মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে মানববন্ধন 

মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে মানববন্ধন 
ছবি: মো. নজরুল ইসলাম
মো.নজরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি।।
"স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে চাই সমতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণ" এই প্রতিপাদ্য কে সামনে রেখে আজ  মানিকগঞ্জ জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরাম এর আয়োজনে ও হেলথ ওয়াচ ও বারসিক এর সহযোগিতায় মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাব চত্বরে সকাল ১১.০০ ঘটিকা থেকে ১২.০০ ঘটিকা পর্যন্ত মানববন্ধন  কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। 
কর্মসূচিতে জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরাম এর সভাপতি ডাঃ পঙ্কজ কুমার মজুমদার এর সভাপতিত্বে ও সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায় এর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন জেলা মানবাধিকার ফোরাম এর সভাপতি এ্যাডভোকেট দিপক কুমার ঘোষ, জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান শ্রীমতী লক্ষী  চ্যাটার্জী, স্বাস্থ্য অধিকার কর্মী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন,  বারসিক প্রকল্প কর্মকর্তা মো.নজরুল ইসলাম প্রমুখ। 
বক্তারা বলেন- আমাদের মৌলিক চাহিদা ও মানবাধিকার এর অন্যতম নিয়ামক হলো স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি করতে হলে বাজেট বরাদ্দ অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের বাড়তি জনসংখ্যার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো ও  জনবল বৃদ্ধি করতে হবে।এই খাতের অনিয়ম অব্যাবস্থাপনা রুখতেই হবে।
উল্লেখ্য যে- স্বাস্থ্য খাতের  কিছু সূচকের অগ্রগতি ঘটলেও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনতুষ্টি আসেনি। না আসার অনেক কারণ। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাজেট স্বল্পতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্বল অবকাঠামো, জনবলের ঘাটতি, অদক্ষতা, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, শিক্ষার মানের অবনমন এবং গবেষণার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক গড় হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে জিডিপির ১০ শতাংশ খরচ হয়। এর মধ্যে ব্যক্তির পকেট থেকে আসে ৩৫ শতাংশ আর সরকার দেয় ৫১ শতাংশ, বাকিটা অন্যান্য উৎস থেকে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১০ কোটি মানুষ চরম দরিদ্র হয়ে যায়। মোটাদাগে বিশ্বে তিন ধরনের সফল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু আছে। আমাদের দেশ এর কোনোটির মধ্যেই নেই, আমরা এক জগাখিচুড়ি অবস্থার মধ্যে আছি। তাই স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে আমাদের দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা না কমে ক্রমেই বাড়ছে।
২০১২ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তৈরি ‘স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলপত্রে’ বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে ৩২ শতাংশে আনা হবে। এই কৌশলপত্র তৈরির সময় স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৪ শতাংশই বহন করতেন ব্যক্তি, সরকার দিত ২৬ শতাংশ আর অন্যান্য উৎস থেকে আসত বাকি ১০ শতাংশ। কিন্তু আমরা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে লক্ষ করছি, দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেট, সরকারের নীতি ও পরিকল্পনায় ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
অপর দিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষায় দ্রুতগতিতে ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে বেসরকারি অংশীদারি ও নিয়ন্ত্রণ। তাই পণ্যে পরিণত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ব্যক্তির স্বাস্থ্য ব্যয় কমার বদলে বেড়ে ২০১৭ সালে ৬৭ শতাংশে আর ২০১৯ সালে ৭২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। অপর দিকে, ২০১৭ সালের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তির পকেট খরচ মালদ্বীপে ১৮, ভুটানে ২৫, শ্রীলঙ্কায় ৪২, নেপালে ৪৭, পাকিস্তানে ৫৬ আর ভারতে ৬২ শতাংশ অর্থাৎ বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। এর ফলে স্বাস্থ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে (প্রথম আলো, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ও ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)।
জাতিসংঘের মতে, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা, বাজেটে যথাযথ বরাদ্দ দেওয়া এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বছরে মাথাপিছু ব্যয় হয় মাত্র ৩২ ডলার। একই সময়ে এই খাতে পাকিস্তানে ব্যয় হয় ৩৮, নেপালে ৪৫, ভারতে ৫৯, ভুটানে ৯১, শ্রীলঙ্কায় ১৫১ ডলার। বিগত প্রায় দেড় যুগের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাত বরাবরই অবহেলার শিকার। এ দীর্ঘ সময়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৮ (গড়ে ৫ দশমিক ৫) শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং জিডিপির ক্ষেত্রে সব সময়ই ১ শতাংশের নিচে থেকেছে। অর্থাৎ সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতকে সঠিক গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ব্যয়ে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
২০১৫ সালের স্বাস্থ্য খাতের খরচে জিডিপির অংশ বাংলাদেশে ২ দশমিক ৩৭, ভুটানে ৩ দশমিক ৪৫, ভারতে ৩ দশমিক ৬৬, নেপালে ৬ দশমিক ২৯ ও মালদ্বীপে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে বৈশ্বিক গড় ছিল ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ (সূত্র: বিশ্বব্যাংক ডেটা ২০১৯)।