির পাইপ বসানোর কাজ করায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখন অনেকটাই নষ্ট।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরের বাজারঘাটা,বার্মিজ মার্কেট, কালুর দোকান, রুমালিয়ারছড়া, লালদীঘি, সী কুইন মার্কেটের সামনেসহ শহরের অলিগলিতে পানি জমে রয়েছে। এর মধ্যে শহরের প্রধান সড়কে নবনির্মিত ফুটপাতগুলোও পানিতে একাকার হওয়ায় পথচারীদের ময়লা পানি পেরিয়েই চলতে হচ্ছে। সড়ক দিয়ে হালকা ও ভারী যানবাহন চলার সময় পানি ছিটকে পথচারীদের গায়ে পড়ছে। বৃষ্টির মধ্যে প্রধান সড়কটিতে যানবাহন চলাচলও কম। পাশাপাশি বেশ কিছু অলিগলিতেও পানি জমে ছিল।
সকালে মো. লোকমান তাঁর তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। তিনি বলেন, শহরে রাস্তার কাজ চলমান। চলাচল অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
‘বৃষ্টির পানিতে সড়ক একাকার হওয়ায়, তাই তাকে এগিয়ে দিতে এসেছিলাম। পরে সড়কে নোংরা পানি দেখে ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজেই পানি পার করে দিই। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত থাকায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। একে তো সংস্কার কাজ শেষ না হওয়ায়, তার ওপর আজ পানি জমেছে।’
এক কলেজ শিক্ষার্থী নয়না আকতার বলেন, কলেজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে দেখি, সড়কে পানি জমেছে। ময়লা পানিতে সেলোয়ার, জুতা-মোজা ভিজে গেছে। এখন সারা দিন ক্যাম্পাসে এসব নিয়েই থাকতে হবে।’
কক্সবাজারের স্থানীয় দৈনিক গণসংযোগ পত্রিকার সম্পাদক সাইফুর রহিম শাহীন তার ফেসবুক ওয়ালে পোষ্ট করেছেন, 'নরক যন্ত্রণায় কক্সবাজার শহরের মানুষ'। সাথে বেশ কিছু ছবিও পোস্ট দেন।
জানা গেছে, দরপত্রের কার্যাদেশ অনুসারে কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়ক উন্নয়ন কাজ শেষ হবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু কাজ শুরুর গত এক বছরে এখনো ড্রেনের কাজই শেষ করতে পারেনি কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সড়কে এক সঙ্গে ড্রেনেরে কাজ শুরু করলেও হাতে-গোনা কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে মন্থরগতিতে কাজ চলায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 
এদিকে, আগে খুঁড়ে রাখা অংশ সংস্কার সম্পন্ন না করেই নতুন জায়গায় খুঁড়াখুঁড়ি চলছে প্রতিনিয়ত। ফলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে জনদূর্ভোগ, ঘটছে দুর্ঘটনাও। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লোক দেখানো কাজ করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তবে, সড়ক বাস্তবায়নকারি প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) বলছে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে বার বার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
সূত্র মতে, এক সময়ের সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন থাকা জনগুরুত্বপূর্ণ কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কটি প্রশস্তকরণ প্রকল্প হাতে নেয় ২০১৬ সালে যাত্রা হওয়া কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘হলিডে মোড়-বাজারঘাটা-লারপাড়া (বাসস্ট্যান্ড)’ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে ৪ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার সড়কের ব্যয় ধরা হয়েছে একশ ৮২ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৮ দশমিক ৭৮৫ টাকা। সড়ক নির্মাণ শেষে সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে আরও ৬৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কের নতুন অবয়ব দিতে সরকার ব্যয় করছে ২৫৮ কেটি ৮২ লাখ টাকা।

২০১৯ সালের ১৬ জুলাইয়ে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পাবার পর দরপত্র আহ্বান করে কউক। দু’ভাগে বিভক্ত প্রকল্পটিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়েছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) এবং তাহের ব্রাদার্স নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। এনডিই অনুমতি পেয়েছে ‘হাশেমিয়া মাদ্রাসা হতে হলিডে মোড়’ ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার কাজের। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২২ সালের জুলাই মাস কাজ বুঝে দেয়ার কথা তাদের। আর তাহের ব্রাদার্স পেয়েছে প্রকল্পের ‘হাশেমিয়া মাদ্রাসা হতে বাসস্ট্যান্ড’ ২ দশমিক ২১০ কিলোমিটার সড়কের কাজ। তারাও কাজ বুঝিয়ে দেবে একই সময়ে।  

কিন্তু ২০২০ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে কাজ শুরুর ১৪ মাস অতিক্রম হলেও এখনো ড্রেন তৈরির কাজও সমাপ্ত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠান দুটি। উল্টো পরিকল্পনাহীন খুঁড়াখুঁড়ির ফলে শহরের অভ্যন্তরে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আদালত ও সরকারি দপ্তর বেষ্টিত এলাকা হিসেবে সবচেয়ে কাহিল অবস্থা ‘হাশেমিয়া মাদ্রাসা হতে হলিডে মোড়’ সড়ক এলাকায়। কিছু কিছু স্থানে হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক দিয়েড্রেনের কাজ করা হচ্ছে। কচ্ছপগতির কাজে ভোগান্তি বেড়েছে পৌরবাসি, জেলা প্রশাসন অফিসে আসা সেবাপ্রার্থীদের। ঘটছে দূর্ঘটনাও। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী, গর্ভবতীরা।