নব বিবাহিতা স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা, মৃত্যুদন্ডের ভয়ে ২১ বছর পালিয়ে গ্রেফতার

নব বিবাহিতা স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা, মৃত্যুদন্ডের ভয়ে ২১ বছর পালিয়ে গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

স্পেশাল করেসপনডেন্ট।। মোহাম্মদ আরিফ হোসেন ।। মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকায় চাঞ্চল্যকর আগুনে পুড়িয়ে আম্বিয়া হত্যা মামলার দীর্ঘ ২১ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী আলম’কে রাজধানীর বংশাল হতে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪।

 ১৩ আগস্ট দিবাগত রাতে রাজধানীর বংশাল এলাকায় র‌্যাব-৪ মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকায় পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে গৃহবধু আম্বিয়া হত্যা মামলার দীর্ঘ ২১ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী মোঃ আলম (৪০)’কে গ্রেফতার করে। 

এ বিষয়ে র‍্যাব ৪ মিডিয়া সেন্টারে এক প্রেস ব্রিফিং এ র‍্যাব-৪ অধিনায়ক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান,  গ্রেফতারকৃত আসামীর সাথে ঘটনার প্রায় ০৩ মাস পূর্বে ২০০১ সালের জুন মাসে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানাধীন আটিপাড়া গ্রামের জনৈক মোঃ মকবুল হোসেন এর মেয়ে আম্বিয়া বেগম (১৮) এর সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। বিয়ের সময় আম্বিয়ার বাবা সামর্থ্য অনুযায়ী আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিকস সামগ্রী, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার প্রদান করে। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে প্রায়ই তার নব-বিবাহিতা স্ত্রী  আম্বিয়া’কে মারধর করত। একপর্যায়ে আসামী আলমসহ আসামির বাবা-মা ও নিকট আত্মীয়-স্বজন ভিকটিমের পরিবারের নিকট আরো ৫০,০০০ টাকা যৌতুক দাবি করে। দাবীকৃত যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় আসামি আম্বিয়াকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। আম্বিয়ার বাবা বিষয়টি জানতে পেরে ধার দেনা করে আসামিকে ১০,০০০ টাকা প্রদান করে। কিন্তু যৌতুকের বাকি টাকা পাওয়ার জন্য আসামী নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে ঘটনার ১০/১২ দিন পূর্বে আসামি আম্বিয়াকে মারধর করে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয় এবং যৌতুকের ৪০,০০০ টাকা না নিয়ে আসলে তাকে বাড়িতে উঠতে দেবে না বরং মেরে ফেলবে মর্মে হুমকি দেয়।

ঘটনার দিন ০৫ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখ দিবাগত রাত ১১:৩০ টার সময় আসামী আলম তার স্ত্রী আম্বিয়ার বাবার বাড়িতে এসে তাকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে বাড়ি থেকে ৩০০ গজ দূরে ফাঁকা রাস্তায় নিয়ে চর, থাপ্পর, কিল, ঘুষি মারতে থাকে। নির্যাতনে আম্বিয়া একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পরে। তখন আসামী পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সংগ্রহ করে রাখা পেট্রোল আম্বিয়ার গায়ে ঢেলে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

সে সময় আম্বিয়ার চিৎকার এবং আর্তনাদে তার মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনসহ আশপাশের প্রতিবেশীরা এসে আগুন নিভায় এবং গুরুতর অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় আম্বিয়াকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে সিংগাইরের সেবা ক্লিনিকে নিয়ে যায়। রোগীর গুরুতর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে উক্ত ক্লিনিকের চিকিৎসকগণ ভিকটিমকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ০৬ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখ সকাল ০৮:০০ টায় আম্বিয়ার মৃত্যু হয়।

পরবর্তীতে রমনা থানা পুলিশ আম্বিয়ার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে এবং ০৭ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখ তার বাবা মোঃ মকবুল হোসেন বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আসামী আলম, উক্ত আসামির বাবা মোঃ রহিজ উদ্দিন, মা আলেয়া বেগম, আলমের বোন জামাই রবিউল, আলমের চাচাতো নানা আফতাবসহ সর্বমোট ০৫ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে যার মামলা নং-০৪(১)০১, ধারা-২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এর ধারা ১১(ক)/৩০।

মামলার পর হতে অদ্যবধি আসামী আত্মগোপনে থাকায় থানা পুলিশ মূল আসামী আলমকে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়। মামলার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামী আলমের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট প্রদান করেন এবং এজাহারনামীয় বাকি ০৪ জন আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চার্জশীট থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। পরবর্তীতে চার্জশিটের ভিত্তিতে মানিকগঞ্জ জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন স্পেশাল ট্র্যাইবুনাল এর বিজ্ঞ বিচারক উক্ত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন এবং পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ভিকটিম আম্বিয়াকে হত্যাকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ৩০/১১/২০০৩ তারিখ চার্জশিটে অভিযুক্ত আসামী আলমকে মৃত্যুদন্ড সাজা প্রদান করেন। পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য মামলা উচ্চ আদালতে গেলে মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ গত ০৬/০৭/২০০৬ তারিখ আসামী আলম এর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে রায় প্রদান করে। উক্ত ঘটনার পর হতে আসামি আলম দীর্ঘ ২১ বছর পলাতক ছিলো।

তিন আরো জানান, ব্যক্তিগত জীবনে আলম ০২ টি বিয়ে করেছে। প্রথম স্ত্রী ভিকটিম আম্বিয়াকে আসামী বিয়ের ০৩ মাসের মধ্যে আগুনে পুড়িয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করে এবং এই ঘটনার ০৫ বছর পর পুনরায় ঢাকার বংশাল এলাকায় নিজের নাম ঠিকানা গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করে। বর্তমানে আসামী আলম তার দ্বিতীয় স্ত্রী সূমী (৩৫)’কে নিয়ে ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় বসবাস করে আসছিলো। বর্তমান পরিবারে তার মহিন (১৫) নামের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ২০০১ সালের পর থেকে আসামী আর কোনোদিন মানিকগঞ্জে যায়নি। 

হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে গত ২১ বছর ধরে আসামী আলম এনআইডিতে নিজের নাম ঠিক রেখে বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন করে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে ও বিভিন্ন পেশা পরিবর্তন করে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিল।  গত কিছুদিন যাবৎ সে বংশালে একটি জুতার কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আসছিলো।

প্রেস ব্রিফিং এ অন্যান্যদের মধ্যে র‍্যাব-৪,  সিপিসি-৩ কমান্ডার মো. আরিফ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। 

গ্রেফতারকৃত আসামিকে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে