প্রশাসনের নাকের ঢগায় বনজমি দখলে নিয়ে দালাল ফিরোজের ডুপ্লেক্স ভবন 

প্রশাসনের নাকের ঢগায় বনজমি দখলে নিয়ে দালাল ফিরোজের ডুপ্লেক্স ভবন 
ছবিঃ সংগৃহীত

কক্সবাজার প্রতিনিধি।। ২ মে, রবিবার।। কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন ফুলছড়ি রেঞ্জের বিভিন্ন বনবিট এলাকায় থেমে থেমে বনভূমি দখল উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কতিপয় প্রভাবশালীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।এসব অভিযানে প্রকৃতি প্রেমীদের মাঝে খুশি বিরাজ করলেও ক্ষোভে ফুঁসছে ভাঙ্গনের কবলে পড়া দখলকাররা। কারো ঝুপড়ি, কারো কাঁচা বাড়ি বা কারো বনের সমতল এলাকার ঘর ভাঙ্গলেও ফুলছড়ি রেঞ্জের নাপিতখালী বিটের সড়কের পাশে বনায়ন ও পাহাড় কেটে উঠতে থাকা সুরম্য দালানটি তাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। এটিতে বনবিভাগের হাত না পড়ার ‘রহস্য’ কি তা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে জনমনে।বনসহ সব বিভাগ ম্যানেজ করেই বনায়ন কেটে দখল ও ভবন তৈরীর অভিযোগের কথা নতুন নয়।

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঈদগাঁও থানা ভবন ও ফকিরাবাজারের পাশে লাগোয়া সামাজিক বনায়নের গাছ ও পাহাড় কেটে প্রায় দু’একর জমি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বিশালাকার দৃষ্টিনন্দন ভবন তুলেছে ফিরোজ আহমদ নামের (থানার দালাল হিসেবে পরিচিত) একব্যক্তি। ভবনের পাশে তৈরী হচ্ছে টিনের ছাউনি দেয়া ভাড়া বাসাও। ফকিরাবাজারে ‘সোনালী এন্টারপ্রাইজ’ নামে আলিশান অফিসেই পুলিশ ও বৃহত্তর ঈদগাঁওর অপরাধ নিয়ন্ত্রকদের নিয়ে ফিরোজের রয়েছে বিশাল আকারের সিন্ডিকেট ব্যবসা।

তার ডানেবামে থাকা কিছু সিন্ডিকেট সদস্যদের মুখে মুখে প্রচার রয়েছে ২৫ লাখ টাকায় বনবিভাগসহ সকল সেক্টর ম্যানেজ করেই ফিরোজ অত্যাধুনিক বাড়িটি বানিয়েছে।জনশ্রুত রয়েছে এখানে সদ্য ঘোষিত ঈদগাঁও থানার অফিসার কিংবা আগ্রহী পুলিশ সদস্যদের ‘ফ্রি’তেও নাকি রাখার ব্যবস্হা করা হবে।গত বছরের করোনা শুরুর সময় হতে ভবন নির্মাণ কাজ এক বছর ধরে চললেও একটি বারের জন্যও বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা অন্যকোন সংস্থা সড়ক থেকে দৃশ্যমান এ নির্মাণ কাজে বাধা দিতে আসেননি।যার ফলে ফিরোজের সিন্ডিকেটের প্রচার করা তথ্যই সঠিক ভেবে স্থানীয় বনপ্রেমী জনতা কিংবা পরিবেশবাদী সংগঠনও এর প্রতিবাদ করছে না।

বনবিভাগের জমিতে ভবন তোলার কথা স্বীকার করে ফিরোজ আহমদ বলেন, এটি স্থানীয় মমতাজুল উলুম মাদ্রাসার নামে দখল ছিল। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকায় দখল কিনেছি। পুরো বৃহত্তর ঈদগাঁও এলাকায় বনভূমি দখল করে অগণিত ঘর উঠেছে। আমি করলে দোষ কোথায়?

এভাবে সামাজিক বনায়ন ও পাহাড় কেটে বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা অন্যকোন সংস্থার বাধাহীনভাবে কিভাবে বাড়ি করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।তার অনুগত সিন্ডিকেটের প্রচার ২৫ লাখ টাকায় সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ম্যানেজ করে নির্বিগ্নে কাজ সারছেন-এটা কি সঠিক, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বনের জমিতে অন্যরা যে পদ্ধতিতে বাড়ি করছে আমিও সেই পথে হাটঁছি। কে কি বলছে, তা আনার জানার বিষয় নয়। 

সোনালী এন্টারপ্রাইজের নামে আমরা এখানে অফিস করে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও স্থানীয় সরকারদলীয় রাজনীতিক এবং জেলা নেতাদের স্বজনদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসা করছি। পুলিশের সাথেও দীর্ঘদিন কাজ করে আসছি, এজন্য হয়তো ‘সম্মান’ জানিয়ে কেউ কিছু বলেনি।

বনভুমি দখল ও বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য নিতে মমতাজুল উলুম মাদ্রাসার পরিচালককে ফোন করা হলেও রিসিভ না হওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের শুরুতে এখানে দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিযানে উচ্ছেদে গেলে অনেকে ফিরোজের বিষয়টি সামনে আনেন। খোঁজ নিয়ে দেখেছি যেখানে সুরম্য বাড়িটি করা হচ্ছে তা ২০০৭-২০০৮ সনের সামাজিক বনায়নের জমি।ঐ ফিরুজ বাড়ি করতে গিয়ে বনের গাছ ও পাহাড় কেটেছেন নির্বিচারে।যা কিছুতেই মেনে নেয়ার নয়।তাছাড়া এটি বনের অনেক মূল্যবান জায়গা। ফিরোজের পক্ষ হয়ে দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা নামধারী ব্যক্তি, একাধিক চেয়ারম্যানরা নানা ভাবে ফোন করছে। আগে কি হয়েছে জানিনা, আমি বনবিক্রির মতো অপকর্ম করিনি কিংবা কেউ করলে তাকেও বনআইনের আওতায় আনা হবে। আইনশৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতা পেলে আইনী প্রক্রিয়ায় এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দু’মিনিটও চিন্তা করবো না।

ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আবদুল হালিম বলেন, শুনেছি থানার প্রবেশ পথে সোনালী এন্টারপ্রাইজ নামে আলিশান অফিসে বসা ফিরোজ পুলিশের দালালি করে নানা অপকর্ম করেছে। আমি আসার পর হতে তার থানায় ঢুকাও নিষেধ। সরকার আমাদের ঘরভাড়া দেয়। সরকারি জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণ করে কোন দালাল কিংবা পরিবেশ ধ্বংস কারীর বাড়িতে ‘ফ্রি’তে অফিসার কিংবা কোন সিপাহি বসবাস করবে এটা যেমন হাস্যকর তেমনি  আমার থানার কোন পুলিশ ঐ বাসা বাড়িতে থাকবে না।তিনি আরো জানান, বনবিভাগ চাইলে এই অবৈধ স্হাপনা উচ্ছেদে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা দেবো।

কক্সবাজার উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তহিদুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের বন দেশ ও স্থানীয়দের সম্পদ। এটি রক্ষায় বনবিভাগকে সহযোগিতা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। এ দালানটির বিষয়ে জেনেছি। আইনী পথে বনভূমিটি জবরদখল মুক্তকরে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার পরই লেনদেনের বিষয়টি পরিস্কার হবে ।