সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ কোথায়? 

সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ কোথায়? 
ছবিঃ সংগৃহীত

জাতির বিবেক সাংবাদিক সমাজ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত হচ্ছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর কিংবা মফস্বল সর্বত্রই চলছে সাংবাদিক নির্যাতন। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা বা সদস্য সবার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে তুলে নিয়ে নির্যাতন থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষে মারধরের শিকার হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। কিন্তু দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা আর নির্যাতন-নিপীড়নের বিচার নেই। হত্যা ও নির্যাতনের অগুনতি মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে, বিচারের কোনো অগ্রগতি নেই। বিচার না করায় দেশে এখন সাংবাদিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভয়ভীতি, হুমকি-ধামকি, মামলা-মোকদ্দমা, মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনে জখম থেকে শুরু করে গুম কিংবা খুন নির্যাতনের এমন কোনো ধরন নেই যার শিকার হচ্ছেন না সাংবাদিকরা। অথচ এসব সাংবাদিকরাই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাথে উৎপোতভাবে জড়িত। যাদের লেখনির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা জনসম্মুখে ফুটে উঠে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার ৯ বছর পার হলেও এখনও হত্যারহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। ৯ বছরে আদালত থেকে ৭৮ বার সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। আদৌ বিচার পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয়! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারামুক্তির দিন ক্যামেরার প্রথম ক্লিকটি যে করতে পেরেছিলো সেই ফটো সাংবাদিকের নাম শফিকুল ইসলাম কাজল। আর সেই সাংবাদিক কাজলের চোখ, মুখ বাঁধা অবস্থায় নিখোজ ছিলো ৫৩ দিন। খোঁজ পাওয়ার পর কারাগারে ছিলেন সাত মাস। সর্বশেষ নির্যাতনের শিকার প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম। প্রকাশ্য দিবালোকে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি এখন কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। অথচ তার নির্যাতন ও কারাবরণ নিয়ে সারাদেশের সাংবাদিকরা আজ ফুসে উঠেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল এলাকার সাংবাদিকরা আজ রোজিনা নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। গত মার্চ মাসে বায়তুল মোকাররম এলাকায় বিক্ষোভ-সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তোলার সময় হেফাজতের হামলায় বিভিন্ন সাংবাদিকরা মারাত্মক মারধরের শিকার হন। বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার সময় অস্ত্রধারী চার ব্যক্তির ছবি তোলায় ফটো সাংবাদিক রুবেল রশীদকে লোহার রড দিয়ে পিটাতে থাকলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। একই সঙ্গে তার মূল্যবান ক্যামেরা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। একই দিন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের ফটোসাংবাদিক প্রবীর দাস ও এমরান হোসেন, প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক হাসান রাজা, বাংলাদেশ প্রতিদিনের ফটোসাংবাদিক জয়িতা রায়, বিডিনিউজ২৪-এর ফটোসাংবাদিক মাহমুদ জামান অভি, সারাবাংলার ফটোসাংবাদিক হাবিবুর রহমান, ৭১ টিভির সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমন, বাংলাভিশনের স্টাফ রিপোর্টার দীপন দেওয়ান মারাত্বক ভাবে আহত হন। এভাবে গত দেড় দশকে বাংলাদেশে সাংবাদিক নিহত হয়েছেন ২৩ জন। এর মধ্যে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে নিহতের সংখ্যা ১৪ জন, আহত হয়েছেন ৫৬১ জন সাংবাদিক। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে নয় বছরে খুন হন নয়জন সাংবাদিক। আর নির্যাতনের কথা তো বাদই দিলাম। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসবে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের প্রতিবাদে গত কয়দিনে রাজধানীসহ সারা দেশে যেসব বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে সেখানেও এমন মারাত্মক হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। এর আগে পঁচিশে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোদির আগমনবিরোধী বিক্ষোভে ছাত্রলীগের কয়েক দফা হামলায় আহত হন তিন সাংবাদিকসহ অন্তত ১৬ শিক্ষার্থী-বিক্ষোভকারী। সাংবাদিকরা দেশের সব ধরনের দুর্যোগ-সংকটে সামনের সারিতে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। তা সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমবেশ যাই হোক এটাই পেশাগত দায়িত্ব সাংবাদিকের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দায়িত্বপালনকালেই সাংবাদিকরা মারাত্মক হামলার শিকার হচ্ছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্বপালনের কারণেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা করা হচ্ছে সাংবাদিকদের। এমন হামলা যেমন আলোকচিত্র সাংবাদিকদের ওপর হচ্ছে তেমনি প্রতিবেদকদের ওপরও হচ্ছে। সা¤প্রতিক অন্যান্য ঘটনাতেও দেখা গেছে, এমন সংঘাত-সংঘর্ষের সময় সাংবাদিকরা যেমন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছেন, তেমনি অস্ত্রশস্ত্র-লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ বা সমাবেশে হামলাকারী রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদেরও টার্গেট হচ্ছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাংবাদিকদের কোনো সুরক্ষা দিচ্ছে না, উপরন্তু নিজেরাও চড়াও হচ্ছে। পেশাগত দায়িত্বপালনকালে এমন হামলায় সাংবাদিকরা প্রাণও হারাচ্ছেন। স¤প্রতি নোয়াখালীর বসুরহাটে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং তার প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের অপর একটি গ্রæপের কর্মসূচিতে দুই পক্ষের সমর্থকদের সংঘর্ষের ভিডিও ধারণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারের নোয়াখালী প্রতিনিধি বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার চার দিন নিখোঁজ থাকার পর আহত অবস্থায় ছাড়া পেয়েও আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিলেন ‘আমি আর নিউজ করব না, আমাকে মারবেন না প্লিজ।’ সা¤প্রতিক এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে অন্তত ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাÐের শিকার হয়েছেন। একদিকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নানারকম ভয়ভীতি-হুমকির কারণে সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হয়ে উঠছে; আরেক দিকে, শারীরিকভাবে হামলা ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। এসব হামলা-নির্যাতন সাংবাদিকতা পেশাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং তথ্যপ্রকাশে বাধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও খর্ব করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিক নির্যাতন ও সাংবাদিক হত্যার যথাযথ বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই দেশের গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে এখনই সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

শফিক আহমদ শফি

লেখক- ব্যুরো প্রধান, দি নিউনেশন ও দৈনিক আজকালের খবর, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ লেখক-সাংবাদিক ইউনিয়ন।