মাদক ব্যবসা ছেড়ে সফল উদ্যোক্তা ঠাকুরগাঁওয়ের মাজেদ

মাদক ব্যবসা ছেড়ে সফল উদ্যোক্তা ঠাকুরগাঁওয়ের মাজেদ
ছবিঃ সংগৃহীত
স্টাফ রিপোর্টাের, ঠাকুরগাঁও।। ঠাকুরগাঁও জেলার পরিচিত একটি নাম মাজেদ। জেলা সদরের রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা তিনি। এক সময় জেলার মানুষ তাকে নামকরা মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিনলেও এখন তার পরিচয় একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। ইচ্ছা শক্তি আর পরিশ্রমে যেকোনো অবস্থায় সুন্দর সফল জীবনের উদাহরণ হয়ে আছেন এই মানুষটি।

একজন মাদক ব্যবসায়ী থেকে সফল উদ্যোক্তা হবার পথচলা নিয়ে কথা হয় মাজেদের সাথে। তিনি জানান, অভাবের তাড়নায় এক সময় নিষিদ্ধ ফেন্সিডিল ব্যবসায় শুরু করেন তিনি। নিজের পরিচিতি থাকায় এবং তার অবস্থান শহরের নিকটে হওয়ায় খুব দ্রুতই ফেনসিডিল বিক্রি বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে জেলার সবচাইতে বড় মাদক বিক্রিতা বনে যান। তবে এই নিষিদ্ধ ব্যবসার কারনে মাদক মামলায় পড়তে হয় তাকে। ব্যবসা প্রসারের সাথে সাথে বাড়তে থাকে মামলার পরিমান। এক পর্যায়ে মাজেদ ১২ টি মামলার আসামি হয়ে যায়।
মাজেদ এক সময় বুঝতে পারেন যে, এই ব্যবসা থেকে যথেষ্ট টাকা আয় হলেও মামলা চালাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশই খরচ হয়ে যাচ্ছে। তার সাথে সর্বদা আতংক আর অশান্তির জীবন তাকে অস্থিরতায় ফেলেছে। সমাজের মাঝেও তিনি খারাপ একটি পরিচয় বহন করায় মানুষ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। সমাজের প্রতিটি উৎসব ও আচার অনুষ্ঠানে তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। তাই তিনি এই মদক জগৎ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ঝুলে থাকা ১২ টি মাদক মামলা আর সমাজের অগ্রহণযোগ্যতা তার পিছুটান হয়ে দাড়ায়।
মাজেদ বলেন, আমি মাদক ব্যবসার ছাড়তে চাইলেও পারছিলাম না। পরে একসময় আমাকে আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান ডেকে পাঠায় এবং এই নিষিদ্ধ ব্যবসা ছেড়ে দেবার অনুরোধ করেন। আমি তার সিদ্ধান্তে সম্মান জানিয়ে আমার সমস্যা গুলোর কথা তুলে ধরি। তিনি প্রতিটি সমস্যায় তার সর্বাধিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে চেয়ারম্যানের সহযোগীতয় মাদক ব্যবসা ছেড়ে একটি বয়লার মুরগীর খামার দিয়ে পথচলা শুরু করি। ধন্যবাদ চেয়ারম্যান সাহেবকে।
সেই রায়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, মাজেদের মাদক ব্যবসার কারনে আমাদের এলাকাটা মাদকের আখড়া হয়ে গেছিলো। ইউনিয়নের মানুষ এটা নিয়ে আমার কাছে বার বার অভিযোগ জানায়। তাই আমি ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেবার সাথে সাথেই এই মাদক কারবার নির্মূলের সিদ্ধান্ত নেই। আমি চাইছিলাম মাজেদ এই নিষিদ্ধ ব্যবসা ছেড়ে ভালো পথে ফিরে আসুক। তাকে জেলে দিয়ে লাভ নেই। বের হয়ে আবার ব্যবসা শুরু করবে। তাছাড়া ছেলে হিসেবে সে বেশ ভদ্র ছিলো। তাই তাকে বুঝিয়ে ও সহযোগীতা করে একটি বয়লার খামার শুরু করাই।
রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সাদেকুল বলেন, এক সময় এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা এলাকার পরিচর দিতে লজ্জা পেতো। মাদক এলা নামেই এটার পরিচর পেয়েছিলো। আমাদের মেয়ে ছেলেকে বিয়ে দিতে পারতাম না। রায়পুর শোনবার সাথে সাথেই প্রস্তাব ফিরে যেতো। তবে এখন আমরা বেশ ভালো আছি, শান্তিতে আছি।
বয়লার খামারে সফলতার বিষয়ে মাজেদ বলেন, আমি প্রথমে একটি মুরগীর ফার্মে মাংস উৎপাদ নিয়ে বয়লার পালন শিখে আসি। তারপর অল্প পুঁজি নিয়ে ছোটো করে খামার প্রকল্প শুরু করে আস্তে আস্তে চার বছরে আমার খামারে এখন একসাথে দেড় হাজার বয়লার মুরগী পালিত হচ্ছে।
মাজেদ বলেন, এখনও আমার ৫ টি মাদক মামলা ঝুলে আছে। কয়দিন পর পর আদালতে হাজিরা আর উকিলের পিছনে টাকা খরচ আমার জন্যে অনেক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। কোনোভাবে যোদি এই মামলা গুলো থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আর সরকারিভাবে সহযোগিতা পাই তাহলে আমি ব্যবসায় আরও প্রসার করতে পারবো। সেই সাথে অন্যান্য তরুণদের বয়লার মুরগী পালনের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে চাই। কারন আমি চাইনা আর কেউ আমার মতো ভুলপথে পা বাড়াক।
মাজেদ কে নিয়ে কথা হয় তার প্রতিবেশী রোহান রাজের সাথে। তিনি বলেন, একসময় মাজেদের কারনে নিজেদের সন্তানের বিপথে যাবার আতংকে থাকতাম। মাজেদ থেকে দুরে রাখতাম। কিন্তু এখন আমাদের সন্তানদের সেই মাজেদকে দেখিয়েই অনুপ্রেরণা জাগাই। মাজেদ যোদি তরুণদের নিয়ে কাজ করে তাহলে আমরা অবশ্যই অনেক উপকৃত হবো।
ঠাকুরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু তাহের সামসুজ্জামান বলেন, মাজেদের বিষয়টি শুনে বেশ ভালো লাগলো। তার জন্যে শুভ কামনা। তার সকল রকম সহযোগিতায় ঠাকুরগাঁও উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।