মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হত্যা মামলার আসামি ৩১ বছর পালিয়ে থেকে গুলশানে গ্রেফতার

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হত্যা মামলার আসামি ৩১ বছর পালিয়ে থেকে গুলশানে গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট।। মানিকগঞ্জ সদর এলাকার আজাহার হত্যা মামলার দীর্ঘ ৩১ বছর বিভিন্ন ছদ্মবেশে পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী মোঃ কাওছারকে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এর একটি চৌকষ আভিযানিক দল মানিকগঞ্জের চাঞ্চল্যকর আজাহার (৪০) হত্যা মামলার দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে পলাতক আসামী’কে গ্রেফতার করার জন্য ১৯ জুন ২০২২ তারিখ রাতে রাজধানীর গুলশান থানাধীন বারিধারা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত পলাতক আসামী মোঃ কাওছার (৬৩)’কে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়।

গ্রেফতারকৃত আসামী’কে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ কাওছার (৬৩) ও ভিকটিম আজাহার (৪০) মানিকগঞ্জ জেলার চর হিজুলী গ্রামে বসবাস করত এবং একই এলাকায় চাষাবাদ করতো এবং একসাথে ইরি ধানের ক্ষেতে পানি সেচের ব্যবসা করতো। সেই সুবাদে তাদের মধ্যকার ভালো সম্পক ছিলো। এক পর্যায়ে ভিকটিমের বিবাহিত বোন অবলার সাথে আসামী কাওছারের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে ঘটনার দিন দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে অবস্থানরত অবলা, অবলার তৎকালীন স্বামী ফালান, জনৈক ওমর, রুহুল আমিন, আসমান এবং রফিজসহ আরো কয়েকজন আসামী মোঃ কাওছার এর পক্ষ নিয়ে ভিকটিম আজাহারকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করে। গ্রেফতারকৃত আসামী কাওছার ভিকটিমের মাথায় লাঠি দিয়ে সজোড়ে আঘাত করলে ভিকটিমের মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং ভিকটিম মাটিতে লুটিয়ে পরে। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন ভিকটিমকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভিকটিম আজাহার’কে মৃত ঘোষণা করেন। মৃতের আপন ছোট ভাই মোঃ আলী হোসেন (বর্তমানে মৃত) বাদী হয়ে আসামী কাওছারসহ সর্বমোট ০৭ জনকে আসামী করে একই দিন মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন যার মামলা নং ০৭(০৬)৯১ তারিখ-১৪/০৬/১৯৯১ইং, ধারা ৩০২/৩২৪/৩৪ পেনাল কোড ১৮৬০। মামলা হওয়ার পর গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ কাওছার (৬৩)সহ এজাহারনামীয় বেশ কয়েকজন আসামী থানা পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়। গ্রেফতারকৃত আসামী কাওছার ০২ মাস হাজত খেটে ১৯৯১ সালে জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। অত্র মামলার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারনামীয় আসামী মোঃ কাওছার, ওমর, রুহুল আমিন, আসমান এবং রফিজ’কে অভিযুক্ত করে বিজ্ঞ আদালতে একই বছর ডিসেম্বর মাসে চার্জশীট দাখিল করেন এবং এজাহার নামীয় বাকি ০২ জন আসামী অবলা ও তার তৎকালীন স্বামী ফালান উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চার্জশীট থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন। পরবর্তী চার্জশিটের ভিত্তিতে বিজ্ঞ আদালত উক্ত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন এবং পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ভিকটিম আজাহার হত্যাকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ১৯৯২ সালের শেষের দিকে মানিকগঞ্জ জেলার বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ চার্জশীটে অভিযুক্ত আসামী মোঃ কাওছারকে মৃত্যুদন্ড, অপর আসামী ওমর, রুহুল আমিন, আসমান ও রফিজ প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীগণ ০৫ বছর সাজাভোগের পরে বিজ্ঞ উচ্চ আদালতে আপিল করে বর্তমান আদালতের নির্দেশে জামিনে আছে। পলাতক আসামী মোঃ কাওছার মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ০২ মাস হাজতে থেকে জামিনে বের হওয়ার পর থেকেই গত ৩১ বছর পলাতক ছিল।

আসামীর জীবন বৃত্তান্তঃ আসামীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আসামী ১৯৬০ সালে মানিকগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন চর হিজুলী এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। সে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে আসামী ০২ টি বিয়ে করেছে। প্রথম স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের ঘরে তার একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে যিনি বর্তমানে বিবাহিত এবং রাজধানীর রামপূরায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে। আসামী হত্যা মামলায় জেলে গেলে প্রথম স্ত্রী মনোয়ার তাকে তালাক দিয়ে আবার বিবাহ করে চলে যায়। আসামী জেল থেকে জামিনে বের হয়ে ভিকটিম আজাহার এর বোন ০৫ সন্তানের জননী অবলাকে পালিয়ে নিয়ে যায় এবং অবলা তার স্বামীকে ডিভোর্স দেয় এবং তারা উভয়ই বিয়ে করে অদ্যবধি তারা একসাথে বসবাস করছিল তবে তাদের কোন সন্তানাদি নেই। প্রকাশ থাকে যে, অবলার পূর্ববর্তী স্বামী ফালান আবলা পালিয়ে আসার পরপরই রোগ-শোকে ভ‚গে মৃত্যুবরণ করে। ১৯৯১ সালের পর থেকে আসামী আর কোনোদিন মানিকগঞ্জে যায়নি। 

আত্মগোপনে থাকাকালীন সময় আসামীর জীবনযাপনঃ আসামীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়ায় এবং ঐ মামলায় সে মৃত্যুদন্ড সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে লোক চক্ষুর আড়ালে আত্মগোপন করেন। পরিচিত লোকজন থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখার জন্য ১৯৯১ সালের শেষের দিকে ঢাকায় চলে আসে। গত ৩১ বছর ধরে আসামি মোঃ কাওছার নাম পরিবর্তন করে ইমরান মাহামুদ নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রথমে গাজীপুর, কালিয়াকৈর, পুবাইল, উত্তরা, টঙ্গীসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিল। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় আসামী নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য ক্রমাগতভাবে সে পেশা পরিবর্তন করে। প্রথমদিকে সে রাজমিস্ত্রী, ইলেক্ট্রিক, স্যানিটারী মিস্ত্রী হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীতে সে ড্রাইভিং শিখে সিএনজি চালায় এবং বর্তমানে সে প্রাইভেটকারের ড্রাইভার হিসেবে আত্মগোপনে থেকে গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। 

নতুন নামে এনআইডি তৈরীঃ আসামী পালিয়ে ঢাকায় চলে আসার পর নিজেকে আড়াল করার জন্য মোঃ ইমরান মাহামুদ নাম ধারণ করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী করে। জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতা- শাহিন মাহামুদ, সাং- নান্দুয়াইন, থানা- গাজীপুর, জেলা- গাজীপুর’কে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করে। 

গ্রেফতারকৃত আসামীকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।