নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন কক্সবাজারের কৃষক রহিম উল্লাহ 

নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন কক্সবাজারের কৃষক রহিম উল্লাহ 

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার, ২৭ এপ্রিল।। কৃষক রহিম উল্লাহ। কক্সবাজার জেলায় যিনি প্রথম বাণিজ্য বাউকুল চাষ করে সফল হন। যার কুল খেয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সন্তুোষ প্রকাশ করে তাকে পত্র দেন। 

তার বাগানের বাউকুল প্রেরণের জন্য ধন্যবাদ জানান মহামান্য রাষ্ট্রপতি। ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারী মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রেরিত পত্রে তাকে কর্মবীর মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।  রাষ্ট্রপতি তাঁর পত্রে উল্লেখ করেন, "প্রায় শুন্য থেকে শুরু করে আপনি আজ বিশাল বাউকুল বাগানের মালিক। অর্থনৈতিক ভাবে হয়েছেন স্বাবলম্বী। আমার বিশ্বাস আপনার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষ কৃষি পণ্য, ফল ও ফসল উৎপাদনে উৎসাহি হবেন এবং নিজের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।" এরপর তিনি প্রশংসায় ভাসেন নেট দুনিয়া।
কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়নের মধ্যম মাইজপাড়া গ্রামের হাজি আবদুল হকের ছেলে আলহাজ্ব রহিম উল্লাহ প্রকাশ কৃষক রহিম উল্লাহ।
প্রবাসী জীবন ছেড়ে কৃষিতে মনোনিবেশ করেন।
বিদেশে থাকাকালিন চ্যানেল আই এ শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান "হৃদয়ে মাটি ও মানুষ" অনুষ্ঠানটি দেখে উদ্বুদ্ধ হন কৃষিতে। বাউকুল,ধান ও মাছ চাষ করে এখন তিনি একজন সফল চাষী।


এবার নিজ নামে উদ্ভাবন করেছেন 'রহিম ধান'। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলে চাষীদের কাছে আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে নতুন জাতের এই ধান।
গত ৭ বছর ধরে তিনি নিজে এবং অন্যান্য চাষীদের মাধ্যমে চাষ করছেন নিজের উদ্ভাবন করা রহিম ধান। অন্যান্য জাতের ধানের চেয়ে উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকেরা এই ধানের প্রতি দিনদিন ঝুঁকছেন।
সফলতাও পাচ্ছেন তারা। এখন শুধু স্বীকৃতির অপেক্ষায়।
আল্লাহর দান বহুমূখি কৃষি খামারের ব্যানারে ঈদগাঁও এবং ঈদগড় এলাকায় সাড়ে ১২ একর বাউকূল, ৬০ একর মাছ চাষ ও ১৮ একর ধান চাষ করে আসছে রহিম উল্লাহ। তিনি নিজেকে কৃষক রহিম পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। চাষের পাশাপাশি ঈদগাঁও বাসস্ট্যান্ডের ঈদগড় রাস্তার মাথায় আল্লাহর দান বীচ বিতান নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন তিনি।
তারপর সংকরায়ণের মাধ্যমে রহিম ধান নামের নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছেন নিজেই। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পেলেও তাঁর উদ্ভাবিত 'রহিম ধান' চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা।
কৃষিই এখন রহিম উল্লাহ প্রকাশ কৃষক রহিমের জীবিকা। 
কৃষক রহিম। ৪২ বছরের রহিম উল্লাহ পড়াশোনা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি। তাতে কি, স্থানীয় মানুষদের কাছে এই রহিম যে ‘ধান গবেষক’। গত কয়েক বছরের চেষ্টায় সংকারায়ণ করে তিনি নিজের নামে নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন। এ ধান গত ৭ বছর ধরে নিজে এবং স্থানীয়ভাবে চাষ করা হচ্ছে।
কৃষক রহিম উল্লাহর উদ্ভাবিত রহিম ধান উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সইতে পারে। ফলনও ভালো। তুলনামূলক কম কীটনাশক ও সার প্রয়োগ করতে হয় এধানে।
কৃষক রহিম উল্লাহ বলেন, 
বর্তমানে দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় উচ্চ-ফলনশীল ধান রহিম ধান। কক্সবাজার জেলায় বিভিন্ন এলাকায় রহিম ধানের চাষ করা হয়েছে। বাম্পার ফলন হয়েছে।
পরীক্ষার জন্য চার বছর আগে ধান গবেষণা ইনস্টিটি ঢাকা গাজীপুর ও তিন বছর আগে
বীনা ময়মনসিংহে পাঠানো হয়েছে। এই রহিম ধানের জাত উদ্ভাবন করতে ৭ বছর সময় লেগেছে বলে তিনি জানিয়েছে।
তিনি জানান, 
মাঠ পর্যায়ে ৭ বছর ধরে রহিম ধান চাষ করছে। ফলনও ভালো হয়েছে। রহিম ধান জাতে চিকন। মিনিকেট চালের চেয়ে আরো চিকন। ৪০ শতক জমিতে ৩০/৩৫ মণ ধান উৎপাদন হয়। এই নতুন ধানের উদ্ভাবক তিনি নিজে। 
উদ্ভাবন করা ধানের নামও দেয়া  হয়েছে নিজের নামে। 
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডিজি 
শাহরিয়ার সহ অনেকে মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে ধানের ফলনে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
কৃষক রহিম উল্লাহ আরও বলেন, ২০১৯ সালে নিজের উদ্ভাবন করা ধানের স্বীকৃতি পেতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছি। কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি)  রহিম ধানের বীজ গবেষণাগারে পাঠান। এছাড়াও ধান গবেষণা ইনস্টিটি ঢাকা গাজীপুর তার 'রহিম ধান' সংগ্রহ করেন। ধান গবেষণা ইনস্টিটি ঢাকা গাজীপুরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তমা তলা আধিত্য রহিম ধানের কিছু বীজ চট্টগ্রামের আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলায় পাঠান। ফলন ভালো হয়েছে বলে শুনেছি। বীনাও তার রহিম ধান সংগ্রহ করেছেন। তবে আজ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তিনি।
কৃষক রহিম বলেন, 
কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার 
ঈদগড় বাইশারী, ঈদগাঁও, ইসলামাবাদের বোয়ালখালী এলাকায় সব চেয়ে বেশি ফলন হচ্ছে এই রহিম ধানের। অন্যান্য জাতের ধানের চাউলের চেয়ে দামে প্রতি কেজি ২৫/৩০ টাকা বেশি। 
কৃষক ৪০ শতক জমিতে চাষ করে বর্তমানে ৩৩ মণ ধান পাচ্ছে। অন্যান্য দেশীয় ধানের চেয়ে ৫ মণ বেশি উৎপাদন হচ্ছে রহিম ধানে। ৪০ শতক জমিতে 
অন্য জাতের ধান চাষ করে কৃষক পান ২৫/৩০ হাজার টাকা। আর রহিম ধান চাষ করে পাচ্ছেন ৫০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে ।
নতুন জাতের ধানের বাম্পার ফলনে খুশি কৃষক কুল। ঈদগাঁও ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বোয়ালখালী গ্রামের কৃষক আজিজুল হক ও মনিরুল হক মনির জানান, কৃষকরা যাতে কম খরচে এবং স্বল্প সময়ে অধিক ফসল ঘরে তুলতে পারেন সেজন্য অনেক কৃষক তার উদ্ভাবিত রহিম ধান চাষ করে উপকৃত হয়েছেন।
গত চার বছর ধরে ৮ জনে ২৫ একর জমিতে রহিম ধান চাষ করেছি। একই ভাবে পোকখালী ও ইসলামাবাদে ৪০ একর জমি চাষ করা হয়েছে রহিম ধান।
রহিম উল্লাহ বলেন, এই রহিম ধানের জীবনকাল 
বীজ তলা থেকে ধান কাটা পর্যন্ত ১৪৫ দিন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, আমন ও বোরো উভয় মৌসুমে রহিম ধান চাষ করা যাবে। তবে, বোরো মৌসুমের জন্য উচ্চ-ফলনশীল রহিম ধান। এর আরো বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ধানটা হবে চিকন, সুস্বাদু, মিনিকেটের মত জীবনকাল কিন্তু ফলন বেশি। আগামী দুই এক বছরের মধ্যেই কিছু কিছু কৃষকের কাছে ধানটা পৌছানো সম্ভব হবে বলে তিনি জানিয়ে ছিলেন।
এব্যাপারে কক্সবাজার সদর 
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহিদ হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। এবছরও নতুন জাতের উদ্ভাবনী ধান আবার পাঠানো হবে। 

বর্তমানে ধানটি ট্রায়ালে আছে।
তিনি আরও বলেন, ধান বীজ গবেষক রহিম উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে নতুন জাতের ধান নিয়ে তিনি কাজ করছেন। কৃষি বিভাগ সব সময়ই রহিম উল্লাহকে সব ধরনের সহযোগিতা করছে। তার প্লটের ধান আমিসহ অনেকে পরিদর্শন করেছেন। 
ধানের জাত উদ্ভাবনের বিষয়টি আসলে দীর্ঘ সময়ের ব্যাপারে। নতুন জাতের ধান নিয়ে গবেষণা অব্যাহত আছে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষক রহিম উল্লাহর ধান নিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা। স্বশিক্ষিত এই বিজ্ঞানীর কাজ আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। সঙ্করায়ণ করে নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন এই প্রান্তিক কৃষক রহিম । তার উদ্ভাবিত ধানের জাত স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।