সিলেটে ইউপি নির্বাচনে ধরাশায়ী আওয়ামীলীগ  ফুরফুরে মেজাজে বিএনপি

সিলেটে ইউপি নির্বাচনে ধরাশায়ী আওয়ামীলীগ  ফুরফুরে মেজাজে বিএনপি

সিলেট অফিস: সিলেটের ইউনিয়ন নির্বাচনে পূর্ণ শক্তি নিয়ে স্বোচ্ছার আওয়ামী লীগ। তারপরও জেলার ৩ উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন নির্বাচনের ফলাফলে ধরাশায়ী আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা। ক্ষমতার পূর্ণ প্রভাব খাটিয়েও ভাল ফলাফল দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে, ভোটে না থেকেও স্বতন্ত্রের ব্যানারে চমক  দেখিয়েছে বিএনপি। খুব কম ইউনিয়নেই বিএনপির নেতারা ইউপি নির্বাচনে লড়াই করেছেন। এরপরও একক লড়াইয়ে চমক দেখিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এছাড়া- ফলাফলে ভাগ বসিয়েছে জামায়াত ও খেলাফত মজলিসও। একমাত্র দল হিসেবে দলের নেতারা এই নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই, প্রচারণা এবং ভোটে সবাই মাঠে ছিলেন একাট্টা। কিন্তুনির্বাচনের ফলাফলে বিস্তর ফাঁরাক। এমন পরিস্থিতি ভাবাচ্ছে সিলেটের আওয়ামী লীগকে। এ কারণে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনে আরো বেশি সতর্ক হচ্ছেন নেতারা। 
গত বৃহস্পতিবার সিলেটের ১৫ ইউনিয়নের নির্বাচন ছিল উৎসবমুখোর। এই নির্বাচনে ছিল না কোনো প্রভাব বিস্তার কিংবা পেশিশক্তির আধিপত্যও। নিরপেক্ষ ভুমিকায় ছিল সিলেটের প্রশাসনও। বিতর্কমুক্ত এই নির্বাচনের ফলাফলে খুশি হতে পারেনি আওয়ামী লীগ নেতারা। কাগুজে-কলমের হিসেবে আওয়ামী লীগ জয়ে এগিয়ে থাকলেও এতো প্রস্তুতি থাকার পরও এই জয় নেতাকর্মীদের ভাবাচ্ছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে; ১৫ ইউনিয়ন নির্বাচনে সরাসরি মার্কা নিয়ে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগের ৬ প্রার্থী। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী দুইজন জয়ী হয়েছেন। বিদ্রোহীসহ জয় ৮টি ইউনিয়নে। আর ঘোষণা দিয়ে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাঠে ছিল না বিএনপি। বিএনপির পদবিধারী নেতাদেরও নির্বাচনের ধারে-কাছেও দেখা যায়নি। এই অবস্থায় মাঠ পর্যায়ে একক লড়াই করে জয়ী হয়েছেন বিএনপির ৫ নেতা। তারা স্বতন্ত্র ব্যানারে নির্বাচন করেছেন।

এছাড়া, দুটি ইউনিয়নে জয়ের ভাগিদার হয়েছেন জামায়াত ও খেলাফত মজলিসও। জামায়াত নেতা স্বতন্ত্র ব্যানারে প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করলেও খেলাফত মজলিস নেতা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। ফলে আওয়ামী লীগের বিরোধী শিবির ৭টিতে জয় পেয়েছে। সিলেট সদর উপজেলার ৪ ইউনিয়নে দ্বিতীয় ধাপে ভোট হয়। এই ৪টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে আওয়ামী লীগ দুটিতে, জাতায়াত ও খেলাফত মজলিসের দুই নেতা একটি করে দুটিতে নির্বাচিত হয়েছেন। কান্দিগাঁও ইউনিয়নের প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন। এই ইউনিয়নে মাঠে বিদ্রোহী না থাকলেও জয়ের দেখা পেলেন না নিজাম উদ্দিন। জামায়াত নেতা আব্দুল মনাফের কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি। এই পরাজয় আওয়ামী লীগকে অনেক বেশি ভাবাচ্ছে। কারণ, নিজাম উদ্দিন সিলেট সদর আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা হওয়ার কারণে এই পরাজয় আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। আর জামায়াত নেতার কাছেই হারলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এই নেতা। এ কারণে এই ইউনিয়নের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা সিলেটে। হাটখোলা ইউনিয়নে খেলাফত মজলিস নেতা মাওলানা রফিকুজ্জামান আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছেন। এ জয়ে খেলাফত মজলিসের নেতারাও খুশি। সিলেটের মাঠ পর্যায়ে শক্তি পরীক্ষায় তারাও এগিয়ে রয়েছেন সেটি হলো খেলাফত মজলিসের জন্য স্বস্তির খবর।
তবে- সিলেট সদরের মোগলগাঁও ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিরন মিয়া ও জালালাবাদ ইউনিয়নে ওবায়দুল্লাহ ইসহাক জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে মোগলগাঁও ইউনিয়ন নির্বাচনে ভোটে আগেই ছিল উত্তাপ উত্তেজনা। নির্বাচনের দিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কোনো অঘটন ঘটেনি। কোম্পানীগঞ্জের ৫ ইউনিয়নের মধ্যে নৌকা প্রতীকের দুই প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এরা হলেন- উত্তর রনীখাই ইউনিয়নে ফয়জুর রহমান ও দক্ষিণ রনীখাই ইউনিয়নে ইকবাল হোসেন এমাদ। আর তেলীখাল ইউনিয়নে এবারো জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীহের সহ-সভাপতি (বহিষ্কৃত) আব্দুল ওয়াদুল আলফু। নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করেই আলফু বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তিনি বিদ্রোহী হয়ে জয়লাভ করেন। মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আলফুর পক্ষেই একাট্টা ছিলেন।

তবে- কোম্পানীগঞ্জে একক লড়াই করে জয়ী হয়েছেন দুই বিএনপি নেতা। স্বতন্ত্র ব্যানারে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরা হচ্ছে- পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন আলম ও ইছাকলস ইউনিয়নে বিএনপি নেতা সাজ্জাদুর রহমান। বালাগঞ্জের ভোটেও এবারো মাঠ পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার দেখাতে পারলো না আওয়ামী লীগ। ৬ ইউনিয়নের মধ্যে দুটিতে নৌকার প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন।
তবে, ৩টিতেই জয়ী হয়েছেন ৩ বিএনপি নেতা। একটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। সিলেট সদর ইউনিয়ন এবারো দখলে নিতে পারলো না আওয়ামী লীগ। এ ইউনিয়নে বিএনপি নেতা আব্দুল মুমিন তার কর্তৃত্ব ধরেই রাখলেন। তার কাছে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও পরিচিত মুখ জুনেদ মিয়া। পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নে জয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা মুজিবুর রহমান মুজিব। আর দেওয়ান বাজার ইউনিয়নে নিজের আধিপত্য ধরে রাখলেন বিএনপি নেতা নজমুল আলম নজমও। এ উপজেলায় বোয়ালজুর ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ও বর্তমান চেয়ারম্যান আনহার মিয়া ও পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শিহাবউদ্দিন জয়লাভ করেছেন।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, সিলেটের ইউনিয়ন নির্বাচন নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না; এটাই হলো স্বস্তির খবর। তবে, এই নির্বাচনে যে ভুলভ্রান্তি হয় সেগুলো শুধরে পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হবে। বিদ্রোহ ঠেকাতে পারলে সিলেটের বেশির ভাগ ইউনিয়নেই নৌকার প্রার্থীদের জয় ধরে রাখা সম্ভব বলে জানান তারা।