শ্রেণী সংগ্রামের  বিপ্লবী  সৈনিক কমরেড কিসমত আলী মুন্সি

শ্রেণী সংগ্রামের  বিপ্লবী  সৈনিক কমরেড কিসমত আলী মুন্সি
ছবিঃ সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ থেকে মো.নজরুল ইসলাম।। ৩১ আগস্ট, মংগলবার।। মণিষীদের বাণী থেকে জানা যায়- পানিতে শরীর ভিজালে কাপড় বদলাতে হয়,ঘামে শরীর ভিজলে ভাগ্য বদলায়. আন্দোলন সংগ্রামে রক্তে শরীর ভিজলে বিপ্লবী ইতিহাস সৃষ্টি হয় এবং সমাজেরও পরিবর্তন ঘটে।এমন মানুষের সংখ্যা সমাজে খুবই কম। বেশিরভাগ মানুষ যখন নিজেকে নিয়েই ব্যাস্ত থাকে তারপরও কিছু মানুষ নিজের খেয়ে বনের মহিষ তারানোর মতো নিবেদিতভাবে সমাজের আমুল পরিবর্তনের জন্যে অনবরত ঘাম ও রক্ত ঝড়িয়ে কাজ করতে থাকে।

এমনই একজন মানবহিতৈষী অগ্নিযুগে বিপ্লবের মহান সৈনিক বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড কিসমত আলী মুন্সি। জীবিতকালে আমি তার সান্নিধ্য পাইনি এটি আমার দূর্ভাগ্য ছারা আর কি তবে মৃত্যুদিনে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে মানিকগঞ্জের গণমানুষের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. আজাহারুল ইসলাম আরজু সাহের সাথে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো এবং পারিল মাঠে সকল দল মত জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে রাজনৈতি সামাজিক ও সুশীল সমাজের প্রায়  হাজার খানেক মানুষের বিশাল জানাযায় আমিও আপ্লুত ছিলাম। ঐদিন ছবিও তুলেছিলাম এবং কমরেড আরজু সাহেবও আমাকে একটি ছবি দিয়ে তার সমন্ধে কিছু লিখার অনুরোধ করেছিলো।

সময়মতো কাজটি না করাতে আগের ছবিগুলো হারিয়ে যায়। এই ভুলের কারনে কমরেড আরজু স্যার এর কাছে ছবি ও তথ্য চাইতে সাহস পাইনি বলে এ অঞ্চলের আরেকজন কমরেড লুৎফর রহমান ইলিচ ভাইয়ের সহযোগীতা চাইলেও সেটি সময়মতো না পাওয়াতে অনেক দেরি হয়েই গেলো। যাহোক যত প্রতিকূলতাই থাকুক না কেন আসলে এতদিনেও একটি ডকুমেন্টস করতে না পারার জন্য আমি অপরাধী। 
বিপ্লবীদের কথা ও ইউটিউবে রাজনীতির পাঠশালা ডকুমেন্টস দেখে হঠাৎ আবার মনে হলো এখনই কমরেড কিসমত ভাইকে নিয়ে একটি লিখা তৈরী করবো। আমাকেই যেতে হবে তাই ইলিচ ভাইকে সাথে নিয়েই যাই। সেই লক্ষ্যেই  গত আগষ্ট ২০২১ দুপুর ১.০০-৩.৩০মি.পর্যন্ত মানিকগঞ্জ সিংগাইর অঞ্চলের বলধারা ইউনিয়নের খৈয়ামুরি গ্রামে প্রয়াত কমরেড কিসমত মুন্সির বাড়ীতে আসলাম। তার স্ত্রী প্যারলাইসের রুগি হলেও এখনো বেশ কথা বলতে পারে। কমিউনিস্ট পার্টির পরিচয় দিলে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। যুদ্ধদিনের কথা ও বিপ্লবী আন্দোলন সংগ্রামের গল্প বলতে শুরু করলেন। দুপুর সময় আপ্যায়ন না করে আসতে দিলেন না। তারপর তার বড় ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা বরকত আলী (ইয়াদ আলী মুন্সি) বাড়ীতে আসলো এবং তার সাথে সাক্ষাতকার গ্রহন করলাম।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড ইয়াদ আলী মুন্সি আবেগ আপ্লুত মনে তার বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন- আমার বাবা একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা নিয়ে বৃটিশ পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক শ্রমিক নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড কিসমত আলী মুন্সি। তিনি ০৯ মে ১৯৩৭ সালে মানিকগঞ্জ সিংগাইর অঞ্চলের পারিল খৈয়ামুড়ী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা আমার বাবার জীবনে রয়েছে অনেক প্রতিকূলতা। কৃষিভিত্তিক পরিবার থেকে শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে শিক্ষা জীবনে সে হাই স্কুলের বারান্দায় পা রাখতে পারেনি। তিনি পরিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। তিনি বেশ বড় হয়ে স্কুলে যান এবং ৪র্থ শ্রেণীতে পড়লেও আকারে বেশ বড় ছিলো। চট্রগ্রাম বন্দরে আমাদের এলাকার কয়েকজন চাকরি করতেন। তারা আমার বাবাকে বেশ পছন্দ করতেন এবং বাবার আগ্রহ অনুযায়ী তাকে চট্রগ্রাম বন্দরে চাকরি দেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই বেশ প্রতিবাদী ও স্পষ্টবাদি ছিলেন। চট্রগ্রাম বন্দরে শ্রমিকরা বেতন ভাতা খাবারে মানসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। তিনি এগুলো সহ্য করতেন না,সুযোগ পেলেই প্রতিবাদ করতেন। তিনি হাতের কাছে কাগজ পেলেই পড়তেন। বন্দরে শ্রমিকদের মধ্যে মাঝে মাঝে লাল পতাকা নিয়ে কে যেন আসতো এবং বিভিন্ন দাবিনামার রিপলেট দিত। এই কাগজ আমার বাবার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি এটি ভালো করে রপ্ত করেন। কাগজের মালিককে খুজতে তিনি অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে আবিস্কার করেন। মুলত তার বাম ধারর শ্রমিক তথা কমিউনিস্ট আন্দালনে তার জীবনে বিপ্লবী বিনোদ বিহারী বেশ প্রভাব বিস্তার করেন। তারপর তিনি গাটসাটভাবেই চট্রগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনে জরিয়ে পড়েন। তিনি চট্রগ্রাম বন্দর ট্রেড ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক ও চট্রগ্রাম জেলা শ্রমিক আন্দোলনের সদস্য ছিলেন।

চট্রগ্রাম বন্দরে একটানা ৪৫ বছর চাকরি করেন তিনি। বন্দর এলাকার মানুষের হৃদয়ের সাথে মিশে আছে কমরেড কিসমত মুন্সি। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে জেল জুলুম,হামলা,মামলার শিকার হইতে হয়েছে বহুতবার। তিনি প্রায় দশ হাজার শ্রমিকের নেতৃত্ব দিতেন। কমিউনিস্ট বামপন্তিদের ডাকে যে কোন হরতাল,অবরোধ,ধর্ণাসহ যেন কোন আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতেন না। তিনি চট্রগ্রাম বন্দর শ্রমিক কলোনি থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করে বিরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। 
চট্রগ্রাম অঞ্চলের ন্যাপ কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহীনির যুদ্ধকালীন কমান্ডার বর্তমান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড মো.শাহ আলম বলেন- কমরেড কিসমত মুন্সি চট্রগ্রাম বন্দর শ্রমিক ইউনিনের নির্বাচিত সিবিএ নেতা ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। তিনি অন্যয়ের কাছে আপোষ করতে না এবং সময়ের সাহসী নেতা ছিলেন। তার সমসায়ীক বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন কমরেড আহছানউল্লা চৌধুরী, কমরেড আবুল কালাম,কমরেড নজরুল ইসলাম, কমরেড মান্নান সিকদার ও কমরেড কিসমত মুন্সি প্রমুখ। সেই পাকিস্তান আমলের স্বৈরাচারি আয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে তার সাথে আমার পরিচয়। মৃত্যুর আগদিন পর্যন্ত তার সাতে বেশ যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক ছিলো। কিসমত ভাই বেশ পরহেজগার মানুষ ছিলেন। স্বৈরাচারি আয়ুবের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিনে ১৯ জন বন্দর শ্রমিক তার মধ্যে কিসমত ভাই অন্যতম।এই আন্দোলনে জুট মিলের শ্রমিক নেতা আবুল বাশারকে গ্রেফতার করলে বন্দর শ্রমিক নেতারা আন্দোলন করেন এবং তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। তিনি বন্দর শ্রমিকদের নেতৃত্বেই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ থেকেই সাগরে যুদ্ধ জাহাজ আসতে থাকে।তারা আগেই জানতো যে যুদ্ধ অনিবার্য্য। পাকিস্তানি জাহাজ সোয়াত যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসলে বন্দর শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং যুদ্ধ জাহাজ সোয়াত পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে না পারায় তারা পেছনের দিকে যেতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেম ক্ষেতমজুর সমিতির জেলা কমিটির সাবেক সাধারন সম্পাদক কমরেড অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন-   কমরেড কিসমত মুন্সি আজীবন বিপ্লবী ছিলেন। দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন সংগ্রাম করে আবার গ্রামের বাড়ি সিংগাইর খৈয়ামুরিতে ্এসেও চারিদিকে অন্যায় অনাচার ও শোষন বঞ্চনায় বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য তাকে ঘরে থাকতে দেয়নি। হাতে লাল পতাকা ও লাঠি নিয়ে তিনি বেরিয়ে পরেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। ডিসি এস পি সরকরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কাউকে  তিনি ছার দেননি। আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি কৃষক সমিতির ব্যানারে বেশ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। 
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক সাধারন সম্পাদক কমরেড মিজানুর রহমান হযরত বলেন- স্থানীয় আন্দোলনের মধ্যে মানিকগঞ্জের একটি বড় ইতিহাস হলো নয়াকান্দি বাধ কাটার আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি ও তার সকল গণসংগঠন সমুহ। আমরা সময় ও শ্রম দিলেও কৃষক সমিতির নেতা কমরেড কিসমত মুন্সির অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করি। কারন তিনি বলধারা,মাটিকাটা,খৈয়ামুরি,চারিগ্রাম থেকে শত শত কৃষক ক্ষেতমজুরদের নিয়ে লাল পতাকা মিছিল নিয়ে আসতেন। নিজের জমি বিক্রি করে  কর্মীদের খাওয়াতেন ও খরচ চালাতেন। বড় সমাবেশেগুলোতে সবচেয়ে তার জমায়েতই ছিলো লক্ষনীয়। নয়াকান্দির বাধ কাটার আন্দোলনের বড় সমাবেশে কৃষক ক্ষেতমজুরগন লাঠি,কোদাল,খুন্তি,কাতরাসহ অসংখ্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা বাধ কাটার কাজ শুরু করেন। তৎতকালীন মেয়র মো. রমজান আলী ভায়ে পালাতক ছিলেন এবং তাকে পুলিশী হেপাজনে রাখা হয়।
বাংলাদেরর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আজাহারুল ইসলাম আরজু বলেন ১৯৮৬ সালে তৎতকালীন ডিসি এসপি ও ক্ষমতসীন দলের নেতারা ছারাও আওয়ামীলী ও জাসদের নেতারা এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন। এই আন্দোলনে সরকার দাবি মেনে নিলেও বিক্ষব্ধ জনতার রোশে দুইজন সরকারি কর্মকর্তা মৃত্যুবরন করেন। গণদাবির এই আন্দোলনে অনেক মানুষ আহত হন এবং স্বতস্ফুর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। আন্দালনের ফসল নয়াকান্দি বাঁধ কেটেই জনতা ঘরে ফিরে। পরবর্তীতে সরকারিভাবে এটি খনন করা হয় সেটি এখনো  বান্দুটিয়া সুইস গেইট হয়ে শহর খাল নামে বেতিলা সোনাকান্দি সুইস গেইট হয়ে নয়াকান্দি লোহার ব্রিজ দিয়ে খালটি পুনরায় বেউথা কালিগঙ্গা নদীতে মিলিত হয়েছে।
আমাদের প্রিয় প্রখ্যাাত শ্রমিক ও কৃষক নেতা জনদরদী কমরেড কিসমত মুন্সি সারাজীবন লড়াই সংগ্রাম করেছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে,শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে,অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে, লড়েছেন গরিবী ও সাধারন মানুষের জীবনের গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষে, শোষণহীন নতুন সমাজ বির্নিমানের প্রত্যাশায়। তিনি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনজোটের রুপরেখার ডাকে সংসদ অভিমুখীন মিছিলে কাস্তে,কোদাল,লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে নিয়ে সবার সামনে ছিলেন। এ মিছিলে মাননীয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রি বেগম খালেদা জিয়াসহ জোটের জাতীয় নেতাকর্মীরা অংশগ্রহন করেছিলেন। কমরেড কিসমত মুন্সি মেহনতি মানুষের হয়ে কথা বলার জন্য জাতীয় সংসদে লাল পতাকা নিয়ে প্রবেশের জন্য সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হলেও ইতিহাসে একটি দাগ রেখে যান।

অর্থ বিত্ত ক্ষমতা,লোভ ও মৌহ কোন কিছুই কখনও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল। জীবনের শেষ প্রান্তে দাড়িয়েও তিনি শ্লোগান ধরতেন। ” কেউ খাবে তো কেউ খাবে না তা হবে না তা হবে না। কেউ থাকবে গাছ তলায় কেউ থাকবে তেতলায় তা হবে না- তা হবে না। তিনি যে সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন । জনতার সেই বিজয় একদিন হবেই হবে।