সুনামগঞ্জে বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে

সুনামগঞ্জে বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে
ছবি: সংগৃহীত

সিলেট অফিসঃ সুনামগঞ্জে বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের উজানে মেঘালয়-চেরাপুঞ্জিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সুনামগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের পানির উচ্চতা সুনামগঞ্জ শহরের সবচাইতে উঁচু স্থানকে ডুবিয়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থল পৌর বিপণিতেও পানি ওঠেছে।

পৌর বিপণির দোকান মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বললেন, ২০০৪ সালেও একদিনে এতো পানি আসতে দেখি নি। গত ২০ বছরে এমন ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখেন নি সুনামগঞ্জের মানুষ।
শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা মোনাজ্জির আলী মামুন বললেন, শত বছরের বাসিন্দা আমরা, ঘরে হাঁটু সমান পানি এর আগে কখনো হয় নি। আমাদের বাড়িতে পানি ওঠলে, শহরের অনেক বাড়িতেই কোমর থেকে হাঁটু সমান পানি হবার কথা।
এই মহল্লার আলিমাবাগ মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা ওসমান গণি জানালেন, মসজিদের নীচের তলায় হাঁটু সমান পানি, আছরের নামাজ দু’তলায় আদায় করেছেন মুসুল্লিরা।
শহরের তেঘরিয়ার বাসিন্দা সেলিম আহমদ বললেন, আমার বসতঘরে এর আগে কোন বন্যায় পানি ওঠেনি, এবার পানি ওঠেছে। পশ্চিম তেঘরিয়া বা বড়পাড়ার অনেক বসতঘরে বুক সমান পানি হয়েছে। সড়কে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শহরেই হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সদস্য সচিব জুয়েল আহমদ বলেছেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ সারাদেশের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই সড়কের গোবিন্দগঞ্জ নতুনবাজার থেকে লামাকাজি জাঙ্গাইল পর্যন্ত ডুবে গেছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
ছাতক প্রেসক্লাবের সভাপতি হারুনুর রশিদ জানিয়েছেন, ছাতকের মানুষ এর আগে এমন ভয়াবহন বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নি।
সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা নদী তীরবর্তী সকল এলাকার ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ওঠেছে। শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীক এলাকাগুলোতে পানি ওঠায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে।

সারাদেশের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার নবীনগর, ষোলঘর, উকিলপাড়া, জেলরোড, জগন্নাথবাড়ি, মধ্যবাজার ও পশ্চিমবাজার এলাকার বাড়িঘর ও দোকানপাঠে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। শহরের পূর্ব-পশ্চিম নতুনপাড়া, বড়পাড়া, তেঘরিয়া, বাঁধনপাড়া, শান্তিবাগ, আরপিননগর, কালীপুরসহ বর্ধিত এলাকায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ২০২০ সালের বড় বন্যার সময় পানির উচ্চতা ছিল বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপরে। বৃহস্পতিবার সেটি অতিক্রম করেছে। বিপদসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে সুরমার পানি। মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতেও গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ ৬৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সুনামগঞ্জে হয়েছে ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেছেন, আগামী ১০ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেখা গেছে, একইভাবে চারদিন বৃষ্টি হবে। এ কারণে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতিও হতে পারে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা অতিতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বন্যা তথ্য কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ছাতকে ১৭ টি, দোয়ারাবাজারে ১৬ টি এবং সুনামগঞ্জ সদরে ১০ টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যা দুর্গদের মধ্যে বাড়িঘরে থাকার অনুপযোগী সকলকেই আশ্রয়কেন্দ্রে আনা, শুকনো খাবারসহ সাময়িক খাদ্য সহায়তা দিয়ে সহায়তায় করবে প্রশাসন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকলের সহযোগিতা চাইলেন তিনি।