রাজধানীতে প্রতারণা ও জালিয়াত চক্রের হোতা সহ ২ প্রতারক আটক

রাজধানীতে প্রতারণা ও জালিয়াত চক্রের হোতা সহ ২ প্রতারক আটক
ছবি: সংগৃহীত

ডেস্ক রিপোর্ট।। দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা কার্যক্রম চালিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী প্রতারক চক্র বর্তমানে তিতাস নদী ড্রেজিং, আড়িয়াল খাঁ নদী ড্রেজিং ও নদীর তীর রক্ষা বাধ প্রকল্প, ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশনের ড্রেনের সংস্কার কাজ, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি অফিস কনস্ট্রাকশনের কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণার পরিকল্পনা করছিল।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর পল্টন এলাকা থেকে প্রতারক চক্রের মূলহোতা মনসুর আহমেদ (৩৩), মো. মহসিন চৌধুরীকে (৫৫) গ্রেফতার করেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র‌্যাব-৩। অভিযানে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন দলিল ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট।

বুধবার (১৮ মে) সকালে কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) সূত্রে জানা যায়, প্রতারক ও জালিয়াতি চক্র বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ও পরিচয় ভাঙিয়ে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন এবং নির্মাণ প্রকল্পের কাজ অর্থের বিনিময়ে পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাসে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। প্রতারক ও জালিয়াতি চক্র প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) গোয়েন্দা পর্যালোচনার মাধ্যমে জানতে পারে। এরই প্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতাররা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। এই চক্রে ৫/৭ জন সদস্য রয়েছে। চক্রের মূলহোতা গ্রেফতার মুনসুর। চক্রটি গত প্রায় ৩-৪ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতারিত করে আসছিল। তারা প্রতারণার জন্য বিভিন্ন সময় নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করত।

প্রথমত তারা নতুন মোবাইল সিম কিনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে সেভ করত এবং নিজেরা ওই ব্যক্তি সেজে নিজেদের প্রতারণা চক্রের সদস্যদের মধ্যে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং করত। চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন মোবাইল নম্বর চক্রের মূলহোতা ও সহযোগীর মোবাইলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নাম ও ছবি দিয়ে সেভ করত।

পরবর্তীতে তারা সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে চ্যাটিং করে। এই চ্যাটিং কন্টেন্ট তারা এমনভাবে তৈরি করত যাতে যেকোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনে করে তারা ইতোপূর্বে অনেক কাজ অর্থের বিনিময়ে পাইয়ে দিয়েছে এবং তাদের বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খুবই সু-সম্পর্ক রয়েছে।

চক্রের একজন সদস্য তথাকথিত সাইফুল বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে। যে নিজেকে আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি পরিচয় দিত। সেখানে বসে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিত বলে গ্রেফতাররা জানায়।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য তারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের ছবি ওই সব আগ্রহী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেখাত। নিজেদের কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তারা হাজার হাজার কোটি টাকার ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাত।

তারা কোনো অফিসে মিটিংয়ের সময় বেশভূষা পরিবর্তন করে দামি গাড়ি ও বডিগার্ড নিয়ে নিজেদের উপস্থাপন করত। নিজেদের আরও বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করার জন্য তারা এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য ভ্রমণ করেছেন বলে বিভিন্ন ছবি প্রদর্শন করত।

কমান্ডার মঈন বলেন, তারা সরকারি কোনো চলমান প্রকল্পের কাজ পাওয়ার যোগ্য এমন সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করত। তাদের ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাত। বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য তাদের আগে থেকে নির্ধারিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ভাড়া করা অফিসে মিটিং করত। 

লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা কার্যক্রম চালিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী প্রতারক চক্রটি বর্তমানে তিতাস নদী ড্রেজিং, আড়িয়াল খাঁ নদী ড্রেজিং ও নদীর তীর রক্ষা বাধ প্রকল্প, ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনের সংস্কার কাজ, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি অফিস কনস্ট্রাকশনের কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণার পরিকল্পনা করছিল বলে গ্রেফতাররা জানায়।

গ্রেফতার মনসুর প্রথমে স্থানীয় এলাকায় জমির দালালি করত। পরবর্তীতে সে ঢাকায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। সেখানে কর্মরত থাকাকালীন এভাবে প্রতারণার বিষয়টি তার মাথায় আসে। পরবর্তীতে ওই এজেন্সির এক কর্মচারীর মাধ্যমে সাইফুলের সঙ্গে পরিচয় হলে সে প্রতারণার জন্য এই চক্রটি গড়ে তোলে।

গ্রেফতার মহসিন প্রথমে রাজধানীর মালিবাগে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির ব্যবসা করত। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তার ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে দেয়। এরপর মতিঝিলে মনসুরের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়।