সৈয়দপুরে পারিবারিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ মারোয়াড়ী গৃহবধূর আত্মহত্যা

সৈয়দপুরে পারিবারিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ  মারোয়াড়ী গৃহবধূর আত্মহত্যা

স্টাফ রিপোর্টার।। স্বামী-শ্বাশুড়ি-দেবরের অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহননের চেষ্টাকারী স্বনামধন্য এক মারোয়াড়ী পরিবারের গৃহবধূ জ্যোতি অবশেষে মারা গেছেন। রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এখবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে স্বামীসহ পরিবারের লোকজন গা ঢাকা দিয়েছে। 

 গত বৃহস্পতিবার  ঘুমের ওষুধ খেয়ে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে তিনদিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন দুই সন্তানের জননী ওই অসহায় নারী। তার নিজের হাতে লেখা সুইসাইড নোটে উঠে এসেছে আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্যাতনের লোমহর্ষক অভিযোগ। এমন ঘটনা ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে। মৃত গৃহবধূ জ্যোতি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান ও শহরের সুপরিচিত ব্যবসায়ী সুমিত কুমার আগারওয়াল নিক্কির স্ত্রী। 

 জানা যায়, এক সপ্তাহ আগে দুই পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে তা ছবি তুলে সৈয়দপুর হিন্দু কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের কাছে ম্যাসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় জ্যোতি। কিন্তু কেউই তার উপর পারিবারিক অত্যাচারের বিষয়ে সুরাহা করতে এগিয়ে না আসায় এবং নির্যাতন অব্যাহত থাকায় গত বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে  অস্বাভাবিক পরিমাণে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। 

 শহীদ বদিউজ্জামান সড়ক এলাকায় ভাড়া বাড়িতে এই ঘটনায় গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা টের পায়। কিন্তু তাৎক্ষণিক হাসপাতালে না নিয়ে পারিবারিকভাবে চিকিৎসা করতে থাকে নিক্কির ছোট ভাই অমিত কুমার আগারওয়ালার স্ত্রী ডা. অমৃতা কুমারী আগারওয়াল। 

 কিন্তু অবস্থার অবনতি হলেও গুরুত্ব দেয়া হয়নি। রাতে পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ায় বাধ্য হয়ে মাইক্রোবাস যোগে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। গত তিনদিন থেকে সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন। 

 ঘুমের ওষুধ খাওয়ার আগে ডায়েরীর পাতায় লেখা দুই পৃষ্ঠার ওই সুইসাইড নোটে জ্যোতি তার মৃত্যুর জন্য চারজনকে দায়ী করে তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন, স্বামী সুমিত কুমার, শ্বাশুড়ী উমা দেবী, দেবর অমিত কুমার ও জা ডা. অমৃতা কুমারী। এক্ষেত্রে তার দুই সন্তান একেবারে নির্দোষ বলেও তুলে ধরেছেন। 

 সুইসাইড নোটে তিনি লিখেছেন, আমার বিয়ে হয়েছে ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিয়ের পর থেকেই শ্বাশুড়ী ও স্বামী-দেবর মানসিক নির্যাতন করছে। দেবরের বিয়ের পর জা অমৃতাও তাদের সাথে যোগ দিয়ে অত্যাচার চালিয়ে আসছে। এরা আমাকে চার বার মেরে ফেলার চেষ্টাও করেছে। বেঁচে আছি সেটা আমার ভাগ্য।

 আমাকে সাজিয়ে মিথ্যে বলে আমার গয়না ও জমানো টাকা নিয়েছে তারা। ফেরত দিবে বলে আজও দেয়নি। বরং টাকা ও গয়নার কথা বললেই অত্যাচারের মাত্রা বাড়ায়। গায়েও হাত তুলেছে সবাই মিলে। আমার মা বাবা নেই। ভাই বোনদের জন্য বেঁচে ছিলাম। কে জানতো ওরা আমাকে মেরে ফেলবে? তাহলেতো আমার ভাই বোনরা ছেড়ে দিতনা। 

 শ্বাশুড়ী উমা দেবী আমাকে কখনো দেখতে পারেনি, ভালও বাসেনি। আমার সংসার ভাঙার পেছনেও তাঁর হাত রয়েছে। তিনি উল্টাপাল্টা বলে তাঁর ছেলে সুমিতের কান ভরতো। এমনকি

আমার বাচ্চা দুটোকেও এরা ভয় দেখিয়ে রাখে। একারণে তারা কিছু বলতে পারেনা। বাচ্চাদের রক্ষার জন্যও আকুতি জানিয়েছেন জ্যোতি।

 জ্যোতি আরও লিখেছেন, মানুষ মৃত্যুর সময় কখনো মিথ্যে বলেনা। বিশ্বাস না হলে কাজের লোক ও পাড়া প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে দেখবেন। আমার শ্বাশুড়ী অনেক অত্যাচার করেছে। ২১ বছর ধরে আমি শুধু কাঁদছি। এরা কখনই সুখের দিন দেখতে দেয়নি। আমার মৃত্যুর বিচার চাই। 

 জ্যোতি আগারওয়ালের বাবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। তাঁর স্বামী সুমিত কুমার আগারওয়াল নিক্কি সৈয়দপুর উপজেলা হিন্দু কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি। তিনি সৈয়দপুরের সুনামধন্য দানবীর ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ তুলশীরাম আগারওয়ালার নাতি ও প্রখ্যাত শিল্পপতি সুশীল কুমার আগারওয়ালার বড় ছেলে। 

 এই ঘটনায় শহরজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সুইসাইড নোটের কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। মারোয়াড়ী ব্যবসায়ী মহলসহ শিল্পপতি ও রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও সমালোচনার ঝড় তুলেছে পারিবারিক নির্যাতন ও আত্মহননের বিষয়টি। তবে সকলে আশা করেছিলেন জ্যোতি সুস্থ হয়ে তার সন্তানদের কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন তিনি। 

 ইতোপূর্বে প্রায় ৬/৭ বার শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, হিন্দু কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্থতায় শালিশ মিমাংসা করা হয়েছে। প্রতিবারই সুমিতের পরিবার জ্যোতি ও তার ভাইদের হাত পা ধরে ম্যানেজ করেছে। কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি মানসিক ও শারীরিক হেনস্থা।

 শনিবার জ্যোতির স্বামী সুমিত কুমার আগারওয়াল নিক্কি মোবাইলে বলেন, সুইসাইড নোট বলে যে উড়ো চিঠির কথা প্রচার করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। কারন এটি আমার স্ত্রীর লেখা নয়। তার হাতের লেখার সাথে কোন মিল নেই। কিভাবে প্রমান করবেন যে চিঠিটা জ্যোতি লিখেছে। 

 এদিকে জ্যোতির মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবারের সবাই গা ঢাকা দিয়েছে। গতকালকেও স্বামী সুমিত কুমার ও জা ডা. অমৃতা কুমারীর মোবাইল চালু ছিল। এখন সবার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। পুলিশও বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চেম্বারে ঢু মারলেও সব বন্ধ ছিল। একটি সূত্রমতে অমৃতার বাবার বাসায় তারা লুকিয়ে আছে নয়তো ভারতে চলে গেছে।

 এব্যাপারে সৈয়দপুর থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর খবর শুনেছি। তবে এখনও কোন অভিযোগ পাইনি। মৃত জ্যোতির ভাই মোবাইল জানিয়েছেন লাশসহ সৈয়দপুরে আসতেছেন। তিনি অভিযোগ দিলে আসামীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।