যুব সমাজের অবক্ষয় বনাম যুবশক্তিতে রুপান্তর

যুব সমাজের অবক্ষয় বনাম যুবশক্তিতে রুপান্তর
মোঃ নজরুল ইসলাম

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম(২০-০৮-২০২১) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য তার আঠার বছর বয়স কবিতায় বলেন- আঠারো বছর বয়সে নেই ভয় পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা, এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়- আঠারো বছর বয়স জানেনা কাঁদা। তব আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি, এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে, বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।

ভূমিকা: আমরা জানি যুব সমাজ পরিবার সমাজ ও দেশের ভবিষ্যত। প্রবীণরা ছেরে দিবে স্থান,তারা রাখবে তাদের মান এবং করবে সমাজকে উজ্জ্বল। সমাজে থাকবে না ভেদাভেদ দলাদলি ও দখলদারিত্ব যুব সমাজের কাঁধে পা রেখে সাম্য ও ন্যায্যতার সমাজ গড়ে উঠবে এটাই আমার সাধারন স্বপ্ন। সমাজের সকল স্থর থেকে একটি দেশের যুব সমাজ জ্ঞানে, গুনে, শিক্ষায়, কর্মে, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে অগ্রসরমান হলে সে দেশের উন্নতি কেউ ঠেকাতে পারে না। কোন কারনে কোন দেশের কোন স্তরে যুব সমাজের অবক্ষয় দেখা দিলে সে জাতি অঙ্কুরেই ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। আমাদের দেশে তরুণের ভান্ডার এবং বিভিন্ন স্তরে বিপুল সংখ্যক বিভিন্ন শ্রেণীর তরুণ রয়েছে। তাদের মধ্যে চলমান লেখাপড়ারত নির্ভরশীল যুবকের পাশাপাশি শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার যুবকের সংখ্যাও কম নয়। আধুনিক এই বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে এদের চলার পথ বিচিত্র,ভাবনা- চিন্তার জগৎ এদের রুদ্ধ এবং নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার দ্বান্দ্বিকতায় বেশিরভাগই  হতাশাগ্রস্থ ও বিপর্যস্থ।

বিপথগামীতার কারণ: জাতীয় জীবনে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয় তখন প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সবাই আক্রান্ত হয়।  পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে আমরা কেউ এর দায় এড়াতে পারি না। পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বর্তমানে চরম অবক্ষয়ের চিহ্ন বিদ্যমান। এ অবক্ষয় যুব সমাজকে নাড়া দিয়েছে ব্যাপকভাবে। বৈশ্বিক পূঁজিবাদি অর্থব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ হলেও পরিত্রানের ভাবনা কারো মাথায় নেই। বর্তমান বাজার অর্থনীতির ভোগবাদি সমাজে প্রীতির বদলে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। যে সমাজে নীতি পদদলিত,বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে, অসৎ পথে অবৈধ অর্থের পাহার গড়ে ওঠে সে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ ধূলায় গড়াগড়ি যায়। তরুণরা উদ্দাম তারা ধ্বন্নি তারা নির্ভয়ে পথ চলবে।
সময়ের গতির সাতে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে  জীবনে হতাশা ও বিপদ আসবেই। আধুনিক শিক্ষা সভ্যতার নতুন পথসন্ধানী কর্মমুখর জীবনে বিশ্ব এগিয়ে চলছে। বিজ্ঞান অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। পৃথীবির এ নবজীবনের স্বাক্ষর  কেন আমাদের জীবনে নেই। কারন আধুনিক সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানে আমরা অনেক পিছিয়ে। তাই অর্থনৈতিক দিক দিয়েও আমরা দুর্দশার সম্মুখীন। বর্তমানে আমাদের যুবসমাজের অবক্ষয়ের পেছনে অর্থনৈতিক দুর্দশাই মূল কারন বলে বিবেচিত। এছারাও  সম্প্রতি যুব সমাজের উচ্ছৃঙ্খলতায় সবাই উদিগ্ন। তাদের উচ্ছিৃঙ্খলতার কলঙ্কিত স্বাক্ষর পড়ে পরিক্ষাগৃহে,বাসে রেলে,পথে ঘাটে,সমাজ জীবনের অলিতে গলিতে। আমরা বিশ্বাস করি ছাত্র ও যুব সমাজ অগ্রগামী দল। তারা স্বভাবতই সামনের দিকে যেতে চায়,আরো চায় কর্মব্যাস্ততা। কিন্তু যেখানে অগ্রসরের পথ রুদ্ধ,সেখানে কর্মহীনতার বিশাল অবকাশ মানসক্ষেত্রকে শয়তানের কারখানায় পরিনত করে।  ছাত্র ও যুব সমাজকে যদি শৃঙ্খলাবোধে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে উচ্ছিঙ্খলতার মূল কারনগুলো খুঁজে নিয়ে সেটি বিলুপ্ত করতে একযোগে কাজ করতে হবে।

বেকারত্ব: বেকারত্বের অভিশাপ আমাদের তরুণ তরুণীরা জর্জরিত। এটাও তাদের বিপথগামীতার অন্যতম কারন। তরুণরা বিশ^বিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রী লাভ করেও কোন কাজ পাচ্ছে না। লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ। চাকরির দরখাস্ত করতে ব্যাংক ড্রাফট, মানি অর্ডার,পে অর্ডার. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা,স্থগিত বানিজ্য ইত্যাদি সমস্যা যুব সমাজকে আরো হতাশ করে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকই বখে যায়। তারা চুরি,খুন,রাহাজানি,ছিনতাই,অপহরনসহ নানা ধরনের কুরুচিপুর্ণ সিনেমা,পর্ণগ্রাফী দেখে,ইভটিজিং ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জরিয়ে পড়ে।
অবক্ষয় নিরোধের সাধারন উপায়: আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রযুক্তির অপব্যাবহার ও অপসংস্কিৃতি থেকে বেরিয়ে  সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চাকে পুনজ্জীবিত করা। তাদেরকে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় উৎসাহিত করা। তরুনদেরকে সংগঠিত করে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার চেষ্টা চলিয়ে যেতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও তার বাইরে তরুণদেরকে নিয়মিত খেলাধুলা,শরিরচর্চার ব্যাবস্থা রাখতে হবে। প্রগতির আলোকে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিতে হবে। আজকে যারা তরুণ আগামী দিনে তারা দেশেরে কর্ণধার- এ বোধশক্তি তাদের মনে জাগাতে হবে। বেকারত্ব দূর করতে হবে এবং সকল প্রকার অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে তরুণদের ব্যাপারে আলাদা যতœশীল হইতে হবে। এসব কাজে আমরা এগিয়ে যেতে পারলে সুস্থ ধারার একটি ন্যায্যতার মানবিক সমাজ বিনির্মান করতে পারবো বলে প্রত্যাশা করি।
অপরদিকে রাজনীতির ক্ষেত্রে অনাদর্শিক চর্চা, একদলীয় শাসন ব্যাবস্থায় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার অভাব, ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দলীয় সেচ্ছাচারিতা,শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য এবং সমাজ সেবার নামে আত্মস্বার্থ হাসিল- এসব নানামুখীন প্রতিকূলতায় আমাদের যুব সমাজ  বিপথগামী হচ্ছে। মূলধার পাঠ ও মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামে  ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে সাম্প্রদায়িক চিন্তা ও মৌলবাদের চাষবাস চলছে। গণতন্ত্রহীন একদলীয় শাসন ব্যাবস্থায় প্রগতিশীল লেখদের লিখা বই থেকে সরিয়ে শিক্ষাকে সাম্প্রদায়িক করা হচ্ছে। ফলে যুব সমাজকে প্রকারন্তরে  রাষ্ট্র নিজেই বখিয়ে দিচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার সাময়িক পতনের পর পুজিবাদী বিশে^র শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোতে আমরা হরহামেশাই একটি লিখা দেখতে পাই। সেটি হলো রাজনীতি ও ধুমপান মুক্ত ক্যাম্পাস,রাজনীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত ক্যাম্পাস। এই কথাগুলো দেখতে ভালো লাগলেও এটি যুব সমাজকে বিরাজনীতিকরনের নয়া ফরমুলা। যুব সমাজের মাঝে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট মহান ব্রত রাজনীতিকে নিন্দার পাত্র করা হয়েছে। রাজনীতি কোন নিন্দার পাত্র নয়,গভিরভাবে ভাবতে গেলে আমরা কেউ রাজনীতির বাইরে নই। যুব সমাজের মাঝে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আদর্শিক রাজনীতিতে উজ্জিবিত করতে সুশীল সমাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতিবিদসহ সচেতন মহলকে শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে এবং জাতির সার্বিক কল্যানে সেচ্ছাব্রতী যুব সমাজকে নিয়েই প্রগতির পথে হাটতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই আমাদের যুব সমাজ বর্তমানে একদিকে অবক্ষয়ের গভির তলদেশে আছে অন্যদিকে বিশ্বায়নের প্রযুক্তি যুগে সম্ভাবনার নবদ্বারের সামনে হাবুডুবু খাচ্ছে। এ অবক্ষয় থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে না পারলে যুব সমাজের হাত ধরেই রাষ্টীয় ক্ষমতাসহ জাতি নিশ্চিত অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। সুতরাং জাতীয় স্বার্থে,রাষ্ট্রের কল্যানে রাজনীতিবিদরেকেই শক্ত হাতে গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশ ঘটাতে হবে এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার মতাদর্শিক লড়াই জোরদারসহ আলোকিত ন্যায্যতার সামাজিক মালিকানার সমাজ গড়ার সংগ্রাম জারি রাখতে হবে।
[  মো.নজরুল ইসলাম- উন্নয়নকর্মী,সাংবাদিক ও গবেষক। যোযাযোগ: nozorali1985@gmail.com ]