নানা কৌশলে মানব পাচার, নিঃস্ব সাধারণ মানুষ

নানা কৌশলে মানব পাচার, নিঃস্ব সাধারণ মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা।। নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও কোনোভাবে ঠেকানো যাচ্ছে না মানবপাচার। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে মানবপাচার হচ্ছে। স্বপ্নের দেশে পৌঁছে দেয়ার মিথ্যা আশ্বাসে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে শত শত নিরীহ যুবক-যুবতী। ইউরোপ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে দেয়ার মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে গ্রামাঞ্চলের নিরীহ যুবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মানবপাচারকারী দালাল চক্র। এসব দালাল চক্রের সাথে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রও জড়িত রয়েছে। ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ না জুটলেও অনেককেই মাসের পর মাস কারাবন্দি থাকতে হচ্ছে। আর না হহলে দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানব চক্রের আট গ্রুপের সন্ধানে মাঠে নেমেছে র‌্যাব, সিআইডি ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম। পাচারকারী সিন্ডিকেট ভ্রমণ ভিসায় বিদেশগামীদের ভারত, নেপাল, দুবাই, মিসর ও জর্দান ঘুরিয়ে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের পাচার করছে। মানবপাচারের সঙ্গে রাজধানীসহ ১৫ জেলার অন্তত ৮টি গ্রুপ জড়িত। গত বছরের ২৭ মে লিবিয়ার মিজদায় ২৬ জনকে গুলি করে হত্যার ২৫টি মামলার তদন্তে এমনই তথ্য পেয়েছে র‌্যাব, সিআইডি ও পুলিশের কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি দুবাইয়ে ১৯ মাস মানবেতর জীবনযাপন করে দেশে ফিরে আসেন মো. মিজানুর রহমান শাওন নামের একজন ভুক্তভোগী। তার চাচাতো ভাই মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত ২০১৯ সালে মো. আবু বক্কর সিদ্দিক নামের একজন দালালের মাধ্যমে মিজানুরকে ইউরোপে পাঠাতে ১৫ লাখ টাকা দেয়া হয়। এরপর আবু বক্কর চাচাতো ভাই মিজানুরকে প্রথমে দুবাই পাঠান। সেখানে দুই মাস থাকতে হবে বলে জানান। সেখান থেকে ভিসা নিয়ে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলা হয়। কিন্তু এরপর আর ইউরোপে পাঠাতে পারেননি। দুবাইতে ১৯ মাস মানবেতর জীবনযাপন করে মিজানুর নিজ টাকায় আবার দেশে ফিরে আসেন। দুবাইতে থাকাকালীন খাওয়া থাকা না পেয়ে মিজানুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরেন। দেশে আসার পর তার চিকিৎসা চলছে। এই ঘটনায় আবু বক্করের বিরুদ্ধে রাজধানীর কাফরুল থানায় গত ১২ নভেম্বর একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে মিজানুরের চাচাতো ভাই দেলোয়ার। পাশাপাশিগত ১৩ নভেম্বর তিনি র‌্যাব-১ এ একটি অভিযোগ করেছেন।  
জিডি ও অভিযোগে রাজধানীর কাফরুলের সেনপাড়া, পর্বতা এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার উল্লেখ করেছেন, রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ১১ নম্বর রোডের বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে গত ২০১৮/১৯ সালে মিজানুরকে ইউরোপে (ইটালী বা ফ্রান্স) পাঠানোর কথা হয়। এরপর আবু বক্কর পাঠাতে পারবেন অঙ্গীকার করে বিভিন্ন সময় নগদ ও চেকের মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা নেন। পরে মিজানুরকে প্রথমে দুবাই পাঠান। সেখান থেকে ইটালী বা ফ্রান্সে পাঠানোর কথা ছিলো। কিন্তু আবু বক্কর সেই দুটি দেশে পাঠাতে পারিননি। পরে তার কাছে ইউরোপে পাঠানো বাবদ দেয়া ১৫ লাখ টাকা ফেরত চাইলে তিনি দেলোয়ারকে বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিচ্ছেন। পাওনা টাকা ফেরত ও জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে দেলোয়ার আইনগত সহায়তা চেয়েছেন।   
দেলোয়ার বলেন, বিদেশে গিয়ে উন্নত জীবনযাপন করবে এমন আশায় জামানো কিছু টাকার পাশাপাশি ঋণ করেও বেশকিছু টাকা যোগাড় করেন মিজানুর। এখন নিঃস্ব হয়ে গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনি আরও বলেন, মিজানুরের সঙ্গে কথা বলে বুঝা যায়নি যে, সে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। তার মিস্টি কথায় প্রলুদ্ধ হয়ে এখন বিপদে পড়েছেন মিজানুর। এর আইনগত সমাধান চাই।
মানবপাচার চক্রের সদস্য আবু বক্করের দেয়া একটি চিরকুট দেখান দেলোয়ার। চিরকুটে উল্লেখ রয়েছে, ‘ঢাকা টু দুবাই ভিজিট ভিসা ১৫.০৩.২১। দুবাই যাওয়ার পর দুইমাস থাকবে।এর মধ্যে দুবাইয়ের পার্টনার ভিসা হবে। তারপর ইউরোপের ভিজিট ভিসা নিয়ে ইউরোপে ঢুকবে। সম্পূর্ণ কাজটাই আমাদের’।  
মিজানুরের মতো একইভাবে মানবপাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে হারুন, রায়হান, নাজিম ও রানা নামের চার যুবকে সন্ধান পাওযা গেছে। তারাও আবু বক্করের কথায় প্রলুদ্ধ হয়ে ইউরোফে যেতে ঋণ করে মিজানুরকে দিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু কাঙ্খিত দেশে যেতে না পারেননি। উল্টো হয়েছেন নিঃস্ব। ঋণ করায় পাওয়ানাদারদের চাপ ও আবু বক্করের কাছ থেকে টাকা ফেরত না পেয়ে প্রচন্ড মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। সঙ্গে পরিবারও পড়েছে বিপদে।
নোয়াখালি জেলার সোনাইমুরি উপজেলার নাজিমুদ্দিন বলেন, কানাডা, জার্মানি, ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছে। কিন্তু নিতে পারে নাই। আমার কাছ থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা নিয়েছিল। পাঁচ বছর আমাকে ঘুরিয়েছে। কিন্তু বিদেশে নিতে পারে নাই। অনেক কষ্টে কিছু টাকা উঠিয়েছি। এখনো টাকা পাই।
আরেক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই ব্যক্তির মুখে মিষ্টি। সুন্দর সুন্দর কথা বলে মানুষকে ফাঁদে ফেলে। আমাকে ইউরোপ পাঠানোর কথা বলে ৪ লাখ টাকা নিয়েছে। পাঁচ বছরে নিতে পারেনি। অনেক কষ্টে ২ লাখ টাকা উঠিছি। দরিদ্র বাবা মা ঋণ করে টাকা দিয়েছে। এখন চাকরি করে সেই ঋণ শোধ করতে হচ্ছে।   

কাফরুল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমার থানায় প্রতিদিন বহু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়। দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। আমরা চেষ্টা করি ভুক্তভোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে। 

মানবপাচার চক্রের বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, দালালরা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। চক্রের মূল হোতারা দেশের বাইরে বসে অনলাইন ভিসা ও বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করে। মানব পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করছে র‌্যাব। এ চক্রের মুলহোতাদের গ্রেফতারে র‌্যাব সারাদেশে সক্রিয় রয়েছে। তবে মানবপাচারকারী চক্রের হাত থেকে রক্ষা পেতে সকলকে সচেতন হতে হবে।