প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলো ‘নোনা জলের কাব্য‘

প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলো ‘নোনা জলের কাব্য‘
ছবিঃ সংগৃহীত

আজকাল বাংলা ডেস্ক।। এই বছরের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্রের মাঝে অন্যতম, ‘নোনা জলের কাব্য’ ২৬ নভেম্বর ২০২১ এ বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। ঢাকা শহরে ছবিটি প্রদর্শিত হবে স্টার সিনেপ্লেক্স - এর সকল শাখায়, শ্যামলী সিনেমা ও ব্লকবাস্টার মুভিজ-এ। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের সিনেমাস্কোপ, চট্টগ্রামের সিলভারস্ক্রিন ও সুগন্ধা সিনেমা এবং বগুড়ার মধুবন- এসকল প্রেক্ষাগৃহেও ছবিটি প্রদর্শিত হবে। 

২৫ নভেম্বর, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-এ সংবাদ মাধ্যম এর সদস্যদের জন্য ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। টিভি, প্রিন্ট, অনলাইন ও অন্যান্য মাধ্যমের সাংবাদিক ও অন্যান্য সদস্যরা এই প্রদর্শনীতে যোগ দেন। ছবির পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত, অভিনেতা তাসনোভা তামান্না ও অন্যান্য কলাকুশলীরা প্রদর্শনীর শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করেন। ২৫ নভেম্বর রাত ৮ টায়, স্টার সিনেপ্লেক্স – এর এসকেএস টাওয়ার শাখায় ছবিটির গালা প্রিমিয়ার আয়োজিত হয়। বিশিষ্ট অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর, আলমগীর, সাহিত্যিক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান মাহমুদ, তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী কে এম খালিদ, পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এমডি. শাহরিয়ার আলম, এবং ছবির কলাকুশলী সহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। 
দীর্ঘ ৭ বছরের যাত্রা শেষে মুক্তি পেলো পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত এর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নোনা জলের কাব্য’। অনুষ্ঠানে তিনি বেশ আবেগপ্রবন হয়ে পরেন। তিনি বলেন, “নোনা জলের কাব্য- আমার সত্ত্বার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমি নিজে এই ছবির নির্মাণের সাথে সাথে আরও পরিপক্ক হয়ে উঠেছি। বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছবিটি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছে, এমনকি COP26 এও প্রশংসা কুড়িয়েছে। সম্প্রতি আমরা পটুয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে তিনটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম যার প্রত্যেকটি সফল হয়েছে। নোনা জলের কাব্য- জেলেদের নিয়ে নির্মিত ছবি, তাই প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের আগে তারাই এটি সবার আগে দেখেছে। নিজেদের জীবনের গল্পকে পর্দায় দেখে তারাও আমারই মত আবেগাপ্লুত হয়ে পরে। আমি আশা করবো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রেমীরা আমার প্রথম ছবিটি পছন্দ করবেন। তারা হলে গিয়ে ছবিটি দেখবেন। এই ছবির মাধ্যমে আমি শুধু জলবায়ু যোদ্ধাদের জীবনেই পরিবর্তন আনতে চাই না, বরং ধর্ম সংক্রান্ত সহিংসতা বন্ধের জন্যও ভূমিকা রাখতে চাই।”
‘নোনা জলের কাব্য’ ছবিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু, শতাব্দী ওয়াদুদ, তিতাস জিয়া, এবং তাসনোভা তামান্না। আবহ সংগীত পরিচালনা করেছেন অর্ণব। এই ছবির টাইটেল স্পন্সর ফ্রেশ এবং পরিবেশক স্টার সিনেপ্লেক্স।

‘নোনা জলের কাব্য’ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
লন্ডন, বুসান, গুটেনবার্গ, সাও পাওলো, তুরিন, সিয়াটেল, সিঙ্গাপুরসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে 'নোনাজলের কাব্য'। তবে সবচেয়ে বড় খবর চলচ্চিত্র উৎসবের গন্ডি পেরিয়ে 'নোনাজলের কাব্য' পাড়ী জমিয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP26-এ। স্কটল্যাণ্ডের গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ এই আসরে নভেম্বরের ৮ তারিখে আইম্যাক্স থিয়েটারে দেখানো হয় বাংলাদেশের এই চলচ্চিত্র। এই সম্মেলনে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ও। এছাড়াও একই শহরে জাতিসংঘের COY16 সম্মেলনে অক্টোবরের ২৯ তারিখ দেখানো হয় 'নোনাজলের কাব্য'।
দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রান্তিক জেলেদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, আবহাওয়ার প্রতিকূলতার মুখে টিকে থাকার লড়াই এবং তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কার এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়। সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংস্কৃতির প্রসার এবং পরিবেশের অনাকাঙ্খিত পরিবর্তন রোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে চলচ্চিত্র তথা বিনোদন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে – এই বিশ্বাস নিয়েই পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত নির্মাণ করেছেন ‘নোনা জলের কাব্য‘। তিনি বলেন, “ছবিটি নির্মাণ করতে আজ থেকে তিন বছর আগে আমি গিয়েছিলাম পটুয়াখালীর প্রত্যন্ত এক জেলেপাড়ায়। খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, উপকূলবর্তী সেই গ্রামটির এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মহামারীর কারণে প্রায় ১.৫ বছর আমার সেখানে যাওয়া হয়ে উঠে নি, কিন্তু এবার যখন পরিচিত সেই জায়গার খোঁজে, প্রিয় সেই মানুষগুলোর খোঁজে গেলাম, গিয়ে দেখি সেখানে কেবলমাত্র কিছু গাছপালা ভেঙে পরে রয়েছে, জোয়ারের পানি উঠবে উঠবে ভাব। জানতে পারলাম এই অঞ্চলে গত ২-৩ বছর যাবৎ সমুদ্রের পানির উচ্চতা খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে। জোয়ারের তীব্রতা তো রয়েছেই, গতবছর ঘূর্ণিঝড় আম্ফান-ও অনেক ক্ষতি করেছে।”
এসকল প্রতিকূলতা গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে তেমন একটা নেতিবাচক প্রভাব না ফেললেও, হারিয়ে যাচ্ছে অনাদিকাল থেকে চলে আসা এসকল প্রান্তিক জেলেদের উপার্জনের পন্থা। জেলেরা হারিয়ে ফেলছে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার ক্ষমতা। জীবিকার তাগিদে ধীরে ধীরে তারা পাড়ি জমাতে শুরু করেছে শহরাঞ্চলে। 
সুমিত বলেন - “'নোনাজলের কাব্য' ছবিতে যে সকল জেলে ভাই বোনেরা অভিনয় করেছিলেন, তাদের কারও কারও সাথে আমার এবার দেখা হয়েছে। তাদের মুখে শুনেছি ইলিশ মাছও নাকি এখন অপ্রতুল। শুনে বুঝলাম তাদের জীবনের এই কঠিন বাস্তবতা আমার সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়েছে। সংগ্রামী এই মানুষগুলোর গল্প বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা খুব জরুরি, সেই সূত্রেই জাতিসংঘের জলবায়ু কনফারেন্সে আবেদন করা। আয়োজকদের আমি বিশেষ ধন্যবাদ দিতে চাই, কারণ তারা আমার ছবিকে, এবং আমার ছবির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছেন। 'নোনাজলের কাব্য' জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখ যুদ্ধের এক উপাখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।”
জনপ্রিয় অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু বলেছেন – “আমি সিনেমায় ‘চেয়ারম্যান’ এর ভূমিকায় অভিনয় করেছি। একটি চমৎকার আবহে কাজটি করার সুযোগ হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, সততার এবং নিষ্ঠার সহিত সাথে কাজ করলে, একটি সিনেমা মানসম্মত হয়। আমি আশাবাদী, ‘নোনাজলের কাব্য’ আমাদের দেশের চলচ্চিত্র আঙ্গিনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। আমি আপামর সিনেমাপ্রেমীদের অনুরোধ করবো, আপনারা সিনেমা হলে আসবেন এবং আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি করা এই ছবিটি বড় পর্দায় দেখবেন।” 
'নোনাজলের কাব্য' প্রযোজনা করেছেন রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত ও ফরাসি প্রযোজক ঈলান জিরার্দ। জিরার্দ, ‘মার্চ অব দ্য পেঙ্গুইন‘, ‘গুডবাই বাফানা‘, ‘ফাইনাল পোর্ট্রেট‘-এর মতো বিখ্যাত কিছু চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন লস অ্যাঞ্জেলসে বসবাসরত থাই শিল্পী চানানুন চতরুংগ্রোজ, তিনি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্পিরিট অ্যাওয়ার্ড-এর মনোনয়ন পেয়েছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে ছবিটির নির্মাণ সহযোগী প্রতিষ্ঠান নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর হাফ স্টপ ডাউন। সম্পাদনা করেছেন আমেরিকার ক্রিস্টেন স্প্রাগ, রোমানিয়ার লুইজা পারভ্যু ও ভারতের শঙ্খ। শব্দ ও রঙ সম্পাদনার কাজটি হয়েছিল প্যারিসের দুটি বিখ্যাত স্টুডিওতে।