মানবাধিকার: নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য

মানবাধিকার: নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য
ছবি: সংগৃহীত

 সাম্যবাদী সুফী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার সাম্যবাদী কাব্যগন্থ্যে বলেন- ইসলাম বলে,সকলের তরে মোরা সবাই সুখ দু:খ সমভাগ করে নেব সকলে ভাই নাই অধিকার সঞ্চয়ের। কারো আঁখি জলে,কারো ঘরে ফিরে জ¦লিবে দীপ? দুজনার হবে বুলন্দ নসিব, লাখে লাখে হব বদনসিব, এ নহে বিধান ইসলামের।

ভূমিকা: সংক্ষেপে মানবাধিকার বলতে বুঝি,নূন্যতম মৌলিক অধিকারগুলোর সমন্বয়ে সুন্দর,সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার যে অধিকার তাই হলো মানবাধিকার। মানুষ স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে সুন্দর ও সাবলীলভাবে নিজ জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে এটাই স্বাভাবিক এবং তার জন্মগত অধিকার। এক কথায় বলা যায় যে, আমাদের এ জগতে দেশে দেশে ও সময়ের বির্বতনে মানুষের যে মৌলিক ও সার্বজনিন অধিকার স্বীকৃতি পেয়ে আসছে তাই হলো মানবাধিকার। একটি দেশে বিভিন্ন জাতি -ধর্ম-বর্ণ ও গোত্রের বাস থাকতে পারে। উঁচু নিচু যাই হোক না কেন সকল মানুষেরই তার নিজ দেশের প্রতি একটি জোড়ালো অধিকার থাকে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতে দেখা যায় যে, ক্রমহ্রাসমান হারে  নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার ভুলন্ঠিত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে যে মানুষের জন্য সকল প্রকার মানবাধিকার সেই মানুষকেই নাগরিক বললেও তার সাথে অনেক কথা জড়িয়ে আছে। ‘নাগরিক’ কথাটির অর্থ অতি ব্যাপক। সাধারনভাবে নাগরিক বলতে কোন নগরের অধিবাসীকে বোঝায়। কিন্তু বর্তমানে বৃহত্তর অর্থে কোন রাষ্ট্রের অধিবাসীকে নাগরিক বলা হয়।গ্রিসের ক্ষুদ্র নগর তথা রাষ্ট্রের অধিবাসী সে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রথম যে স্বীকৃতি লাভ করেছিলো সেটি বহুকালের বিচিত্র পরিবর্তন ও বিবর্তনের মাধ্যমে এই সময়কালে বৃহত্তর পরিধিতিতে পৌছেছে। তাই আজকের দিনে নাগরিক বিশেষ কোন নগরের অধিবাসী নয়; শহর,বন্দর,গ্রাম গঞ্জে যে যেখানেই থাকুক না কেন সে সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচিত। বিশ্বায়নের যুগে আমরা আরো একধাপ এগিয়ে বলতে পারি যে আমরা গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা। ইন্টারনেট কান্টেটিভিটি ও গুগল জগতে সারাজগতই আমার বাড়ী।

 নাগরিক থেকে মানবাধিকারের সূচনাকাল: নাগরিকত্ব অর্জনের বিভিন্ন ধরনের পদ্বথি বা উপায় আছে। দেশে দেশে তা ভিন্নধর্মীও হয়। তবে বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব অর্জনের ভিন্ন ভিন্ন পন্থা থাকলেও সাধারনভাবে প্রত্যেক নাগরিকের কিছু না কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। প্রত্যেকে দেশেই তার মতো করে নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুখ সাচ্ছন্দের প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা করে থাকে। নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে সেগুলো পালনের মাধ্যমে আমরা নাগরিকের প্রয়োজনীয় কর্তব্য সম্পাদন করে থাকি। তাই নাগরিক কথাটির সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্য কথাটি আঙ্গাআঙ্গিভাবে জরিত। অন্যদিকে মানবাধিকারের ইতিহাস নাতিদীর্ঘ নয়। প্রাচীনকালে থেকেই বিশে^র মানুষের মধ্যে যুদ্ধ ও হানহানি চলেই আসছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও ভাষার জন্য এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যেত। জাতিতে জাতিতে,ধর্মে ধর্মে,গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে,সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে আধিপাত্য বিস্তারের জন্য প্রাচীনকাল থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গা সংঘাত কম হয়নি। এর প্রভাব বিস্তারের ফল স্বরুপ পৃথিবীতে এ পর্যন্ত দুটি বিশ্ব যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক দ্বন্দে অসংখ্য নিরহী মানুষের অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছে এবং এখনো অনেক দেশ সাম্রাজ্যবাদি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। মানবইতিহাসের আদিম সাম্যবাদী যুগের পর সভ্যতার গোড়াপত্তনের শুরুকাল থেকেই যুক্ত হয়েছে এবং মনুষ্যসৃষ্ট ধর্মযুদ্ধও কম হয়নি। ইশ্বরের নাম যুক্ত করে এসব ধর্মবোত্তারা সারা দুনিয়ার মানুষের ভিতর বিভেদ,সংঘাত,বৈষম্য ও সামাজিক সহিংসতার মতো তুঘলিক কান্ড বাঁধিয়ে রেখেছে। এই ধরনের ধর্ম ও বল্লযুদ্ধের নয়ারুপই হলো সাম্রাজ্যবাদ,আধিপাত্যবাদ,সাম্প্রদায়িকতা,মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী অপসাংস্কৃতিক তৎতপরতা। মানুসের অধিকার লঙ্ঘনের হাত থেকে পৃথিবীকে সুন্দর করার লক্ষে মানুষে মানুষে শান্তি,মৈত্রি ও সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তুলতে হবে এবং সর্বোপরি সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চত করতে হবে। দুনিয়ার সকল মানুষ যদি তার মৌলিক মানবাধিকার তথা নুন্যতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়,তবে ব্যক্তিসহ সে অঞ্চলের মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে।

মানবাধিকার ধারনার পর্যাক্রম: বৈশি^ক নয়া পূজিবাদী দুনিয়াতে সময়ের স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষ একধরনের মৌহ ও দুর্বিনীত আকর্ষণে ছুটছে। সময়ের চাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ আজ সভ্য ও বৈজ্ঞানিক যুগে বাস করছে। এ যুগে মানুষ তার সঠিক অধিকার সম্পর্কে বুঝতে পারে। মানবাধিকার এখন কোন গুপ্ত ঘটনা নয়। দুনিয়ার সকল দেশেই সাংবিধানিক দিক দিয়ে মানবাধিকার আইনের আসনে অধিষ্টিত হচ্ছে। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে ব্যাবিলনের রাজা হাম্বুরাবির নিয়মাবলিতে প্রথম মানবাধিকার সংক্রান্ত ধারনার পরিচয় পাওয়া যায়। খ্রিষ্টীয় ৭ম শতকেও মদিনায় ইসলাম ধর্মের প্রবক্তা হযরত মুহাম্মদ (স) কর্তৃক প্রণীত ’মদিনা’সনদে মদিনায় বসবাসকারি  সকল ধর্মভিত্তিক লোকদের সমান অধিকারের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১২১৫ সালের ইংল্যান্ডে প্রণীত ’ম্যাগনাকার্টা’কে মানবাধিকারের প্রথম চার্টার বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। যদিও পরবর্তীকালে ১৭৭৬ সালে আমেরিকার ’স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রে’ ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মানবাধিকার সনদ এবং ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের অমর বাণী আজও বিশ্বের দরবারে মানবাধিকার আন্দোলনের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সার্বিক দিক থেকে আমরা বলতে পারি যে, সেই প্রাচীন মানবের সূচনালগ্নে থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মানবিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে আসছে। এসব বিপর্যয়ের কথা আমরা সর্বকালের শেষ্ঠ মানবতার মহাবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস, হেগেল,মহমতি এ্যাংগেলস,প্লেটো, এরিষ্টটল, জন লক, রুশো, হুগো প্রমুখ মনীষীদের রচনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি।

সর্বস্তরের মানবাধিকার: মানবাধিকার শুধু মুষ্ঠিমেয় জনগনের জন্য নয়। এটি সর্বস্তরের সব মানুষের জন্য সমান।এই সুন্দর পৃথিবীতে সবাই সুখে-শান্তিতে সমান অধিকারের ভিত্তিতে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল তাদের হীন স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে। সেই ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সালে ফ্যাসিবাদি হিটলালের জার্মানি ও মুসোলিনীর  ইতালি জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি করে ও মানব সমাজে এক বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাদেরই নৃশংসতা ও বর্বরতায় বন্দীশিবিরের লাখ লাখ ইহুদি হত্যা করে, ফলে সারাবিশ্বে মানবাধিকার ব্যাপক হারে আরো বিপর্যস্থ হয়ে ওঠে। এই ধরনের নিশংস ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে বিশ্বের বিবেকবান লোক মানবাধিকার লঙ্ঘন রক্ষার্থে একযোগে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৪৫ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধের মতো বিপর্যয় এড়াতে সানফ্রানসিসকো শহরে জাতিসংঘ সৃষ্টি করা হয়। কিছুদিন পর সকল স্তরের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে জাতিসংঘ একটি সনদ প্রকাশ করে এবং এই সনদই হলো সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও গৃহিত বিশেষ দলিল। যে দলিলের মূল লক্ষ হলো পৃথিবীতে মানুষ আগে রাষ্ট্র নয়। তাই মানুষের অধিকার আদায় ও অধিকার বিপর্যয়ের হাত থেকে তাদেরকে মুক্ত করতে হবে। তাদের দিতে হবে সমানাধিকার ও স্বাধিনতা। তবে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জাতিসংঘের সার্বজনিন মানবাধিকারের ঘোষনা গৃহিত হওয়ার পর থেকেই বিংশ শতাব্দিতে বিশ^ব্যাপি মানবাধিকার প্রাতিষ্ঠানিক দিক দিয়ে মর্যাদা লাভ করে। মানবাধিকারের ৩০টি ধারা সম্বলিত স্বীকৃতিপত্রে ১৯টি ধারা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে এবং ৬টি ধারা মানুষের সামাজিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে। অর্থাৎ সমাজে বাস করতে হইলে প্রত্যেক মানুষেরই  সামাজিক দিক থেকে সবার সমান অধিকার ভোগ করতে হবে। কোন মানুষই অবহেলার পাত্র নয়। প্রত্যেকেই তার ন্যায্য দাবি পুরন করতে দিতে হবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দলিল: জাতিসংঘ মানবাধিকার রক্ষর্থে যে ঘোষনাপত্র পেশ করেছেন তা সবার জন্য সমান। ঘোষনাপত্রটি ভালোবাবে  ও বিচক্ষণতার সাথে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, মানবাধিকারের কিছু মৌলিক দিক তুলে ধরা হয়েছে।মৌলিক দিকগুলো হলো-মানুষ জন্মগতভাবে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার ভোগ করার অধিকারী। জাতি-ধর্ম ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই বিয়ে ও পরিবার গঠনের,সম্পত্তি অর্জনের ও সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার আছে। প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্ম চর্চা, ভোট প্রদান, চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।প্রতিটি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা,বিশ্রাম,বিনোদন,স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অধিকার আছে।সমাজ ও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই  তার কর্মের উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের শিক্ষা ও সংস্কৃতি,সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করার অধিকার রয়েছে।কোন দেশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অন্য দেশের অধিকার নেই।

জাতিসংঘের ঘোষনাপত্রে বিশিষ্ট দিকগুলো লক্ষ করলে বলা যায়, কারো অধিকার কারো লঙ্ঘন করা কোনভাবেই উচিত নয়। কেউ লঙ্ঘন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।’অন্যের অধিকার ’অন্যের থাক আমার অধিকারে আমি’ – এ মূলমন্ত্রে সবাইকে এগিয়ে চললে বিশ্বজগতে শান্তির ফোয়ারা ঝড়বে। দেশে দেশে কত যুদ্ধ,কত সংঘাত এত মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই এক জঘন্যতম অপরাধ। আমরা চাই বিশ্বের সকল স্তর থেকে দূর হোক মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বর্তমান বিশ্বের মানবাধিকার:  ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর গত কয়েক দশক ধরে স্নায়ুযুদ্ধের পাশাপাশি বৈশ্বিক পূজিবাদী অর্থব্যবস্থায় একচেটিয়া বাজার ও ক্ষমত দখলের প্রতিযোগীতায় এমনিতেই মানবতার চরম লঙ্ঘন করে প্রাণ প্রকৃতি উজার করে বর্তমান বিশ্বে কর্তৃত্ববাদ ও মৌলবাদের জয়জয়াকার চলছে। সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার সাময়িক অবসানের পর পুজিবাদী এককেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা জনজীবন অতিষ্ঠ করে বেশ দাপটের সহিত চলতেছিলো। হঠাৎ করে ২০১৯ সাল থেকে  ভিন্ন মডেলের সমাজতান্ত্রিক গণচীনের উহান শহর থেকে করোনা ভাইরাস নামক এক প্রকার প্রাকৃতিক না কেমিকেল সেই বিতর্কিত কোভিড-১৯ নামক অদৃশ্য ভাইরাস সার দুনিয়াকে উলোট পালট ও নাজেহা করে দিয়েছে এবং এই নাস্তাবাদি তান্ডব কখন সমাপন ঘটবে তারও কোন সঠিক উত্তর নেই জাতিসংঘের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছেও। তারপরও মানুষ তার টিকে থাকার সংগ্রামে রোগের সাথে যুদ্ধ করেও জীবন জীবিকার সংগ্রাম করতে গিয়ে রাষ্ট্র বনাম নাগরিক দ্বন্ধ হচ্ছে এবং এর মধ্যে দিয়েও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আধুনিক যুগে যতই বলা হোক মানুষ সভ্য হচ্ছে কিন্তু এর আড়ালে মানুষই বিশ্ব মানবতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে দিন দিন মানুষ যন্ত্রময় দানবে পরিনত হচ্ছে। মানব মনে পূজিবাদী এককেন্দ্রীক চিন্তা চেতনায়  মায়া মমতা হে ভালোবাসা,প্রীতি,প্রেম তারা একেবারেই হারিয়ে ফেলছে। নারী নির্যাতন,শিশু নির্যাতন,বাল্য বিবাহ,হত্যা,ধর্ষন, যুদ্ধবাজদের যুদ্ধ এ যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের হীন পর্যায়ে এসে পৌছে গেছে। বিশ্বের কোন বিবেকবান সচেতন মানুষ এগুলো চায় না। কিন্তু ক্ষমতার দাপট শ্ত্রুতা, বর্ণ বৈষম্য, জাতিভেদ, অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ মানুষকে নিচু পর্যায়ে ধাবিত করেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাব আপগানিস্থান ও ইরাকের মতো দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যুদ্ধের নামে নিরীহ নরনারী ও শিশু হত্যা করে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। বিশ্বের সব সচেতন ও বিবেকবান মানুষের আন্দোলন সংগ্রাম ও বিক্ষোভের তোয়াক্কা না করে  আমেরিকা প্রশাসন ও তার দোসর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদি প্রশাসন ইজরায়িল,ফিলিস্তিনি, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য সহ আফগানিস্তানে একদিকে সাম্রাজ্যবাদি আমেরিকার সৃষ্ট তালিবানদের অত্যাচার ও আমেরিকার মদদপুষ্ট পুতুল সরকার তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেরে এখন গৃহযুদ্ধ ও গভির অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে আফগান নাগরিকরা। এছারাও  তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোকে নানা ধরনের অর্ধনৈতিক অবরোধ ও বিধিনিষেধ দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের তালেই আছে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশকেও নানান ঋণের ফাদে রেখে আবার রোহিঙ্গা সংকটের নতুন জালে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দে¦ আবদ্ধ করে রেখেছে। এগুলো ছারাও খবরের বাইরে যে সকল মানবতা বর্হিভূত কাজ করছে সেটি সত্যিই ধিক্কারজনক। আজ আফগানিস্থান,লিবিয়া,সিরিয়ার মতো যুদ্ধ বিপর্যস্থ দেশগুলো পুঙ্গ ও অথর্বের মতো মুখ থুবরে পড়ে আছে। প্রতিবেশী ভারতের সাম্প্রদায়িক ও আধিপাত্যবাদি আগ্রাসন বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে তারা প্রকারন্তরে অঙ্গ রাজ্যে পরিনত করে রেখেছে। ভারতে উগ্রবাদি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা মুসলিম নিধন, আবার বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদ দ্বারা হিন্দু নিধন এ যেন এক নয়া সাম্প্রাজ্যবাদের ভয়ঙ্কর রুপ। এই উপমহাদেশের স্মরনকালের ভয়ঙ্কর মানবাধিকার লঙ্ঘন হলো ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম শাসনামলের অন্যতম নিদর্শন মুঘল সম্রাট বাবরের স্মৃতিবিজরিত ’বাবরি’ মসজিদ ধ্বংস ও সেখানে রাম মন্দির নির্মানের আয়োজন যেন প্রচলিত সীমা লঙ্ঘনকেও ছারিয়ে ফেলেছে। যারা জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রন করে এরং প্রথম সারির দেশ ও দল তারাই যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরো কতটা হুমকির মুখে পড়বে সেটি সচেতন মহলের অনুমেয় হলেও আমরা ভাবতেও পারিনা।

নাগরিক অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য: প্রতিটি রাষ্ট্রের নাগরিকেরই সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার থাকে। তাছারা কতগুলো মৌলিক অধিকারও সকল নাগরিকগন ভোগ করে থাকেন। যেমন- বাঁচার অধিকার,শিক্ষার অধিকার, চিকিৎসা লাভের অধিকার,বাসস্থানের অধিকার, বিনোদন ও ধর্ম পালনের অধিকার। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য এসব অধিকার দিতে বাধ্য থাকিবে বলে সংবিধানে বলা থাকলেও সেদিকে না গিয়ে কর্তা ব্যক্তিরা বলে থাকেন আমরা নাগরিকের  অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা ও নিরলসভাবে কাজ করছি। পক্ষান্তরে নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। রাষ্ট্র ও নাগরিক যখন তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অনিহা,অসামথ্য ও অযোগ্য হয়ে পড়ে তখনই দেশে নানা ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি হয়। আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও অনেক দয়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। সংবিধানের ২০ ও ২১ নং অনুচ্ছেদে নাগরিকের কর্তব্য পালন সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে উল্লেখিত নাগরিক কর্তব্যগুলো হলো- সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা, জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা ও সকল সময়ে জনগণের সেবার করার চেষ্টা করা। নাগরিকের দায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের আরো জানা দরকার যে-প্রথমেই রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করতে হবে।রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।প্রচলিত আইন এবং সংবিধান মেনে চলা আবশ্যকীয়।ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করাও নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব। আয় অনুযায়ী কর দিয়ে দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করতে হবে।জনগণের উন্নয়নের জন্য গ্রহণ করা সব কাজ সঠিকভাবে করতে প্রয়োজনে সহযোগিতা করা।সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ও শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে স্কুলে পাঠানো বাবা মায়ের দায়িত্ব।নিজস্ব সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় অর্জন, সফলতা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় ইতিহাস, জাতীয় বীর ও মনীষীদের অবদানকে স্মরণ করতে হবে। সমাজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হবে। সামর্থ থাকলে অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেশপ্রেম থাকলেই সুনাগরিক হয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রাখা যাবে। বিশ্বের বুকে আমাদের লাল-সবুজের পতাকা সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরাও সম্ভব হবে। 

এছারাও একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের আরো দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। জাতীয় জীবনে উন্নতি ও অগ্রগতি নাগরিকের কর্তব্য পালনের মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্রর কাছে নাগরিকের প্রাপ্য অধিকারের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছারাও রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কোন দেশের নাগরিক হিসেবে এ ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে নিজের গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা সাধারনত দেশের নাগরিকগন পালন করে থাকে। আমরা জানি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য একটু বেশি থাকে। সেজন্য স্বাধীন দেশের নাগরিকদের  বেশি পরিমানে কর্তব্যপরায়ণ হওয়ার প্রয়োজন আছে। পরাধীন দেশে শাসকের হাতেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থাকে। কিন্তু স্বাধীন দেশে যেখানে শাসক ও জনগনই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে সেখানে নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় আরো কর্তব্যসচেতন হইতে হয়।

 বিশ^ মানবাধিকার তথা নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে পরিশেষে আমরা এই উপসংহার টানতে পারি যে মানুষ যা পেতে চায় বা তার যা পাওয়া উচিত তা-ই হল তার মানবাধিকার। যদি সে তার সে পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হয় তবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে। নিরাশার ঘরেও সলতের প্রদীপ নিবু নিবু জ¦লে। আমরা আজ নিরাশার ঘরে বাস করছি। মানুষের দিন দিন সচেতনতা বৃদ্ব্যিই হলো আমাদের সলতের আলো। আমাদের একটাই আশা-মানুষ একদিন নিজেকে বুঝতে শিখবে,অপরের অধিকার সম্পর্কে বুঝতে পারবে। নারী-শিশু ও ভাগ্যহতদের প্রতি সবার সহানুভূতি বৃদ্ব্যি পাবে। মানবাধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান,স্বাস্থ্য শিক্ষা ইত্যাদি সবার মাঝে সমানভাবে বন্টন করে সবার অধিকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা মনে করি  বিশ^ময় শান্তির বার্তা বহন করবে। একটি সুন্দর ও প্রীতিময় পরিবেশের সৃষ্টি হবে এটাই সব শান্তিপ্রিয় সচেতন মানুষের কাম্য। বিশ্ব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নাগরিকের অধিকার দয়িত্ব ও কর্তব্যকে আরো টেকসই করতে আমরা আরো বলতে পারি যে আমাদেরকে নিজ দায়িত্ববোধ থেকেই আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন, সরকারি আদেশ-নিষেধ অনুসরণ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করলে দেশের অগ্রগতি তরান্বিত হবে। অনেক স্বার্থপর ব্যক্তি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনাচারের আশ্রয় নেয়, নাগরিকগনকে সেটি রোধে সহযোগিতা করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এ দুটি মৌলিক কাজে নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশের মালিক জনগন,সরকার নয়। সরকার কেবল জনগন প্রদত্ত প্রতিনিধিত্বমূলক দায়িত্ব পালন করছেন।আমরা আরো বলতে পারি দেশের কল্যানের দায়িত্ব সম্পর্কে নাগরিকরা কর্তব্যপরায়ন না হলে শুধু সরকারের পক্ষে দেশের সার্বিক কল্যান সাধন করা,সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা, নারী-পুরুষে বৈষম্য হ্রাস করাসহ বহুত্ববাদি সাংস্কৃতিক সমাজ বিনির্মান করে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছান সম্ভব নয়।

[  মো.নজরুল ইসলাম- উন্নয়নকর্মী,সাংবাদিক ও গবেষক। যোযাযোগ: nozorali1985@gmail.com ]

তথ্যসূত্র: প্রফেসর আলাউদ্দিন আল আজাদ,ড. মনন অধিকারি,রুহুল আমিন বাবুল রচিত - উচ্চতর বাংলা ভাষারীতি,পৃষ্ঠা- ২১৮,১৯

= তোষামদ ও রাজনীতির ভাষা,মুহাম্মদ আব্দুল হাই

= গুগল,উইকিপিডিয়া

= বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-সুকুমার সেন

= বাংলাদেশের সংবিধান

= প্লেটোর রিপাবলিক- দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম

= মার্কস বাদের সহজ পাঠ- হায়দার আকবর খান রনো