সিলেটে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা, দুঃশ্চিন্তায় সচেতন মহল

সিলেটে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা, দুঃশ্চিন্তায় সচেতন মহল
ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেট অফিস :সিলেটে হঠাৎ করেই বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। সর্বশেষ দুই দিনের ব্যবধানে সিলেট এমসি কলেজের এক ছাত্রী ও এক ছাত্রের আত্মহত্যার পর বিষয়টি নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিবাবক ও সচেতন মহল। বিশেষজ্ঞতা বলছেন, আত্মহত্যার প্রবণতা কমানে সচেতনতা ও কাউন্সিলের বিকল্প নেই।
গত ২৭ মে নগরীর পাঠানটুলা গোয়াবাড়ি মোহনা আবাসিক এলাকার সি-বøকের ২২ নম্বর বাসার একটি কক্ষ থেকে মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ দাশ রাহুলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে গত ২৫ মে একই কলেজের নতুন ছাত্রী হোস্টেল থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী স্মৃতি রানী দাসের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এদিকে, গত ২৬ মে সদর উপজেলার জালালাবাদ থানাধীন লামা আকিলপুর গ্রামের আব্দুর রশিদ (৬০) নামে এক ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পুলিশ আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছে, তিনজনই আত্মহত্যা করেছেন।
সর্বশেষ ২৮ মে গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার ছিটা ফুলবাড়ি থেকে সুজিত মালাকার নামে এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
সব মিলিয়ে সিলেটে হঠাৎ বেড়ে গেছে আত্মহত্যার প্রবণতা। কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ, ধনী, দরিদ্র সবার মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত তিন দিনে তিনটি আত্মহত্যার মধ্যে দুজন এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ও একজন ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তি।
সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মো. লুৎফর রহমান জানান, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সিলেট জেলায় আত্মহত্যা করেছেন ৩৯৬ জন। এর মধ্যে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৩১৫ জন। বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন ৭৯ জন ও গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন দুজন। সিলেটে ২০২০ সালে ৯৩ টি, ২০২১ সালে ৯৯টি ও ২০২২ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৩০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপে হতাশা বেড়ে যাওয়া, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে আসক্তির কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে। পাশাপাশি অপ্রাপ্তি, হতাশা, প্রতারণা, মানসিক অবসাদ, পারিবারিক নির্যাতন ও অতিরিক্ত আবেগ প্রবণতার কারণেই বেশির ভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।
ইবনে সিনা হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জান্নাতুন নাহার তানিয়া বলেন, ‘আত্মহত্যা বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে মানুষের মধ্যে এখন শেয়ারিং-কেয়ারিং কমে গেছে। সবাই এখন আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে অ্যাকটিভ সেভাবে পারিবারিক সামাজিকভাবে অ্যাকটিভ না। যে জন্য এখন মানুষজনের একাকিত্ব চলে এসেছে। আগে যেভাবে মানুষজন নিজেদের সমস্যাগুলো পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের কাছে শেয়ার করত এখন আর তা করছে না।’
ডা. জান্নাতুন নাহার তানিয়া আরও বলেন, এক সময় একধরনের শ্রেণি-পেশার মানুষজন আত্মহত্যা করত। যেমন কখনো উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা, কখনো যুবরা। তবে এখন সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অস্বাভাবিক কাজ করছে। কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত সবার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মো. জেদান আল মুসা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আত্মহত্যার কেস স্টাডি করে বুঝতে পেরেছি, যত দিন যাচ্ছে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হচ্ছি। কিন্তু সামাজিক হতে পারছি না। আমাদের মধ্য থেকে সামাজিক পারিবারিক বন্ধন হারিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে মানুষজন একা হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। কারও কাছে কোনো সমস্যা শেয়ার না করে মানুষজন আত্মহত্যা করছে।’