পাইপ লাইনের গ্যাস পাবে উত্তরের ১১ জেলা

পাইপ লাইনের গ্যাস পাবে উত্তরের ১১ জেলা

তৌহিদুল ইসলাম, নিউজ করেসপনডেন্ট।। উত্তরের কৃষি সমৃদ্ধ জেলা রংপুর। এ জেলায় পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের দাবি ছিল বহু দিনের। ২০১১ সালে রংপুর সফরে এসে সেই দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপরই রংপুর বিভাগের তিন স্থানে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একনেক সভায় ‘রংপুর, নীলফামারী, পীরগঞ্জ শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি ঘিরে প্রাকৃতিক গ্যাস পেতে স্বপ্নে বিভোর রংপুরবাসী। ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহের পাইপ লাইন বসানোর কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

যদিও এই গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইনটির কাজ ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে এ বছরের ডিসেম্বর করা হয়েছে।

এখন শুধু রংপুরই নয়, খুব শিগগির গ্যাস পেতে যাচ্ছে উত্তরের ১১টি জেলা। এজন্য বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে সৈয়দপুর পর্যন্ত পাইপ লাইন বসানো হচ্ছে, যা প্রায় শেষের পথে। ইতোমধ্যে ১৪৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের মধ্যে ১৪০ কিলোমিটারের নির্মাণ কাজ শেষ। বাকি কাজ দ্রুতই শেষ হবে।

৩০ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ সম্পন্ন এই পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পৌঁছে যাবে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের ১১টি জেলায়। এমন তথ্যই জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার ওয়াদা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটা বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের হাত ধরে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা দূর হয়েছে। এবার শিল্পায়নের পালা। গ্যাস সংযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে শিল্প-কারখানা, ইপিজেড, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কৃষি পণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার। বাড়বে কর্মসংস্থান। সমৃদ্ধ হবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান তথা বাংলাদেশের অর্থনীতি।’

এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের পাশ দিয়ে স্থাপন করা হয়েছে গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণের পাইপ লাইন। একই উপজেলার ভবানীপুর ও বলদিপুকুর এলাকায়ও দেখা গেছে গ্যাস সরবরাহ পাইপ লাইন স্থাপনের কর্মযজ্ঞ। রংপুর সদর উপজেলাসহ বদরগঞ্জ সড়কেও চোখে পড়েছে গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতাধীন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বগুড়া থেকে পীরগঞ্জ হয়ে রংপুর ও সৈয়দপুর পর্যন্ত পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের অক্টোবরে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ থাকলেও ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে এক হাজার ৩৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। জিটিসিএল এখানে ১০ কোটি তিন লাখ টাকা খরচ করবে। বাকি টাকা দেবে সরকার।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় (বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে সৈয়দপুর) ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ১৫০ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপ লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। ১০০ এমএমএসসিএফডি সিজিএস (সিটি গেট স্টেশন) ৫০ (রংপুর) এবং ২০ (পীরগঞ্জ) এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন টিবিএস (টাউন বর্ডার স্টেশন) স্থাপন করা হবে। এজন্য ৩০৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

রংপুরবাসীর স্বপ্নের এই সঞ্চালন পাইপ লাইনের পাশাপাশি বিতরণ লাইন নির্মাণের পৃথক একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পের আওতায় ১০০ কিলোমিটার থাকবে বিতরণ লাইন। এর মধ্যে রংপুর শহরে ৪৪ কিলোমিটার, পীরগঞ্জে ১০ কিলোমিটার এবং নীলফামারী ও উত্তরা ইপিজেড এলাকায় ৪৬ কিলোমিটার অংশ রয়েছে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় কারা কারা গ্যাস পাবেন এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে গ্যাস সরবরাহে পাইপ লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় খুশি রংপুরবাসী। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাসহ ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের। এজন্য বহুবার হরতাল, মিটিং-মিছিলও হয়েছে। এখন সবার দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হোক।

রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হবে। দারিদ্র্যতার বৈষম্য দূর হবে। পীরগঞ্জ থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে অনেক দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তা প্লট ক্রয় করে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিলন বলেন, গ্যাস এলেই এ অঞ্চলে শিল্প বিপ্লব ঘটবে। এছাড়া প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুর এলাকায় এক হাজার একর জমির ওপর বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে উঠবে। তবে, কবে নাগাদ রংপুরে গ্যাস আসবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ গ্যাস সরবরাহের মূল কাজ এখনও শুরু হয়নি। আমরা চাই দ্রুত রংপুরে গ্যাস সরবরাহ করা হোক।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ভৌগোলিকভাবে রংপুর এবং নীলফামারী গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তারপরও প্রাকৃতিক গ্যাসপ্রাপ্তির সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বর্তমানে জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার ১৭৬ এমএমসিএফডি, যা মোট প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় গ্যাস ব্যবহারের এই বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিল্পের উন্নয়নের জন্য রংপুর ও নীলফামারী জেলায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা প্রয়োজন।
#সুত্র: dhaka post