প্রতিবন্ধিদের প্রতি: সামাজিক দায় ও দায়িত্ব

প্রতিবন্ধিদের প্রতি: সামাজিক দায় ও দায়িত্ব
ছবিঃ সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম।।বাংলা সাহিত্যে নারী জাগরণের অমর কবি কামিনী রায় তার ’সুখ’ কবিতায় বলেন- নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ? এ ধরা কি শুধু বিষাদময়? যাতনে জ¦লিয়া,কাঁিদয়া মরিতে,কেবরই কি নর জনম লয়?... পরের কারনে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও; তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও। আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে,আসে নাই কেহ অবনী-’পরে। সকলের তবে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

ভূমিকা: মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব। সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর কিচুই নাই। কবি সাহিত্যকদের এই সতসিদ্ধভেদবাক্যকে বুকে ধারন করেই আমরা সমাজে সবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করবো এটাই মানবতা। আমাদের চারপাশে এমন কিছু মানুষ আছে যারা শারিরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ এবং অসহায় হয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে আর্তমানবতার জীবন যাপন করেন। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে তাদের বেঁচে থাকা অনেক বেশি করুণ এবং বেদনাদায়ক। বিশেষভাবে সক্ষম বা প্রতিবন্ধিদের প্রতি আমাদের সকল্রেই সামাজিক দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা আরো জানি মানুষ সামাজিক জীব। সমাজই মানুষের গড়া প্রথম প্রতিষ্ঠান। পরস্পর নির্ভরশীলতা ছারা মানুষের সামাজিক জীবন সুখকর হইতে পারে না। তাই সমাজে সামর্থবান মানুষগুলো যদি প্রতিবন্ধিদের কল্যানে তাদের সহযোগীতার হাতকে প্রসারিত না করে তাহলে তাদের জীবন আরো অসহায় হয়ে পরবে। বেঁেচ থাকার তাগিদে মানুষই সমাজ গড়েছিলো এবং এখনো তারা সমাজে একে অপরের সহযোগীতা ছারা বেঁেচ থাকতে পারবে না। তাই বিশেষভাবে সক্ষমভাবে বা প্রতিবন্ধিদের উপর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা আমাদের সকলেই সামাজিক দায় ও দায়িত্ব।
প্রতিবন্ধি নির্বাচন: ’প্রতিবন্ধি’ শব্দের আবিধানিক অর্থ বাধাগ্রস্থ ব্যক্তি।দর্ভাগ্যবশত প্রতিবন্ধিদের স্বাভাবিক বিকাশের পথ পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারনে রুদ্ধ হয়ে যায়। সাধারনত শারিরিক ও মানসিক দুভাবেই প্রতিবন্ধি হইতে পারে। জন্ম থেকেই কেউ কেউ প্রতিবন্ধি হইতে পারেন আবার জন্মের পর কোন দুর্ঘটনার কারনেও প্রতিবন্ধি হইতে পারেন। প্রতিবন্ধি আরো ভিন্নভাবে ও হইতে পারে। যেমন- চিন্তশক্তিহীন,স্মরণশক্তিহীন,পঙ্গু,দৃষ্টিশক্তিহীন,শ্রবণশক্তিহীন,খোড়া,বামন ইত্যদি।
প্রতিবন্ধিদের সমস্যা: বিশেষভাবে সক্ষম বা প্রতিবন্ধিদের জীবনে নানামুখী সমস্যা রয়েছে। তাদের এই সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা খুবই কষ্টকর ও বেদনাদায়ক। তাদের এই ব্যক্তিগত সমস্যকে ছাপিয়ে আরো প্রকট ও বোঝা হয়ে ওঠে পারিবারিক ও সামাজিক নেতিবাচক দুষ্টিভঙ্গি ও অবহেলা। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাস্ট্রে তারা নানাবিধ বৈষম্যের শিকার হন। প্রতিবন্ধিদের প্রতি করুনা,উপহাস,মর্যাদাহীন জীবনযাপন তাদেরকে মানসিকভাবে কুড়ে কুড়ে খায়। জীবন চলার পথে তারা সমানভাবে তালমিলিয়ে চলতে পারে না। সমাজে তারা যেন অতিরিক্ত- এ ধারনা তাদেরকে আরো বেশি প্রতিবন্ধি করে তোলে। তারা যেন হতাশার সাগরে নিমজি¦ত হয়। পারিবারিক,সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কিংবা সারা দুনিয়ার আনন্দ মঞ্চে তারা থাকে চরমভাবে উপেক্ষিক। ভালোবাসাহীন,অনাদর, উপেক্ষা এদর অভিশপ্ত জীবনকে ঠেলে দেয় আরো অনিশ্চয়তার পথে। তারা সমাজে চরম হতাশা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে।
প্রতিবন্ধি হওয়ার কারন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(who) জরিপ অনুযায়ী পৃথিবীর শতকরা প্রায় ১০ ভাগ লোক কোন না কোনভাবে প্রতিবন্ধি।এই ধরনের প্রতিবন্ধি নানা কারনে হইতে পারে।যেমন- জন্মগত,অপুষ্টিজনিত,অসুস্থতাজনিত ও দুর্ঘটনাজনিত। আবার গর্ভ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতির কোন অসুবিধা থেকেও হইতে পারে। গর্ভকালে জন্মের সময় ও জন্মপরবর্তী রোগব্যাধি,পোলিও,টাইফয়েড,রিকেট ইত্যদি রোগ,অপুষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অজ্ঞত কোন কারনে প্রতিবন্ধি হইতে পারে।
সমাজে প্রতিবন্ধি ও তাদের উন্নয়ন: ১৯৮২ সালে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধি ব্যক্তিদের জীবনযাপনের অগ্রগতি,উন্নয়ন ও বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে বিশ্বজনিন কর্মসুচি ও আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধি দশক ঘোষনা করেন। জাতিসংঘের উদ্যেগেই প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধি দিবস উদযাপিত হয়। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায়,বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিরা পরিবার ও সমাজে চরমভাবে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধির সংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান এখনো নিশ্চিত হয়নি। তারপরও ২০১০ সালে বেসরকারি এক গবেষণা মতে দেশে প্রতিবন্ধির সংখ্যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখ। এদিকে ২০১১ সালের আদমশুমারীতে প্রতিবন্ধি জরিপের বিষয়টি প্রথম সংযুক্ত হয়েছে। ঐ তথ্যমতে দেশে প্রতিবন্ধির সংখ্যা ১.৪ শতাংশ। আবার তিন বছরের নিচের শিশুদের  ছয় ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে ২০১০ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোর ’পরিবারের আয় ও ব্যায় জরিপ’(এইচআইএস) অনুযায়ী দেশে ৯.০৭% প্রতিবন্ধি রয়েছে।’একজন ব্যক্তি একধিক প্রতিবন্ধিতা’ সমস্যায় ভুগছেন এমন সংখ্যা ১৪.০১%। বিশ্বের ৭০টি দেশ নিয়ে একটি ’স্ট্যন্ডার্ড কোশ্চেন’ এর ভিত্তিতে ২০১১ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে  বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিদের সংখ্যা ১৫.০৭ শতাংশ। প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারনার অভাব,জ্ঞানের অভাব,অশিক্ষা,সচেতনতার অভাব,অপুষ্টি,অসাবধানতা ও অসতর্কতা এবং দূষণযুক্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারনে এ সংখ্যা বেড়েই চলছে।

আমরা আরো জানি যে সভ্যতার ক্রমবিকাশের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধানের জন্য একদিন সমাজ গড়ে উঠেছিলো। আবার ব্যক্তি স্বাধিনতা রক্ষার জন্য সামাজিক আইনের পাশাপাশি বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও দরিদ্র অঞ্চলে প্রায় কয়েক হাজার ধর্মবেত্তারা ধর্মগ্রন্থ নামক বিকল্প ব্যাবস্তার বাণীও শুনিয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মানুষকে মানবতার বাণী ও আলোর পথ দেখিয়েছেন আবার কেউ কেউ প্রতিবন্ধবতা,কুসংস্কার ও অন্ধকারের পথও দেখিয়েছেন এবং এখনো এটি বিদ্যমান আছে। আমরা বিজ্ঞানের আলোকে এতটুক জানি যে জগতে আগে মানুষ তারপর সমাজ ও মাত্র সারে পাচ হাজার বছর আগে ধর্মের আর্বিভাব। তাই সমাজকে বাদ দিয়ে কখনো ধর্মের অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারবে না। পৃথিবীতে সমাজের সৃষ্টি হয়েছে তারপর মানুষ তার প্রয়োজনেই ধর্ম সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ্যের মাধ্যমেই জানতে পারি যে জগদিশ^র তিনি মানুষের মাঝেই বিরাজ করে বসত করে। কবিও তাই বলেন মানুষ না খেয়ে থাকলে তাকে খাওয়ানো মানেই স্বয়ং স্রষ্টাকে খাওয়ানো। অসহায় প্রতিবন্ধিদের সহায়তা করা মানেই সরাসরি স্রষ্টাকে ভালোবাসা। তাই আমরা বলতে পারি সমাজ সেবা করলেই ধর্মের বিধানগুলো পুরোপুরি পালন করা হয়ে যায়। প্রত্যেক ধর্মেই বলা হয়েছে অন্যের হক নষ্ট করা যাবে না এবং ধনী –গরিব,অন্ধ-আতুর,দুস্থ-কাঙাল,শত্রু- মিত্র নির্বিশেষে সকল মানুষ ও প্রাণীর সেবা করতে হবে। এটি মূলত সমাজ সেবারই আদর্শ। সারাদিন ধর্মালয়ে বসে শ্রষ্টার আরাধনা করতে হবে কোন ধর্মই এমন কথা বলেননি। বরং নিজে খাও এবং তোমার প্রতিবেশী অভুক্ত আছে কি না তার খোজ খবর রাখো তাকে অন্য দিয়ে বস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করো। তাই আমরা বলতে পারি সমাজ সেবাই যে ধর্মের গোড়ার কথা।
সামাজিক দায় ও দায়িত্ব: একজন সুনাগরিক হিসেবে প্রথমত আমাদের দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোকে সমাজসেবার মনোভাব থাকতে হবে। ছাত্র ও যুব সমাজ আমরা পরিবার ও সমাজের নির্ভরশীল নাগরিক তাই সামজিক দায়বদ্ধতা অন্যের চেয়ে আমাদের একটু বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সমাজে প্রতিবন্ধিদের প্রতি রয়েছে আমাদের অনেক সামাজিক দয়িত্ব ও কর্তব্য। বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধি ফোরামের উদ্যোগে প্রণীত হয়েছে প্রতিবন্ধি বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা। এছারাও এগিয়ে আসছে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিয়োজিত বেশ কিছু সংস্থা। মুলত এ নীতিমালা এখনো পূর্নাঙ্গরুপে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রতিবন্ধি বা বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি আমরা উল্লেখযোগ্য কিচু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারি। যেমন- প্রতিবন্ধিরা যাতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে এবং নিজেদের কাজকর্ম করতে পারে তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করা। তাদের শিক্ষা এবং কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক উপকরন এবং সুন্দর ব্যাবহার করা। প্রতিবন্ধিদের সামাজিক নিরাপত্তা জন্য তাদের আয় সংরক্ষণ ও আয় বৃদ্ব্যির ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা। তাদের শিক্ষা এবং কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক উপকরন এবং সুন্দর ব্যাবহার করা। প্রতিবন্ধিদের সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষার ব্যাবস্থা এবং উপযুক্ত পরিবেশের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উপকরন সরবারহ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তাদের বিনোদনমুলক ব্যাবস্থা নিতে হবে। তারা নিজেরাও যেন ধর্ম বা নৈতিক শিক্ষা,খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারে সে ব্যাবস্থা নিতে হবে। তারা যাতে কোনভাবেই বিরুপ পরিবেশ  এবং বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় পতিত না হয় সে ব্যাবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি প্রতিবন্ধিরা আমাদেরই সন্তান।তারা আমাদের কারো ভাই,কারো বোন,কারো বাবা,মা,আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশী। তাই তাদের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। কর্মসংস্থান,পুনর্বাসনসহ ব্যাপক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি,নিরাপদ যাতায়াত ব্যাবস্থা,সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি- সবই প্রতিবন্ধিদের মৌলিক মানবিক অধিকার। তাই কেবল আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধি দিবসে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সভা,সেমিনার,সিম্পোজিয়াম করলেই দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ হয় না। জাতিসংঘের স্বাস্থ্যসংস্থার নির্দেশনা অনুয়ায়ী প্রতিবন্ধি নির্বাচন বা সনাক্তের নানা রকাম পদ্বথি রয়েছে। সমাজের সমস্যর প্রকৃতির সঙ্গে এই পদ্বথির সংযোগও আছে। যেখানে যে পদ্বথি প্রয়োগ করা যায় সেখানে তাই করতে হবে। দেশের গ্রাম শহরে এখনো সলতের আলোর মতোন নানা ধরনের সেচ্ছাসেবী সমাজিক সংগঠন রয়েছে। সরকার নানাভাবে তাদের সহযোগীতা করে প্রশিক্ষিত করে প্রতিবন্ধিদের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারে। সংগঠনগুলোর সহযোগীতায় প্রত্যেক উপজেলায় অনন্ত একটি করে কর্মমূখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব। সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তর থেকে প্রতিবন্ধিদের প্রতি উদার মানসিকতা নিয়ে একযোগে কাজ করলে সামজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী আরো শক্তিশালী করা যাবে। এবং  সামাজিক ন্যায্যতা বিনির্মমাণের পথ আরো সুগম হবে।
 লেখকঃ মো. নজরুল ইসলাম, গবেষক,সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী,nozorali1985@gmail.com