রামুতে এসিড সন্ত্রাসের শিকার তৈয়বার যন্ত্রণা ও বিয়ে নিয়ে অনিশ্চয়তা! 

রামুতে এসিড সন্ত্রাসের শিকার তৈয়বার যন্ত্রণা ও বিয়ে নিয়ে অনিশ্চয়তা! 
ছবিঃ সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার, ৯ জুলাই ।। একদিকে এসিড সন্ত্রাসে মুখ ও চোখ ঝলসে যাওয়ার যন্ত্রণা, অপর দিকে বিয়ে নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে হতভাগিনী তৈয়বার। 

আজ শুক্রবার (৯ জুলাই) তাঁর বিয়ের দিন ধার্য ছিল। বিয়ের তিনদিন আগে মঙ্গলবার ভোরে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন তৈয়বা। এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। 
এখন কী হবে তৈয়বার? বউ সেজে যেতে পারবে শ্বশুরবাড়ি? এসিড দগ্ধ তৈয়বাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেবে শ্বশুরবাড়ির লোকজন? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে উভয় পরিবারে।
কক্সবাজারের রামুতে এসিড সন্ত্রাসের শিকার তরুণী তৈয়বা বেগমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ডান চোখ ও মুখের একপাশ ঝলসে গেছে। তাঁর চোখের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা পরীক্ষার পর জানা যাবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক এস খালেদ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, ‘তৈয়বা বেগমের ডান চোখ ও মুখের একপাশ ঝলসে গেছে। আমরা তাঁর মুখের অংশের চিকিৎসা দিচ্ছি। আর তাঁর চোখ দেখার জন্য চক্ষু বিভাগের চিকিৎসকদের ডাকা হয়েছে। চোখের ক্ষতির বিষয়টি তাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলতে পারবেন।’
রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের মাঝিরকাটা গ্রামের মোজাফফর আহমদের মেয়ে তৈয়বা বেগম (২০)। একই ইউনিয়নের শাহ মোহাম্মদ পাড়ার নুরুল আজিমের সঙ্গে শুক্রবার (৯ জুলাই) তৈয়বার বিয়ের দিন ধার্য ছিল। গত মঙ্গলবার ভোররাতে (৬ জুলাই) রাতে তাঁকে এসিড ছুড়ে মারে পাশ্ববর্তী দুর্বৃত্তরা।
গত মঙ্গলবার সকালে তৈয়বা বেগমকে প্রথমে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তৈয়বাকে গত বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আনা হয়।
এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে রামু থানায় মামলা করেন তৈয়বার বাবা মোজাফফর আহমদ। এসিড অপরাধ দমন আইনের এই মামলায় মাঝিরকাটা গ্রামের নুরুল আবছার ভুট্টো ও তাঁর ভাই ফরিদ আলমকে আসামি করা হয়েছে। 
গত মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে নুরুল আবছার ভুট্টোকে (৩২) গ্রেপ্তার করেছে রামু থানা পুলিশ । তাঁকে বুধবার কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। অপর আসামি ফরিদ আলমকে ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন রামু থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি আনোয়ারুল হোসেন । 
মামলার এজাহারে বলা হয়, সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে মাকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের বাইরে শৌচাগারে যান তৈয়বা বেগম। এ সময় পুর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রতিবেশী নুরুল আবছার ভুট্টো ও তাঁর ভাই ফরিদ আলম মিলে তৈয়বার মুখে এসিড ছুড়ে মারেন। তৈয়বার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে নুরুল আবছার ও ফরিদ পালিয়ে যান। তৈয়বার বাবা মোজাফফর আহমদ বলেন, আসামিরা
পরিকল্পিতভাবে তাঁর মেয়েকে বিয়ের তিনদিন আগে এসিড ছুড়ে মেরেছেন। 
তৈয়বার বাবা মোজাফফর আহমদ আরও বলেন, ‘আমার মেয়ের হবু শ্বশুর মমতাজ আহমদ তার পরিবার নিয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে মেয়েকে দেখতে আসছিলেন। সেই সময় মেয়েকে চট্টগ্রাম মেডিক‌্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে। দেখা না হলেও নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন তারা।  
বিয়ের দিন ধার্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তৈয়বার চিকিৎসা চলছে। এই অবস্থায় বিয়ের কথাবার্তা কিছুই মাথায় ঢুকছে না। শুক্রবার বিয়ের দিন ধার্য থাকলেও মেয়ে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে হবে না। তবে মেয়ে সুস্থ হলে বিয়ে হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারা।’ 
তৈয়বার হবু শ্বাশুড়ি খুরশিদা বেগম বলেন, ‘খুব শখ করে ছেলের বউ হিসেবে তৈয়বাকে ঘরে তুলতে চেয়েছি। কিন্তু দুষ্কৃতকারীরা এভাবে তাকে এসিডদগ্ধ করবে কখনো ভাবিওনি। আমি ছেলের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। খুব চিন্তায় আছি আমরা।’ 
খুরশিদা আরও বলেন, ‘নিয়মিত তৈয়বার খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। তার পরিবারের সাথে কথা হচ্ছে আমাদের। তৈয়বা যতদিন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে না, ততদিন আমার ছেলেকে বিয়ে করাব না। যেদিন তৈয়বা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে সেদিন আমরা তার বাড়িতে গিয়ে তাকে দেখব। চেহারা বিকৃত হয়ে গেলে বা চোখ নষ্ট হয়ে গেলে তাকে ছেলের বউ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। যদি তার পরিবার তাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়, তাহলে আমরা সহযোগিতা করব।’