মানিকগঞ্জের লোকায়ত যাত্রাশিল্পের কথা

মানিকগঞ্জের লোকায়ত যাত্রাশিল্পের কথা
ছবিঃ সংগৃহীত

মো.নজরুল ইসলাম।। গ্রাম বাংলার হাজার বছরের লোকায়ত ঐতিহ্য এবং শিল্পমাধ্যমের সবচেয়ে সক্রিয় ও পরিব্যাপ্ত রুপ হিসেবে আমরা যাত্রাশিল্পকে প্রথম সারিতে দেখতে পারি। কয়েক শতক জুরে বিশেষ করে  প্রায় গত তিন শতাব্দী জুড়ে এই শিল্প আমাদের সমাজে বহমান ও তার ইতিহাস ঈর্ষনীয়।আবার এই সময়সীমার ভেতরে দুইশত বছর কেটেছে ্উপনেবেশিক শাসনাধীনে। উপনিবেশবাদ শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপাত্যেরই পরিপ্রকাশক ছিলো না, বরং স্বাদেশিক সংস্কৃতিকেও করে দিয়েছিল তছনছ ও বিপর্যস্থ। সেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়া থেকে আজো আমাদের মুক্তি ঘটেনি। কিন্তু এত অনাচারের  ভেতর দিয়েও বাংলার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের ঐতিহ্য পালাগান রচিত হয়েছে। শীত মৌসুমে সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যে দিয়ে সারাদেশ জুরে মঞ্চায়িত হয়েছে যাত্রাপালা। সমাজ ও ইতিহাসের বিপুলসব পরিবর্তনকে নিজস্ব উপায়ে মোকাবেলা ও ধারন করে অব্যাহত রয়েছে যাত্রা শিল্পের পথচলা।

যাত্রাশিল্পের ঐতিহাসিক ঘটনাপর্ব ব্যাপক ও বিস্তৃত হলেও আমরা এভাবে বলতে পারি যে- শ্রীচৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩) আর্বিভাবের সমপরিসরকে। তবে কৃষ্ণযাত্রা হিসেবে যাত্রার যে রুপকে আমরা ষোড়শ সপ্তক শতকে এসে লক্ষ করি তাতে ইতেপূর্বেকার বিভিন্ন শিল্পরুপের আত্তীকরণ ছিলো এবং সেই বিবেচনায় যাত্রার উতপত্তিকাল হিসেবে আরো পূর্ববর্তী সময়কে চিহ্নিত করেন গবেষকদের অনেকেই। শব্দমূল অনুসারে যাত্রা বলতে বুঝায় ধর্মীয় আচার পালনকালে বাদ্য ও সঙ্গীতসহকারে  পথানুগমন। দোলযাত্রা, রথযাত্রা,পুজা পার্বন ও বিচার গানসহ ইত্যাদি নানাবিধ ধর্মাচারের মধ্যে গবেষকগন যাত্রাপালার আদিউপাদান লক্ষ করেছেন। যাত্রার আদিরুপ হিসেবে নাট্যগীতেরও উল্লেখ করেন অনেকেই। ধর্মপালনের নাট্যগীত ধারায় সাধারনজনের প্রবেশাধিকার এবং মন্দির বা রাজগৃহের বাইরে  সাংবাৎসরিক এই মতো  উপাসনার সুযোগ বা রীতি এবং কৃষ্ণভাবের মধ্যে  মানবিকভাবের বিকাশ- এসবের সম্মিলন বাংলার ভাবজগত ও শিল্পসাধনায় এক বিপুল প্রবাহ সঞ্চার করেছে। এই ধারাতেই আমরা দেখি কীর্তন, ও পাঁচালির পথ বেয়ে পৃথক শিল্পরুপ হিসেবে যাত্রার উদ্ভব।

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ যাত্রা গান ও যাত্রাপালার এক অনন্য জনপদ। বাঙালির প্রবাহমান সংস্কৃতির আধাঁর এই যাত্রা শিল্পের বুননের ইতিহাসে দেশের অন্যতম উচ্চতায় আছে আমাদের মানিকগঞ্জ জেলা। স্থানীয়ভাবে মানিকগঞ্জের এই লোকজ যাত্রাপালাকে অনেকে ’ঘেটু যাত্রা’ বলে অবিহিত করে থাকে। বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতির অন্যতম বাহন হলো লোকজ যাত্রাপালা। আমাদের সমাজের নাটক ও যাত্রাশিল্পের বিকাশ কিন্তু মূলত লোকজযাত্রাপালার হাত ধরেই তার উন্মেষ ও বিকাশ লাভ করেছে। লোকজ যাত্রাপালাকে আশ্রয় করেই সংস্কৃতির অনেক শাখা প্রশাখা গজালেও লোকজ যাত্রাপালা আজও তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে প্রতাপের সহিত টিকে আছে।তাই লোকজ যাত্রাপালার আবেদন  আধুনিক এই ডিজিটাল যুগেও চিত্তবিনোদনের অন্যতম উপকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আধুনিক আকাশ সংস্কৃতির যুগে নাটক- সিনেমাসহ অসংখ্য টিভির পর্দার মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের বিচিত্র্য ব্যবস্থা থাকা সত্তে¡ও নগর ও গ্রামীণ জনপদের যান্ত্রিক সভ্যতায় এখনো লোকায়ত এই যাত্রা গান,যাত্রা শিল্প ও নাটক ব্যাপক প্রভাব বিস্তার নিয়েই জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের হৃদয়ে মানবতার বাণী নিয়ে বদ্ধমূল হয়ে আছে।

আমাদের জেলার আনাচে কানাচে কিছুদিন আগেও লোকজ যাত্রাপালা ও গানবাজনার ব্যাপকতা ছিলো বেশ। নাটক সিনেমা,যাত্রাগান,পালা গান,কবি গান,বিচার গান বা জারিগান সবকিছু ছারিয়ে এখন লোকজ যাত্রাপালায় নর নারীসহ সকল শ্রেণী পেশার শ্রোতাদের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয় এবং যাত্রাপলায় গ্রামীণ নারীদের সরব উপস্থিতি বেশ আকর্ষণীয়। লোক নাট্য বা যাত্রাপালার সেই খ্রিষ্টপূর্ব  প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই সংস্কৃতির ধারার বাকে বাকে বিকাশতা ও স্থবিরতার সাথে সংগ্রাম করেও আজও মন্থর গতিতে টিকে আছে।

আমরা জানি সাধারনত লোকযাত্রাপালায় কথা বা সংলাপের চেয়ে গীত ও নৃত্যের প্রাধান্য বেশি দেখা যায়। যাত্রাপালার অভিনয়ের কথায় কথায় গীত ও নৃত্য পরিবেশিত হয়। লোক নাট্যের প্রাচীনযুগে নাট্যাভিনয় গুলোতে গীত বাদ্য ও নৃত্যের প্রাধান্য ছিল বেশি। সংলাপ বলতে গেলে ছিলই না,মধ্য যুগে এসে লোক নাট্যে পদ্য সংলাপের প্রচলন আরম্ভ হয়। এখানেও নৃত্য ও সংগীতের প্রাধান্য ছিলো বেশ উল্লেখ করার মতো। লোক নাট্যের মধ্য যুগে এসে অভিনয় কোৗশল ও সাজসজ্জার বিয়টি যুক্ত হলেও গীত নৃত্য এখনো অপরিবতিত রয়েছে।কালের পরিক্রমায় আজ থেকে প্রায় চার দশক আগেও মেয়ে চরিত্রে পুরুষেরা মেয়ে সেজে অভিনয় করতো। ঐ সময় অভিনয়ের জন্য নারী শিল্পী পাওয়া খুবই দুস্কর ছিলো বলেই বাধ্য হয়েই চেলেদেরকে মেয়ের অভিনয় করতে হইতো। সেই সময়ের পরিবর্তন হয়েছে এখন আশা করি এই ধরনের কষ্ট আর করতে হবে না। কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়েরাও এখন ছেলেদের অভিনয় করে এটাও কম কি।
যাত্রাপালার কাহিনীগুলো নানা বৈচিত্র্যময় ঘটনাপ্রবাহকে আশ্রয় করে রচিত হয়েছে। নানা ধ্যান ধারনা কল্পনা,লোক বিশ্বাস,আচার অনুষ্ঠান,লোকিক দেব দেবী,রুপ কাহিনীর রাজা বাদশা ও ঐতিহাসিক ঘটনাকে উপজীব্য করে লোক নাট্য বা লোকজ যাত্রাপালা নির্মিত হয়েছে। 

যেমন দেব দেবীর কাহিনী ভিত্তিক সিতার বনবাস,সীতা হরন,রাজা হরিশচন্দ্র,কৃষ্ণলীলা,নৌকা বিলাস,নাবাব সিরাজউদোল্লা,মাইকেল ও ইশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর,বেহুলা লখিন্দারের পালা ইত্যাদি। আবার লৌকিক দেব দেবীর বা কাহিনী ভিত্তিক- ভাসান যাত্রা,জামাল কামালের পালা,মদন কুমার,মধুমালার পালা,সাগর ভাসার পালা, সেকেন্দার বাদশা ও গুনাই বিবির পালা ইত্যাদি। ইতিহাসভিত্তিক কাহিনীমূলক পালার মধ্যে অন্যতম হলো মুকুট রাজার পালা, শহীদ কারবালার বা ইমামের পালা, আলাল দুলালের পালা,ভাওয়াল সন্নাসীর পালা ইত্যাদি।
উপরোক্ত লোকনাট্যের পালা ছারাও স্থানীয়ভাবে আরো অনেক পালা রয়েছে। যেমন- আমাদের জেলায় ব্যাপক পরিচিতি আছে  গাজীর যাত্রা পালা’র এবং তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। এছারাও আমাদের জেলায় ইমাম যাত্রা বা শহীদ কারবলাও প্রচুর মঞ্চায়িত হচ্ছে। আলাল দুলাল পালাটিও আমাদের এলাকার জন্য খুবই জনপ্রিয় একটি পালা। আমরা স্থানীয়ভাবে ইদ,পূজা,পার্বন,বিয়ে ও বৈশাখ উপলক্ষ্যে এখনো লোকজ যাত্রাপালার আয়োজন করে থাকি। আরেকটি সুখের কথা হলো বহুত্ববাদি সাংস্কৃতিক সমাজের অংশ হিসেবে এই জেলায় স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ওলী আউলিয়া ও পীর দরবেশের ওরশ শরিফ মেলা উপলক্ষে দিনের বেলায় বিচার গানের পর রাতে অবশ্যই কোন না কোন সামাজিক যাত্রাপালার আয়োজন থাকবেই। অসাম্প্রদায়িক চেতনার জেলা হিসেবে আমাদের বেশ অর্জন ও  গর্বােবাধ থাকলেও তারপরও রয়েছে তথাকথিত শিক্ষীত চেতনার অন্ধত্ব।