রংপুরে সীমিত পরিসরে বর্ষবরণের প্রস্তুতি

রংপুরে সীমিত পরিসরে বর্ষবরণের প্রস্তুতি

তৌহিদুল ইসলাম, নিউজ করেসপনডেন্ট।। রংপুরে করোনা মহামারির কারণে বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ বরণে গেল দুই বছর চোখে পড়ার মতো কোনো আয়োজন ছিল না। এবার করোনার সংক্রমণ কমতে থাকায় চলছে বাংলা বর্ষবরণ প্রস্তুতি। মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে সীমিত পরিসরে থাকছে নানা আয়োজন। তবে এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হবে।

বুধবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলে মাঠে গিয়ে দেখা যায় বর্ষবরণের প্রস্তুতি সারতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিক্ষার্থীসহ জেলা প্রশাসনের আয়োজকরা। জিলা স্কুল মাঠের ঐহিত্যবাহী বৈশাখী বটতলা চত্বরে রঙের পরসা নিয়ে আঁকাআঁকিতে ব্যস্ত সবাই। কেউ ব্যস্ত হাঁড়ির গায়ে রংতুলির আঁচড়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ফুটিয়ে তুলতে, কেউবা ব্যস্ত সড়কের বুঁকে নানা রঙে রাঙানো আলপনা আঁকতে। একঝাঁক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিভাবকদেরও দেখা গেছে বাংলা নববর্ষ বরণের কর্মযজ্ঞে। স্কুলের দেয়ালে থাকা হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, প্রজাপতি, পাখি, ফুলসহ বাহারি নকশায় ফুটে উঠেছে বৈশাখী বটতলা চত্বর। সকাল গড়িয়ে বিকেল হলেও তখন শেষ হয়নি আঁকাআঁকি আর হাঁড়িসজ্জার কাজ। খুদে এসব চারুশিল্পীর কেউ ব্যস্ত পাখি-ফুল আঁকতে। আবার কেউ গভীর মনোযোগ দিয়ে করে চলেছে একের পর এক নকশা। শোভাযাত্রার জন্য বাঁশ ও কাঠ দিয়ে ময়ূর, হাতি ছাড়াও কাগজের ফুল, প্যাঁচা, পাখপাখালি তৈরি করছেন শিক্ষার্থীরা। বটতলায় মঞ্চ তৈরি করার পাশাপাশি মাঠের এক কোণে দিনব্যাপী মেলার জন্য স্টল তৈরির কাজও করতে দেখা গেছে।

চারুশিল্পী তুরিন বলেন, শুধু করোনার কারণে আমরা দুই বছর পয়লা বৈশাখ উদযাপন করতে পারিনি। এবার পরিস্থিতি ভালো কিন্তু মাহে রমজান হওয়ায় সীমিত আয়োজন থাকছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি স্বল্পপরিসরে হলেও বৈশাখের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে।

জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী অর্ণব জানান, বৈশাখ মানেই একটা অন্য রকম অনুভূতি। পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, হা-ডু-ডু, লাঠিখেলাসহ নানা আয়োজন দেখে আমরা অভ্যস্ত। এদিনটি আমাদের বাঙালির প্রাণের উৎসব। দুই বছর উৎসব আয়োজন হয়নি। এবার সীমিত পরিসরে হচ্ছে। আমাদের খুব ভালো লাগছে, আমরা সবাই মিলে আলপনা করছি।

রংপুর জিলা স্কুল মাঠে বাংলা বর্ষবরণের ব্যস্ততা দেখা গেলেও সুনসান নীরবতা দেখে গেছে সংস্কৃতি পল্লিখ্যাত টাউন হল চত্বরে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি, টাউন হল অডিটরিয়াম, পাবলিক লাইব্রেরিসহ চত্বরে থাকা নাট্য ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোয় তেমন কোনো প্রস্তুতি দেখা যায়নি। এর আগের বছরগুলোয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক, রবীন্দ্র পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে চৈত্র-সংক্রান্তিতে সকাল থেকে নানা আয়োজনে টাউন হল চত্বর মুখরিত থাকলেও এবার কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
 
মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে এবার সীমিত পরিসরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা না হলেও এবার পয়লা বৈশাখে থাকছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও লোকজ মেলাসহ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পয়লা বৈশাখে সকাল ১০টায় টাউন হল চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হবে। এটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জিলা স্কুল মাঠের বৈশাখী বটতলায় গিয়ে শেষ হবে। সেখানে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লোকজ মেলায় থাকবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

দুপুরে জিলা মাঠে বৈশাখ বরণের প্রস্তুতিমূলক কাজ দেখতে আসেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এ ডব্লিউ এম রায়হান শাহ। ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, বাঙালির সর্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ বরণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি চলছে। এবার মাহে রমজান সামনে রেখে আয়োজনের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। সকালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শেষে জিলা স্কুল মাঠে দিনব্যাপী লোকজ মেলার উদ্বোধন করা হবে। এ ছাড়া সুবিধাজনক সময়ে কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার এবং ইফতার আয়োজন করা হবে।

এদিকে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, করমাইকেল কলেজ, রংপুর সরকারি কলেজ, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ষবরণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রেও রয়েছে দিনব্যাপী বর্ষবরণ ঘিরে সাংস্কৃতিক ও আড্ডা-আলোচনা ভিত্তিক পরিবেশনা। রংপুরের বেশ কিছু সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনও পয়লা বৈশাখ উদযাপনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।