সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, জনদুর্ভোগ চরমে

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, জনদুর্ভোগ চরমে
ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেট অফিস : সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও অব্যাহত রয়েছে পানি বৃদ্ধি। জেলা প্রশাসনের হিসেবেই, সিলেটে ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। তবে বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বন্যায় সিলেট নগরী সহ সদর, দক্ষিণ সুরমা, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পর এবার বিয়ানীবাজার এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলারও বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পানি উঠেছে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলা কমপ্লেক্সে। এসব উপজেলার অনেক বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রেও পানি উঠে গেছে। এতে আশ্রিতরা পড়েছেন বিপাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের সহকারী প্রকৌশলী নিলয় পাশা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে পাওয়া হিসেবে, সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৭৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত সিলেট জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর ৩৪ বাঁধ ভেঙ্গে পানি ঢুকেছে বিভিন্ন এলাকায়।
সিলেটের নগরীর বন্যা কবলিত বেশীরভাগ এলাকায় গত সোমবার থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুতহীনতা পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। অনেকের বাসায় পানি না উঠলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটছে। সময় যত গড়াচ্ছে বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। 
সিলেট নগরীর বাসা বাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় বন্যা কবলিত বেশিরভাগ এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির।
তিনি বলেন, কিছু জায়গায় সাব স্টেশনের যন্ত্রপাতি পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার অনেক জায়গার বাসা বাড়ির মিটার পর্যন্ত ডুবে গেছে। একারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। তারপরও আমরা সরবরাহ স্বাভাবিক করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে কিছু এলাকায়স্বাভাবিক হয়ে গেছে। পানি কমলে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ঘাষিটুলা, বেতের বাজার, কানিশাইলের অন্তত ২০টি পাড়া। নদীর  উপচে পানি ঢুকেছে ওই জনপদে। কয়েক হাজার বাসা-বাড়ি তলিয়ে গেছে। ওই এলাকায় কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি। ঘাষিটুলা ও বেতের বাজার থেকে শতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। 
স্বল্প আয়ের মানুষ বিশেষ করে দিনমজুরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় অনাহারে-অর্ধাহারে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার পানি না বাড়লেও কমার কোন লক্ষন নেই। মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্র কম। এতো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রেও জায়গা হবে না। আর কেন্দ্রে যারা আছেন তারা শুকনো খাবার খাচ্ছেন। 
গত বুধবার সকাল ৬টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সকাল থেকে থেমে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে।
সিলেট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৫৫টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে এবং ১৫টি ইউনিয়ন আংশিকভাবে প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে সিলেট সদর ও জৈন্তাপুর উপজেলায় নৌকাডুবিতে ৩ জন মারা গেছেন। গোলাপগঞ্জে পাহাড় ধসে একজন মারা গেছেন।
জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অফিসের হিসেবে, চলমান বন্যায় বুধবার পর্যন্ত আউশ ধানের বীজতলা এক হাজার ৩০১ হেক্টর, বোরো ধান এক হাজার ৭০৪ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন সবজি এক হাজার ৪ হেক্টর পানিতে তলিয়ে গেছে।বন্যায় বিপর্যন্ত সিলেট।ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষ। পানিতে ভাসছে নগর থেকে গ্রামগঞ্জের বাড়ি-ঘর, হাটবাজার। রাস্তাঘাট ডুবে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকার সঙ্গে জেলা ও উপজেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীসহ সিলেট সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক বন্যা প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৩০ কিলোমিটার এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) আওতাধীন ৮টি সড়কে ৫৫ কিলোমিটার বন্যা প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে অনেক সড়কে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, সিসিক এলাকার ৫০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৪টি ওয়ার্ডের প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার সড়কে বন্যার পানি উঠে গেছে। এসব সড়কের অনেক স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন সিলেট জেলার ১০টি উপজেলার ৬৬টি সড়কে ২৩০ কিলোমিটার পানিতে তলিয়ে জেলা ও উপজেলা সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘিœত হয়েছে। অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এনামুল কবীর এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, পাকা রাস্তা ডেমেজ হওয়ার পরিমাণ ১৭২ কোটি ২৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্যা কবলিত জেলার গোয়াইনঘাটে ২৭টি সড়কে ৮২ দশমিক ১৩ কিলোমিটার, কানাইঘাটে ১৫টি সড়কে ৩০দশমিক ৫ কিলোমিটার,জৈন্তাপুর উপজেলার ১১টি সড়কের ৩২ দশমিক ০১ কিলোমিটার, সিলেট সদরের ১২টি সড়কে ২১ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার, গোলাপগঞ্জে ১০টি সড়কে ২২ দশমিক ০৩ কিলোমিটার, কোম্পানীগঞ্জে ৪টি সড়কে ৩৪ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার, দক্ষিণ সুরমার ৪টি সড়কে সাড়ে ৩ কিলোমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জে ১টি সড়কের দেড় কিলোমিটার,ওসমানীনগর উপজেলায় ১টি সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার, বালাগঞ্জে ১টি সড়কে দেড় কিলোমিটার।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুস্তফিকুর রহমান বলেন, সারি-গোয়াইনঘাট ২য় থেকে ১৬ তম কিলোমিটার পর্যন্ত ১২ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার সড়ক ১ থেকে সাড়ে ৪ ফুট উচ্চতার পানির নীচে তলিয়ে যানচলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। সিলেট-তামাবিল-জাফলং সড়ক ১ দশমিক ২০ কিলোমিটার ১ থেকে ৩ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। কানাইঘাটের দরবস্ত-কানাইঘাট-শাহবাগ সড়ক ৭ থেকে ২৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ১ থেকে ৪ ফুট পানিতে তলিয়ে যানচলাচল বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক ৩য় থেকে ৫ম এবং ৮ থেকে ১৩তম কিলোমিটার পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটারে ১ থেকে ২ ফুট পানি উঠেছে। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রশিদপুর-লামাকাজি সড়ক ১৫ থেকে ১৭ তম কিলোমিটার পর্যন্ত ২ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ২ থেকে ৩ফুট পানির নীচে তলিয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ-ছাতক সড়ক ১ থেকে ১২ তম কিলোমিটার পর্যন্ত ১০ দশমিক ২৫ পর্যন্ত ১০ দশমিক ২৫ কিলোমিটারে ১ থেকে ৫ ফুট উচ্চতায় পানিতে তলিয়ে গিয়ে যানচলাবল বন্ধ রয়েছে। শেওলা সুতারকান্দি সড়কে ১ থেকে ৪র্থ কিলোমিটার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ২ দশমিক ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ৫ থেকে এক ফুট পর্যন্ত পানি উঠে যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। বিমানবন্দর-বাদাঘাট-কুমারগাঁও (টুকেরবাজার) সড়কে ৫ থেকে ৯, ১১ ও ১২ তম কিলোমিটারের মধ্যে ১ থেকে সাড়ে ৩ ফুট পর্যন্ত পানি উঠে যানচলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে
সিলেটের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, ‘জেলায় ২৭৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বর্তমানে ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৪৭৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। গবাদিপশুর জন্য ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বন্যার্তদের মধ্যে এরই মধ্যে ৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, ১৪৯ টন চাল, ১৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আশয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা ও বিশুদ্ধ পানি দেয়া হচ্ছে। ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আরও ২৫ লাখ টাকা, ২০০ টন চাল ও ৪০০০ প্যাকেট শুকনো খাবার পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে প্রবল বিজলি চমকানোসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময় সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
বৃহস্পতিবার সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘন্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।