নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দুঃসাহসিকতা: মোহাম্মদ হাসান 

নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দুঃসাহসিকতা: মোহাম্মদ হাসান 
ছবিঃ সংগৃহীত

জন্মগতভাবে প্রতিটি মানুষের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত গুণ রয়েছে। কারও কারও মধ্যে তা সুপ্ত থাকে। অনেকেই সুযোগের অভাবে যথার্থ দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের জন্য সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নেতৃত্ব মানেই যে প্রভুত্ব নয়, সে অনুভূতি একজন নেতার মধ্যে থাকতে হবে। নেতাকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বোধগম্য হতে হবে। তা না হলে অনুসারীরা লুটপাট ও নৈরাজ্যমূলক কাজে জড়িয়ে পড়বে। এতে সমাজের কোনো উন্নয়ন হবে না।

নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘আনরিজনেবলনেস’ বা দুঃসাহসিকতা। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের শূন্যতা ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রতিনিয়তই অভিযোগ শোনা যায়। আসলে নেতা কে ? নেতৃত্ব আসলে কী ? নেতৃত্ব মানে কি কর্তৃত্ব প্রয়োগ ? নেতৃত্ব প্রদর্শন আর দাফতরিক ক্ষমতা ব্যবহার কি এক ? নেতা হয়ে কি কেউ জন্মায়? নেতা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এমন কিছু ঘটান যা সাধারণভাবে ঘটার কথা নয়। বস্তুত যা স্বাভাবিকভাবে ঘটবে, তার জন্য নেতার প্রয়োজন হয় না, যে কোনো ব্যক্তিই তা করতে পারেন। সত্যিকারের নেতা অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয়, অভাবনীয় কিছু সৃষ্টি করেন। নেতা বড় কাজ করেন। অর্থাৎ ‘ইনক্রিমেন্টাল চেঞ্জে’র বা ক্ষুদ্র পরিবর্তনের জন্য নয়, বড় কিছুর জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন পড়ে।

নেতৃত্ব একটি শিল্প। একজন নেতাকে সৎ ও আত্মসচেতন হতে হবে। সৎ ও দক্ষ নেতৃত্বের গুণে কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে সমাজ। আর নেতৃত্ব বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এ ছাড়া প্রয়োজন রয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও। 

নেতৃত্বের অনেক গুণের মধ্যে প্রথমেই নিজের মধ্যে রাষ্ট্র ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার তাগিদ থাকতে হবে। নেতাকে সমাজের উপকারে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। তাছাড়া প্রত্যেক সংগঠনে অবশ্যই একজন নেতা থাকবেন। তাঁকে অন্যদের প্রেরণা দিতে হবে। তাঁর এমন কাজ করা উচিত, যাতে সমাজের ১০ জন মানুষ তাঁকে অনুসরণ করবে। আর একজন নেতার অন্যকে উৎসাহী করার ক্ষমতা থাকতে হবে। যদিও আমাদের এখানে নেতা আছেন; কিন্তু উৎসাহ দেওয়ার মতো মন-মানসিকতা নেই।

বাস্তববাদিতা নেতার গুণাবলির অংশ নয়, যদিও নেতা বাস্তবকে উপেক্ষা করেন না। নেতা বরং নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেন। নেতা সাধারণত অসম্ভবকে সম্ভব করেন। জর্জ বার্নার্ড শ’ বলেছেন, ‘রিজনেবল’ বা বাস্তববাদী মানুষেরা পৃথিবীর সঙ্গে নিজেদের খাপখাইয়ে নেন, দুঃসাহসী মানুষ পৃথিবীকে পরিবর্তন করেন আর পৃথিবীর সব অগ্রগতিই দুঃসাহসী মানুষের ওপর নির্ভর করে। তাই সত্যিকারের নেতা শুধু সাহসীই নন, তিনি দুঃসাহসীও। বস্তুত পৃথিবীর ইতিহাস অনেক দুঃসাহসী মানুষেরই ইতিহাস, যারা বাক্সবন্দি বা প্রথাগত চিন্তার বাইরে আসতে পেরেছেন। সব সমস্যাকে ভিন্নভাবে বা নতুন করে দেখতে পেরেছেন। আর দুঃসাহসিকতাই নেতাকে অসাধারণ করে।নেতা হয়ে কেউ জন্মান না। নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের বিষয় নয়। নেতৃত্ব জোর করেও অর্জন করা যায় না।

নেতৃত্ব ‘অথরিটি’ বা কর্তৃত্বের বিষয় নয়। হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা আর নেতৃত্ব এক কথা নয়।নেতৃত্ব হল এমন এক সামাজিক প্রভাবের প্রক্রিয়া যার সাহায্যে মানুষ কোনও একটি সর্বজনীন কাজ সম্পন্ন করার জন্য অন্যান্য মানুষের সহায়তা ও সমর্থন লাভ করতে পারে। জিনতত্ত্ববিদের এলান কিথ মতে, "নেতৃত্ব হল মানুষের জন্য একটি পথ খুলে দেওয়া যাতে তারা কোনও অসাধারণ ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান রাখতে পারে।" কেন অগবন্নিয়ার কথায় "প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক লক্ষে পৌঁছনোর জন্য অন্তর্বর্তী ও বাহ্যিক পরিবেশে প্রাপ্ত সম্পদকে সফলভাবে সমন্বয় সাধন করাও তা থেকে সর্বাধিক লাভ তোলার ক্ষমতাই হল কার্যকরী নেতৃত্ব।" কার্যকর নেতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অগবন্নিয়া বলেন "যে কোনও পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে সফল হওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং কোনও সংস্থা বা সমাজের প্রত্যাশা পূরণকারী হিসেবে স্বীকৃতি পান", তিনিই কার্যকর নেতা। কিন্তু নেতৃত্বের সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া বেশ কঠিন।

লেখকঃ মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।