প্রতি মাসে এক দিন বিনামূল্যে রোগীদের সেবা দিয়ে প্রশংসিত ডা. হৃদয়

প্রতি মাসে এক দিন বিনামূল্যে রোগীদের সেবা দিয়ে প্রশংসিত ডা. হৃদয়
ছবিঃ সংগৃহীত

তৌহিদুল ইসলাম।। স্টাফ রিপোর্টার।। প্রতি মাসে এক দিন বিনামূল্যে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন চিকিৎসক হৃদয় রঞ্জন রায়। প্রয়োজনে একইসঙ্গে এদিন রোগীর অস্ত্রোপচারও করেন বিনামূল্যে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে টাকা ছাড়া সেবামূলক কাজটি করে আসছেন তিনি।  

প্রতি মাসের প্রথম শনিবার চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা ডা. হৃদয় রঞ্জন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। তিনি সেখানকার সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন। এর মধ্যদিয়ে তিনি খুঁজে পেয়েছেন অনাবিল প্রশান্তি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার নিজের আইডিতে ‘মাসের প্রথম শনিবার বিনামূল্যে রোগী দেখা এবং অপারেশন করা হয়’ লেখা একটি পোস্টার শেয়ার দেন। কয়েক দিনের মধ্যে রোগীবান্ধব চিকিৎসকের মহানুভবতার বার্তাটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছাড়াও চিকিৎসক সমাজের প্রশংসায় ভাসছেন ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়।

৩ অক্টোবর ফেসবুকে লিখেছেন, বিনামূল্যে এক দিন চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নোটিশটি আমার চেম্বারে লাগানো রয়েছে। শনিবার ছিল আমার প্রাইভেট চেম্বারের ৩৮তম ফ্রি-ডে। সেদিন ১১ জন রোগী দেখা হয়েছে এবং একটি অপারেশনও করা হয়েছে। সবগুলোই বিনামূল্যে। অনেক রোগী না জেনে ভিজিট দিতে চেয়েছেন। কিন্তু আমি বিনীতভাবে তা গ্রহণ করিনি। আমাকে দোয়া করবেন, যেন আজীবন এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারি।

ডা. হৃদয় রঞ্জন রায় জানান, ব্যতিক্রমী উপায়ে স্বাস্থ্যসেবা শুরুর এ দুঃসাহসী উদ্যোগ তিনি এক দিনে নেননি। এজন্য অনেক ভাবতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিষয়টি নিয়ে নিজের মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেন। পরে পরিবারের সঙ্গে বসে আলোচনা করে প্রতি মাসের এক দিন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই শুরু করেন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ। সেই থেকে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন।

ডা. হৃদয় রঞ্জনের ভাষায়, ছাত্রজীবন থেকে বিভিন্ন সেবামূলক কাজে তৃপ্তি খুঁজে পান তিনি। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে অনাবিল প্রশান্তি পান। কর্মজীবনে প্রবেশের পরও এই ধারা অব্যাহত ছিল।

মনের প্রশান্তি আর আত্মতৃপ্তির উপলব্ধি থেকেই পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনে অংশ নিতেন। বেশির ভাগ ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইন ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী ঘিরে। প্রতি বছর মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। ২০১৮ সালেও রংপুরে এ রকম একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে অংশ নেন ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়।

ওই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সকালে ওই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করি। দুপুরের দিকে সোসাইটি অব সার্জন্স অব বাংলাদেশ (এসওএসবি) থেকে একটি ক্ষুদে বার্তা আসে। এতে বলা হয়, এসওএসবির সদস্যগণ বিকেলে চেম্বারে বিনামূল্যে রোগী দেখবেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, বিকেলে যতগুলো রোগী দেখেছি, তাদের কারও কাছ থেকে কোনো টাকা গ্রহণ করিনি।

হৃদয় রঞ্জন আরও জানান, পরে ওই কার্যক্রমের বিষয়টি অবহিত করার লক্ষ্যে দুই-একটি ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের টাইমলাইনে পোস্ট করেন। তখন তার সিনিয়র-জুনিয়র অনেক সহকর্মী, অনেক বন্ধু এ কাজের প্রশংসা করেন। তাদের অনেকেই তাকে প্রতি মাসে এক দিন এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে তিনি ভাবতে  থাকেন। অবশেষে সেপ্টেম্বরে শুরু করেন তার কার্যক্রম। দিন হিসেবে বেছে নেন নিজের জন্মবার।

ব্যতিক্রম এ সেবামূলক কাজকে তিনি বহুমুখী হিসেবে দেখেন। তার মতে, এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো একক বিষয় জড়িত নয়। প্রথমত তিনি ইতিবাচক এ কাজের মাধ্যমে সোসাইটি অব সার্জন্সের চিন্তাকে ধারণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অতল ভালোবাসার প্রকাশ থেকে কাজ করছেন। একজন মানুষ এবং চিকিৎসক সমাজের সদস্য হিসেবে সেবাদান করবেন বলেও মনে করেন হৃদয় রঞ্জন রায়।

দেশের চিকিৎসক সমাজ তার এ কার্যক্রমকে একটি বার্তা হিসেবে গ্রহণ করবে বলে মনে করেন ডা. হৃদয় রঞ্জন। তিনি বলেন, আমি মনে করি, নবীন-প্রবীণ সব চিকিৎসকের জন্য এটি একটি বার্তা। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

উল্লেখ্য, রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাট ইউনিয়নের যাদবপুর গ্রামে ১৯৬৯ সালের ১ জুন হৃদয় রঞ্জন রায়ের জন্ম। তার বাবা সুধীর কুমার, মা রেনুকা রায়। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে কলেজ অব ফিজিশিয়ানস ও সার্জনস থেকে সার্জারিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

এর আগে ১৯৮৪ সালে তিনি শ্যামপুর হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৮৬ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজের ১৯৮৭-৮৮ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। কার্ডিয়াক সার্জারিতে এমএস কোর্সে থিসিস পরীক্ষা দিলেও নানা কারণে সম্পন্ন করা হয়নি। বর্ণাঢ্য জীবনে আমেরিকান কলেজ অব সার্জন্স থেকে ফেলোশিপ গ্রহণ করেন। তিনি আমেরিকা ভ্রমণ শিরোনামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক বই লিখেছেন।