সিলেটে নাজিম হত্যা মামলায়  শাহনিয়া ও আকবরের রিমান্ড মঞ্জুর

সিলেটে নাজিম হত্যা মামলায়  শাহনিয়া ও আকবরের রিমান্ড মঞ্জুর
ছবিঃ সংগৃহীত


সিলেট অফিস।। ২৪ জুন।। সিলেট রাবিদ আহমদ নাজিম (২৭) হত্যা মামলার রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। প্রথম দফায় শাহনিয়া ও তার ভাই আকবরকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও নাজিম হত্যার ঘটনায় পুলিশকে তারা কোন তথ্য দেননি।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা কিছুই জানেন না বলে জানান। এদিকে বুধবার (২৩ জুন) শাহনিয়া ও তার ভাই আকবরে পূনরায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্র ৭দিনের আবেদন জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। পরে শুনানী শেষে সিলেট মুখ্য মহানগর আদালতের বিচারক তাদের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন কোতোয়ালি থানার এসআই সাঈদ আহমদ। তিনি জানান, আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালতের বিচারক ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশের কাগজপত্র এখনও পায়নি পুলিশ। কাগজপত্র পাওয়ার পর কোনদিন তাদেরকে রিমান্ডে আনা হবে সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে।
তিনি জানান, প্রথম দফার রিমান্ডে শাহনিয়া ও আকবর কোন তথ্য না দেয়ায় তাদেরকে পূনরায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন করা হয়। আশা করা যাচ্ছে এবার চাঞ্চ্যলকর এই হত্যা মামলার গতি আসবে।
জানা যায়, গত ৭ জুন সকালে সিলেট নগরীর কাজিটুলার ঊঁচাসড়কস্থ চৌধুরী ভিলা নামক ৫ তলা বাসার ছাদ থেকে পড়ে রাবিদ আহমদ নাজিম (২৭) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান। পরবর্তীতে তার মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়। সে রহস্যজট খুলেনি ১৫ দিনেও। নাজিম সিলেটের শাহপরাণ থানার পিরেরবাজার এলাকার আটগাও কেউয়া গ্রামের নুর মিয়ার ছেলে। নাজিমের মৃত্যুর ঘটনায় ওইদিন রাতেই শাহনিয়া বেগম (৩০) নামে এক নারী ও দুই তার দুই ভাইকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অথচ- গত দুই বছর থেকে কাজিটুলার ঊঁচাসড়কস্থ চৌধুরী ভিলার ৫ তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শাহনিয়ার সঙ্গে নাজিম প্রায়ই রাত কাটাতেন। যা জানতো না বিবাহিত ও তিন সন্তানের জনক নাজিমের স্ত্রী-পরিবার।
নাজিমের পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার সকালে নাজিমের বাবাকে কাজিটুলা থেকে কে বা কারা ফোন করে বলেন- নাজিম পাঁচতলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছে। তাকে সিলেট এম জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে নাজিমের পরিবারের সদস্যরা ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে তাকে মৃত দেখতে পান।
এদিকে, নাজিমের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন শাহনিয়া নামের বিবাহিত এক নারী। যার সঙ্গে নাজিম এক ফ্ল্যাটে খালাতো ভাই-বোন পরিচয়ে থাকতেন। যদিও নাজিমের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার বিষয়টি জানতেন না তার পরিবার।
নাজিমের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার দিবাগত (৮ জুন) রাত সোয়া ১২টার দিকে ওই নারী ও তার দুই ভাইকে আটক করেছে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানাপুলিশ। আটকৃতরা হচ্ছে- নিজামের সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে থাকা নারী শাহনিয়া বেগম (৩০), তার ভাই আকবর (২৬) ও ইয়ামিন (২৪)। তাদের বাবার নাম আলাউদ্দিন আনোয়ার। তাদের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ থানার গহরপুর এলাকায়। এর আগে ৭ জুন রাতে ওই তিনজনের বিরুদ্ধে নাজিমের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং-২৪।
পুলিশ জানিয়েছে, মাদক সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নাজিমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে। এজন্য পুলিশ শাহনিয়া নামের ওই নারীকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি মুখ খুলেননি। সেই সাথে মুখ খুলেননি শাহনিয়ার দুই ভাই আকবর এবং ইয়ামিনও। তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য না পাওয়ায় পুলিশ ৮ জুন দুপুরে তাদেরকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে।
পরে ১০ জুন সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আব্দুল মোমেন শাহনিয়া ও তার ভাই আকবরকে ৩ দিন করে রিমান্ডে নেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু রিমান্ডের তিনদিনের জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ।
জানা গেছে, দীর্ঘ ১১ বছরের সুখের দাম্পত্যজীবন ছিলো রাবিদ আহমদ নাজিম ও স্ত্রী রাবিয়া খাতুন তানির। বিবাহিত জীবনে তারা ছিলেন ৩ সন্তানের মা-বাবা। সুখেই কাটছিলো বিবাহিত জীবনের দিনগুলো। কিন্তু ‘শাহনিয়া’ নামক এক ঝড় উল্টে-পাল্টে ডুবিয়ে দিলো তাদের জীবনডিঙি। নাজিমকে চিরতরে কেড়ে নিলো রাবিয়ার জীবন থেকে। ৩টি অবুঝ সন্তানকে সারা জীবনের জন্য করে দিলো পিতৃহারা।
নাজিমের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। দুই বছর আগে তিনি ঊঁচাসড়কস্থ চৌধুরী ভিলা নামক ৫ তলা বাসার পঞ্চম তলার বি/৫ ফ্ল্যাটটি শাহনিয়া বেগম (৩০) নামক ওই নারীর সঙ্গে খালাতো বোন পরিচয়ে সাবলেট ভাড়া নেন। সেই ফ্ল্যাটে শাহনিয়া ও তার ভাই আকবর থাকতেন। সেই ফ্ল্যাটের ভাড়া দেয়া হতো ১২ হাজার টাকা। নাজিম পরিবারের অজান্তে সেই ফ্ল্যাটে প্রায়ই রাত কাঁটাতেন। মৃত্যুর পর নাজিমের থাকার কক্ষ থেকে নানা রকমের মাদকদ্রব্য ও সেবনের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করেছে পুলিশ। নাজিম যাদের সঙ্গে ভাড়া থাকতেন সেই ছেলে ও মেয়ে তার খালাতো ভাই-বোনও নন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
নাজিমের মৃত্যুর একদিন পর মঙ্গলবার (৮ জুন) দুপুরে সিলেটভিউ’র কথা হয় তার স্ত্রী রাবিয়া খাতুন তানির সঙ্গে। অশ্রুভেজা নয়নে রাবিয়া জানান, বিবাহিত জীবনে নাজিমের সঙ্গে তিনি সুখি ছিলেন। তাদের ছিলো না কোনো আর্থিক সংকট। এক ছেলেও ফুটফুটে দুটি মেয়ে সন্তান রয়েছে তাদের।
রাবিয়ার বাবার বাড়ি সিলেট নগরীর টিলাগড়ে। ১১ বছর আগে নাজিমের সঙ্গে বিয়ে হয় জানিয়ে রাবিয়া সিলেটভিউ-কে বলেন, আমার স্বামী আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। আমার জানামতে- তিনি সিগারেট পর্যন্ত খেতেন না। আমার স্বামীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। শাহনিয়া নামের ওই মেয়েই আমার জীবনের সর্বনাশ করেছে। আমার স্বামীকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, সন্তানদের করেছে পিতৃহারা। শাহিনয়াকে বার বার রিমান্ডে নিলেই সবকিছু বেরিয়ে আসবে।
২ বছর ধরে কাজিটুলার সেই বাসায় নাজিমের রাত কাটানোর বিষয়ে রাবিয়া বলেন, এ বিষয়টি আমি কোনোমতেই জানতাম না। এমনকি আমার শ্বশুর-শাশুড়িও জানতেন না। বাইরে রাত কাটানোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন- পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য মাঝে-মধ্যে বাইরে রাত কাটাতে হচ্ছে।.