বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমাদের কুদ্দুস স্যার- তৌহিদুল ইসলাম

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমাদের কুদ্দুস স্যার- তৌহিদুল ইসলাম
তৌহিদুল ইসলামের কলাম

আজ বুধবার ( ৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর এ দিবসটি উদযাপিত হয়। ২০২২ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো- ‘The transformation of education begins with teachers.’ অর্থাৎ ‘ শিক্ষকদের দিয়েই শিক্ষার রূপান্তর শুরু।’ এ কথাটির গুরুত্ব ও মর্মার্থ বোঝাতে আমার প্রিয় একজন শিক্ষক কুদ্দুস স্যারের কথা আজ না বললেই নয়।

আমি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংপুর জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তৃতীয় শ্রেণি থেকে এসএসসি'র এই পুরো সময়টা ছিলো আমার ছাত্রজীবনের স্বর্ণকাল। কত স্মৃতিগাঁথা লেখা রয়েছে জিলা স্কুলের আঙিনার সেইসব অশ্বত্থ আর বট গাছ গুলোর প্রতিটি পাতায়! 

স্কুলের পিছনের পুরানো বিল্ডিংয়ে হয়তো এখনো রয়েছে আমার পায়ের ছাপ, পুকুরটি এখনো আগের মতই আছে যেখানে আমরা গোসল করতাম। বিশালাকৃতির খেলার মাঠে উদ্যাম খেলাধুলা, ঝাল-মুড়িওয়ালা মান্নান মামা, ক্লাসের বেঞ্চগুলি, টিউবওয়েল, লম্বা বারান্দা, ক্লাসে শিক্ষকদের টেবিলে কলম খেলা,সে সবকিছু আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

আজও আমার মনে দাগ কেটে আছে বন্ধু এবং শিক্ষকদের সাথে কাটানো কিছু অমূল্য সময়। আমাদের সময়ের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন কুদ্দুস স্যার। উত্তরাঞ্চলে তার মতন কড়া শিক্ষক যার আদর্শ, মহানুভবতা, শাসন, আদর আর বুদ্ধিমত্তা এসব কিছু আজও সব ছাত্র এবং শিক্ষকদের কাছে আদর্শ ।

একদিনের কথা বলি, এসেম্বলি ফাঁকি দেওয়া আমার নিত্যদিনের স্বভাব। এ কারণে বাসা থেকে ঠিক সময় বের হয়েও এসেম্বলি'র সময় স্কুলের দেয়ালের পিছনে কিংবা ক্লাসের দরজার পাশে লুকিয়ে থাকতাম যাতে এসেম্বলিতে যেতে না হয়। কিন্তু বিধিবাম, কথায় বলে- দশ দিন চোরের একদিন গেরস্থ। কুদ্দুস স্যারের কাছে ঠিকই ধরা পড়লাম একদিন! 

কুদ্দুস স্যার কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শক্তির মানুষ তা সেদিন বুঝেছিলাম। যথারীতি সবাই অ্যাসেম্বলি শেষে ক্লাসের দিকে যাচ্ছে তখন আমি স্কুলের গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম বীরের বেশে। সেদিন বারান্দা থেকেই আমাকে দেখেছিলেন তিনি। পিয়ন দিয়ে আমাকে তার রুমে ডেকে নিলেন। আমার তো অবস্থা খারাপ, ভাবছি আজই শেষ। আত্মারাম খিঁচে গেলো, পা ঠকঠক করে কাঁপছে। ক্লাসের ধর্ম বই থেকে শেখা সব দোয়া দরুদ পড়া শুরু করেছি তখন। স্যারের রুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। তার রুমে আরো তিনজন শিক্ষক ছিলেন -আপেল স্যার যিনি বর্তমান প্রধান শিক্ষক, সুবোধ স্যার এবং মান্নান স্যার। কুদ্দুস স্যার তাদের সাথে কথা শেষ করে তাদের বিদায় দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। হয়তো অন্য শিক্ষকদের সামনে আমায় লজ্জা দিতে চাননি।
"স্যার আসবো?"
"আয়।" ভিতরে প্রবেশ করলাম আমি।
"কিরে তুই অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়াস না?"

মিথ্যা বলার সাহস তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে সেদিন আমার হয়নি, আমি বলতে পারিনি। ভাবলাম হয় এসপার নয় ওসপার। দুষ্টু ছিলাম ঠিকই কিন্তু স্যারেরা আমাদের তাদের সামনে মিথ্যা বলার শিক্ষা দেননি।
বললাম - "না স্যার।"
"তার মানে তুই প্রায়ই ফাঁকি মারিস। সামান্য এসেম্বলি যদি ফাঁকি মারিস, জীবনের জটিল সব পরীক্ষাগুলোতে তুই তো পালিয়ে বেড়াবি। তখন কি ভিক্ষা করবি রাস্তায়?" আমি মাথা নীচু করে সব শুনলাম। 

"আর যেন এ ফাঁকিবাজি কোনদিন না দেখি বা না শুনি, যা ক্লাসে যা।" সেদিন লজ্জায় অপমানে ক্লাসের সবার সামনে আমার মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল।

অন্য একদিনের ঘটনা, স্কুল থেকে পালিয়ে আমরা কয়েকজন বন্ধু পিকনিক করতে গিয়েছিলাম। আমি প্রদীপ,সাব্বির, আম্মান সহ আরো কয়েকজন। সেদিনও ক্লাস শিক্ষকের কাছে ধরা পড়েছিলাম। পরেরদিন স্কুলে এসে ভয়ে আর ক্লাস থেকে বের হইনি। ভাবলাম আজ নিশ্চিত গার্জিয়ান ডাকবে। কিন্তু না, সেদিনও আমাদের গার্জিয়ান ডাকা হয়নি। 

কুদ্দুস স্যার আমাদের উদ্দেশে বলেছিলেন - "তোদের বাবা মা অনেক কষ্ট করে এই স্বনামধন্য স্কুলে পড়াচ্ছেন। মনে রাখিস হাজার হাজার ছাত্রদের মধ্যে মাত্র গুটিকয়েকজন তোরা এই স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছিস; এ সুযোগ হেলায় হারাসনা। অন্যান্য শিক্ষকরা আমাকে অনুরোধ করেছে তোদের বাবা মাকে এখানে ডেকে আনতে। কিন্তু আমি রাজি হইনি। তোরা যতক্ষন স্কুলে থাকবি ততক্ষনই আমার এখতিয়ারে থাকবি। তোদের ভালমন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদের শিক্ষকদের। স্কুল চলাকালীন সময় তোরা যাই করবি তার দায়দায়িত্ব আমার উপরেই বর্তায়। যে ভরসায় তোদের বাবা আমার কাছে পাঠিয়েছেন, তোদের বাপকে ডেকে তাঁর সেই ভরসা আর আস্থাকে আমি ছোট হতে দিতে পারি না।"
"আর আমাকে বললেন, তোর লজ্জা থাকলে আর কোনদিন কোন অকাম কুকাম এর বিচার নিয়ে আমার সামনে দাঁড়াবি না; যা ক্লাসে যা।"

সেটাই ছিল দুষ্টামির বিচার নিয়ে কুদ্দুস স্যারের সামনে আমার শেষ দাঁড়ানো। আর কোনদিন আমাকে তাঁর সামনে মাথা নিচু করে লজ্জা অপমান নিয়ে দাঁড়াতে হয়নি। তিনি জানতেন কিভাবে একজন পথভ্রষ্ট দুষ্টু ছাত্রকে এসেম্বলি লাইনে দাঁড় করাতে হয়, কিভাবে তার কুমতিকে সুমতির পথে আনতে হয়।

ভুল ছাত্র-ছাত্রীদেরই হয়, তারা ভুল করবে শিক্ষক শাসন করবে। তবে এই শাসন অবশ্যই হতে হবে আদরের। কারণ এখনকার শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছে অনাচার, অনৈতিক চর্চা। 

এখন ছেলে মেয়েরা দেশী বিদেশী চ্যানেল, ইউটিউব আর অনলাইনে শিখছে  কিভাবে প্রেম করতে হয়, পালিয়ে বিয়ে করতে হয়। প্রেমে অসফল হলে হাত কেটে রক্ত ঝড়াতে হয়, রেজাল্ট ভালো না হলে নিজের জীবন দিয়ে দিতে হয়। আর ফেসবুকের অপব্যবহার নিয়ে নাইবা বললাম। এসব কিছু মাথায় রেখেই সন্তানদের শাসন করা উচিত ; না হলে সে শাসন তার স্বাভাবিক জীবনকে হুমকির মাঝে ফেলবে এটাই স্বাভাবিক।

আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দেখে ভয় পায়নি এমন ছাত্র জিলা স্কুলে একজনও নেই এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। তিনি আমাদের আদর্শ ছিলেন। কেন? কারণ, কোমলে কঠোরে মেশানো কুদ্দুস স্যার ছিলেন ছাত্রদের এবং শিক্ষকদের জন্য জীবনযুদ্ধের একজন অগ্রগামী সেনাপতি।

স্যার যেদিন অবসরে যান সেদিন তার সেই বিদায় অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম। আমি পা ছুঁয়ে সালাম করতেই তিনি মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন- "কিরে এখনো দুষ্টুমি করিস?"
"আমি স্মিত হাসি দিয়ে বলেছিলাম- না স্যার।"
"ভালো থাকিস বাবা। সৎ পথে চলিস, বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করিস আর শিক্ষক হিসেবে আমার শাসনকে আদর হিসেবেই নিস।"
"আমি বলেছিলাম- দোয়া করবেন স্যার।"

স্কুল জীবনে সীমা ছাড়ানো দুষ্টুমির সেসব ঘটনার পর সহানুভূতিশীল আদর্শ শিক্ষকদের মত আমার বাবা মাকে ডেকে অপমান করেননি বলেই তিনি আমার আদর্শ শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন সেটা আজ বুঝি।

আমার কাছে শিক্ষকদের সম্মান জানাতে বিশেষ কোন দিনের প্রয়োজন নেই। মানুষ গড়ার কারিগর সেই শিক্ষকগণ প্রতিটি দিনই আমাদের মাঝে শ্রদ্ধা ও সম্মানের আসনে আসীন। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সকল শিক্ষক গুরুজনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। 

-----------------------------------------------

         তৌহিদুল ইসলাম
(গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক)