বেড়িবাঁধের বাইরে ঘরবসতি : ঝুঁকিতে পাঁচ শতাধিক পরিবার

বেড়িবাঁধের বাইরে ঘরবসতি : ঝুঁকিতে পাঁচ শতাধিক পরিবার
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার, ৬ নভেম্বর।। বাঁশ ও পলিথিনের ছাউনি দেওয়া বেড়ার ঘরটিতে বসবাস করেন আব্দুল ওয়াজ। কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার কৈয়ারবিল গ্রামের এই আব্দুল ওয়াজ গত ৮০ বছরের জীবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখিন হয়েছেন। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভেসে প্রাণ গেছে তাঁর চার মেয়ের। প্রায় এক একর জমি ছিল। তাও সমুদ্রের করাল গ্রাসে চলে গেছে। সেইসব কথা মনে পড়লে এখনও চোখ ছলছল করে উঠে আব্দুল ওয়াজের। চরম ঝুঁকি আছে জেনেও বেড়িবাঁধের বাইরে সাগরপাড়েই তার পরিবারের বসতি।

আব্দুল ওয়াজ বলেন, ঘূর্ণিঝড় হয়, চাউনি উপড়ে যায়, ঘরবাড়ি ভাঙে। আমরা কোথায় যাবো? আমাদের বাপ-দাদারাও বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাস করে গেছে। আমরাও বসবাস করছি।

কৈয়ারবিল এলাকায় আব্দুল ওয়াজের পরিবারের মতোই ঝুঁকি নিয়ে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাস আরও ২২০ পরিবারের। যুগযুগ ধরে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাস করলেও তাঁদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেই। 
আর একশ' বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপ কুতুবদিয়ায় এমন ঝুঁকিতে বসবাসকারি পরিবারের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রতিনিয়ত সাগরের ঢেউয়ের সাথে অনেকটা যুদ্ধ করে টিকে আছেন তারা।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া  উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এ সময় এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারান। ৯১ সালের পর সিডর ও আইলার আঘাতে উপজেলার আরও অন্তত কয়েক হাজার মানুষের ঘরবাড়ি হারান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেড়িবাঁধের বাইরে পাঁচ শতাধিক পরিবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসরত এসব মানুষ স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাগরে মাছ ধরে, লবণমাঠে ও শুঁটকির আড়তে কাজ করে কোনো রকম সংসার চালান তাঁরা।
বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী আবুল কাশেম বলেন, ‘কয়েক দফা ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এরপর আবার বসতঘর নির্মাণ করলেও সেসব স্থায়ী হয়নি।’
কুতুবদিয়া আসনের জেলা পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম ভুট্টো বলেন, একসময় এইসব বসতি থেকে সমুদ্র অনেক দূরে ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সাগরের গ্রাসে বিলীন হয়ে ছোট হয়ে আসছে ভূখন্ড। বারবার তারা ঘরহারা হন, বারবার বসতি গড়েন। বেড়িবাঁধের বাইরে এ যেন অনিশ্চিত এক 'সুতোয় বাঁধা' বসতি।
কুতুবদিয়া কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মীর কাশেম বলেন, যেসব স্থানে ঝুঁকি নিয়ে বেড়িবাঁধের বাইরে লোকজন বসবাস করছে সেখানে জিও ব্যাগ বসালে বা টেকসই বাঁধ হলে বসতি ও প্রাণ দুটো'ই রক্ষা করা সম্ভব হবে। আমরা চাই এখানে দ্রুত জিওব্যাগ বসানোর উদ্যোগ নেয়া হোক।


প্রাকৃতিক দুর্যোগে এইসব এলাকা কিভাবে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি কারিগরি দল সমীক্ষা চালাবে। এরপর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপঙ্কর তঞ্চ্যঙ্গা।
তিনি বলেন, এই মানুষগুলোকে বেড়িবাঁধের ভেতরে আনতে গেলে তাদের নিজস্ব জমি লাগবে। এই মানুষগুলোর নিরাপত্তার জন্য তাদের যে দাবী সে ব্যাপারে আমাদের সুযোগ থাকলে আমরা কাজ করবো।
কুতুবদিয়া দ্বীপে বর্তমানে দেড় লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বিভিন্ন সময় দ্বীপটি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।