সিলেটে ‘উপেক্ষিত’ স্বাস্থ্যবিধি  বেড়েছে সংক্রমণ

সিলেটে ‘উপেক্ষিত’ স্বাস্থ্যবিধি  বেড়েছে সংক্রমণ

সিলেট প্রতিনিধি।। ১৮ মার্চ, বৃহস্পতিবার।। সিলেটে স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না কেউই। ফলে সিলেট বিভাগ জুড়ে বেড়েই চলেছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। এক সপ্তাহ ধরে সারাদেশের মতো সিলেটের ‘করোনা চিত্র’ও অভিন্ন। সংক্রমণ বাড়ার পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা এতে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দিয়েছেন। তা না হলে সংক্রমণ আরো বাড়বে বলেও মত তাদের।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনা আক্রান্তের হার ছিল নিম্নগামী। তবে, মার্চ মাস থেকে আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। ফেব্রুয়ারিতে গড়ে ১০.৫ জন থাকলেও মার্চ মাসে এ পর্যন্ত গড়ে ১৭.২৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে করোনা সংক্রমণের হার কমে আসে। কিন্তু, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে উদাসীনতার কারণে বর্তমানে সংক্রমণের হার বাড়ছে। চলতি মৌসুমে বিপুল সংখ্যক পর্যটকও সিলেটে আসছেন। এটাও করোনার সংক্রমণ বাড়ার পেছনে মূল কারণ।
সরকার ইতোমধ্যে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি চালু করেছে। সকল স্থানেই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক হলেও সিলেটে এই চিত্র কিছুটা ভিন্ন। রাস্তাঘাট কিংবা হাট-বাজারে মাস্ক পরিহিত লোকের সংখ্যা কমেছে আগের থেকে অনেক। নিয়মিত মাস্ক পরিধান করা, হাত ধোয়া ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলছেন না কেউই। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি। এতে করে প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রমণের হার। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন না করলে এই সংখ্যা আরো দ্রুত বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. আনিসুর রহমান জানান, সংক্রমণ একটু কমেছে বলে সবাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছি, যা মোটেই কাম্য নয়। এ অঞ্চলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে বাড়ছে সংক্রমণ। এটা উদ্বেগজনক।
তিনি আরো জানান, শীতের সময় অন্যান্য ভাইরাস মানবদেহে আক্রমণ করে। মানুষের শরীরে এক ধরনের ভাইরাস প্রবেশ করলে সেটি অন্য ধরনের ভাইরাসকে প্রবেশে বাধা দেয়। ফলে শীতে করোনার প্রকোপ কিছুটা কম ছিল।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক জনসমাগমে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার বিষয়টি ঝুঁকি তৈরি করছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতা জরুরি। পাশাপাশি এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড ল্যাবে গতকাল বুধবার রাতে নতুন করে আরো ৪১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা পরীক্ষা ল্যাব সূত্রে জানা গেছে, শাবির ল্যাবে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৮১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৪১ জনের করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। শনাক্তদের মধ্যে সিলেট জেলার ৩৮ জন, সুনামগঞ্জ ১ জন ও মৌলভীবাজার জেলায় ২ জন রয়েছেন।
সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর কার্যালয় থেকে প্রেরিত কোভিড-১৯ কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যথাক্রমে- ১ ফেব্রুয়ারি ১৪ জন, ২ ফেব্রুয়ারি ১১ জন, ৩ ফেব্রুয়ারি ৩ জন, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৫ জন, ৫ ফেব্রুয়ারি ১২ জন, ৬ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ৭ ফেব্রুয়ারি ১ জন, ৮ ফেব্রুয়ারি ৩ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ৩ জন, ১০ ফেব্রুয়ারি ২২ জন, ১১ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৫ জন, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৫ জন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ৫ জন, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১২ জন, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১২ জন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ৯ জন, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২৭ জন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ২০ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ২১ ফেব্রুয়ারি ৮ জন, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭ জন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১১ জন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ২৬ ফেব্রুয়ারি ৮ জন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮ জন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ১১ জন।
মার্চ মাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যথাক্রমে- ১ মার্চ ২৩ জন, ২ মার্চ ৯ জন, ৩ মার্চ ১৩ জন, ৪ মার্চ ২৩ জন, ৫ মার্চ ১৭ জন, ৬ মার্চ ৯ জন, ৭ মার্চ ১২ জন, ৮ মার্চ ১৮ জন, ৯ মার্চ ১ জন, ১০ মার্চ ১৪ জন, ১১ মার্চ ২২ জন, ১২ মার্চ ১২ জন, ১৩ মার্চ ১২ জন, ১৪ মার্চ ১৬ জন, ১৫ মার্চ ৩৫ জন, ১৬ মার্চ ৩০ জন ও ১৭ মার্চ ২৮ জন।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে সুস্থ রোগীর সংখ্যা যথাক্রমে- ১ ফেব্রুয়ারি ১৬ জন, ২ ফেব্রুয়ারি ১৮ জন, ৩ ফেব্রুয়ারি ১২ জন, ৪ ফেব্রুয়ারি ৫ জন, ৫ ফেব্রুয়ারি ২৬ জন, ৬ ফেব্রুয়ারি ৮ জন, ৭ ফেব্রুয়ারি ৬ জন, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ৪১ জন, ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯ জন, ১১ ফেব্রুয়ারি ১৩ জন, ১২ ফেব্রুয়ারি ১২ জন, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯ জন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ৮ জন, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৪ জন, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৩ জন, ১৭ ফেব্রুয়ারি ৩ জন, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৩ জন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ৮ জন, ২০ ফেব্রুয়ারি ৪ জন, ২১ ফেব্রুয়ারি ১ জন, ২২ ফেব্রুয়ারি ৩ জন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ৩১ জন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ৩২ জন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ৩৭ জন, ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩০ জন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯ জন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ৯ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে গড়ে সুস্থ রোগীর সংখ্যা ১৫.৭১ জন।
মার্চ মাসে সুস্থ রোগীর সংখ্যা যথাক্রমে- ১ মার্চ ৮৫ জন, ২ মার্চ ৭ জন, ৩ মার্চ ২০ জন, ৪ মার্চ ২৮ জন, ৫ মার্চ ৭ জন, ৬ মার্চ ৭ জন, ৭ মার্চ ১৮ জন, ৮ মার্চ ১০ জন, ৯ মার্চ ৯ জন, ১০ মার্চ ৯ জন, ১১ মার্চ ৭ জন, ১২ মার্চ ১১ জন, ১৩ মার্চ ১২ জন, ১৪ মার্চ ১৭ জন, ১৫ মার্চ ১০ জন, ১৬ মার্চ ১৬ জন ও ১৭ মার্চ ২৩ জন। মার্চ মাসে গড়ে সুস্থ রোগীর সংখ্যা ১৭.৪১ জন। আর ফেব্রুয়ারি মাসে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান ৫ জন ও মার্চ মাসের ১৭ দিনে মারা যান ২ জন।
এদিকে, সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর কার্যালয় থেকে প্রেরিত কোভিড-১৯ কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের দৈনিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে ২৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় করোনা ভাইরাস নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন একজন এবং এ রোগ থেকে মুক্ত হয়েছেন ২৩ জন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার নতুন শনাক্ত হওয়া ২৮ জনের মধ্যে ১৫ জন সিলেট জেলার এবং ৬ জন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের, ৩ জন সুনামগঞ্জ জেলার, ১ জন হবিগঞ্জ জেলার ও ৩ জন মৌলভীবাজার জেলার।
এই ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের চার জেলার করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা যাননি। এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৮০ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলার ২১৬ জন, সুনামগঞ্জে ২৬ জন, হবিগঞ্জে ১৬ জন এবং মৌলভীবাজারে রয়েছেন ২২ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট জেলার একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন সিলেট জেলার ৩৫ জন।
বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত করোনামুক্ত ২৩ জনের সকলেই সিলেট জেলার বাসিন্দা। এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হচ্ছে ১৬ হাজার ৫৭৫ জন। অন্যদিকে, সিলেট বিভাগে করোনা মুক্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৮৫১ জন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল সিলেটে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তিনি ছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন। ১৫ এপ্রিল তিনি মারা যান।
করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত ২৭ জানুয়ারি দেশে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এদিন গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মাধ্যমে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেটসহ সারাদেশে গণ টিকাদান শুরু করে সরকার। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এই টিকার দুটি ডোজ নিতে হচ্ছে প্রত্যেককে। সরকার বিনামূল্যে এই টিকা দিচ্ছে। ৭০ লাখ ডোজ টিকার ৩৫ লাখ মানুষকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এই টিকাদান শুরু হয়।
প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা আসার কথা রয়েছে, যার প্রথম চালান গত মাসে এসেছে। এই টিকা আনছে বাংলাদেশে সেরামের ‘এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর’ বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।