হোটেলে কাজ করবে হাবিবের তৈরি রোবট ‘চিট্টি’

হোটেলে কাজ করবে হাবিবের তৈরি রোবট ‘চিট্টি’

তৌহিদুল ইসলাম, নিউজ করেসপনডেন্ট।। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে প্রথমবারের মতো একটি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে হোটেল বয় হিসেবে কাজ করবে একটি রোবট।

‘চিট্টি’ নামের রোবটটির নির্মাতা কালীগঞ্জ সরকারি করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আহসান হাবিব (১৮)। চলতি সপ্তাহেই রোবটটি হোটেলে ডেলিভারি করা হবে বলে জানিয়েছেন হাবিব।

বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় যে কোনো প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দিতে পারে ভয়েস কন্ট্রোলড রোবট চিট্টি। মানুষের দেহের গঠনের সঙ্গে মিল রয়েছে। হালকা কাজ করতে সক্ষম চিট্টি মানুষের ছবি ও কথা রেকর্ড রাখতে পারাসহ করমর্দন ও অঙ্গভঙ্গি করতে পারে।

রোবটটির নির্মাতা আহসান হাবিব কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ইউনিয়নের সুন্দ্রাহবি গ্রামের মৃত মজু মিয়া খালেদা বেগমের ছেলে। পরিবারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে আহসান হাবিব সবার ছোট। নিজেদের জায়গা-জমি বলতে আছে শুধু তিন শতক জমির ওপর ভিটেটুকু। বড় ভাই খাইরুল ইসলাম পেশায় একজন ট্রাকচালক।

ইউটিউবের ভিডিও দেখে সাত মাসের প্রচেষ্টায় রোবটটি বানাতে সক্ষম হয়েছেন আহসান হাবিব। এতে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। রোবটটি এখন চার ভোল্টেজ ব্যাটারিতে চলছে। ১২ ভোল্টেজ ব্যাটারি লাগালে এটি আরও দ্রুত কাজ করতে পারবে বলে জানান নির্মাতা আহসান হাবিব।

সোমবার (৬ জুন) সরেজমিন আহসান হাবিবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় রোবট চিট্টির প্রদর্শনীর করছেন নির্মাতা হাবিব। চারপাশে উৎসুক জনতার ভিড়। হাবিব একের পর এক প্রশ্ন করছে আর চিট্টি ইংরেজিতে জবাব দিচ্ছে। নির্দেশনামতো এদিক-ওদিক ঘুরছে। সামনে-পেছনে মুভ করছে। হাত বাড়িয়ে দিলে করমর্দনও করছে চিট্টি।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আহসান হাবিব ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন নতুন কিছু আবিষ্কার করবেন। কিন্তু দরিদ্রতাকে ডিঙিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব হচ্ছিল না।

২০১৭ সালে একটি সুযোগ আসে। আহসান হাবিব তুষভান্ডার আর এমএমপি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে সে স্কুলের ফান্ডের টাকায় বিজ্ঞান মেলায় একটি রোবট বানানোর সুযোগ পান। তিনি লালমনিরহাট জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

২০১২ সালে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী দরিদ্র বাবা মজু মিয়াকে হারিয়ে আবার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে আহসান হাবিবের জীবনে। লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খান হাবিব। শুরু হয় তার কঠিন জীবনসংগ্রাম। তবুও হাল ছেড়ে দেননি স্বপ্নবাজ এ যুবক। প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১২টি টিউশনি করে পরিবার ও লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন।

টিউশনির সামান্য সঞ্চয় ও ধারদেনা করে হোটেলের জন্য রোবটটি তৈরি করেন আহসান হাবিব। রোবটটি উপজেলার তুষভান্ডার রওশন ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন ভোজন বিলাস হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এ সপ্তাহেই হোটেলে রোবটটি ডেলিভারি করা হবে বলে জানান হাবিব।

রোবট চিট্টির নির্মাতা আহসান হাবিব বলেন, স্কুলের বিজ্ঞানমেলায় আমি জেলায় প্রথম হয়েছিলাম। তখন থেকে আমি রোবট বানানোর চেষ্টা করি। মূলত ইউটিউব দেখেই এ কাজে আগ্রহী হই।’

তিনি বলেন, ‘এ কাজে আমার মা, বড় ভাই, চাচা সবার আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। বন্ধুরাও আমাকে সবসময় সহযোগিতা করেছে। প্রধানমন্ত্রী একটু নজর দিলে আমি আরও ভালো কিছু বানাতে পারবো।’

হাবিবের মা খালেদা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলের এমন কাজে আমার খুব ভালো লাগছে। গ্রামের মানুষ আমার ছেলেকে পাগল বলেছিল। কিন্তু একটি রোবট বানিয়ে সে দেখিয়ে দিয়েছে। এতে আমি আনন্দিত।’

প্রতিবেশী সাজু মিয়া (৫০)বলেন, ‘আমার গ্রামের ছেলে একটা রোবট বানাইছে দেখে খুব খুশি হয়েছি। এটি কথা বলে, হ্যান্ডশেকও করে।’

তুষভান্ডার রমনীমোহন মেমোরিয়াল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলিলি কান্ত রায় বলেন, ‘আহসান হাবিব ২০১৭ সালে বিজ্ঞানমেলায় লালমনিরহাট জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে। তখন থেকে সে রোবট বানানোর ওপর ঝুঁকে পড়েছে। অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও একটি রোবট তৈরি করেছে। সবার সহযোগিতা পেলে সে আরও এগিয়ে যাবে।’

তুষভান্ডার ভোজন বিলাস হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, রোবট বানানোর শুরু থেকেই উৎসাহ দিয়ে ও অর্থনৈতিকভাবে আমরা তাকে সহযোগিতা করেছি। হাবিবের রোবটটি পূর্ণাঙ্গ হলে আমার দোকানে হোটেল বয় হিসেবে কাজ করানো হবে।’

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মান্নান বলেন, ‘রোবট তৈরির বিষয়টি জেনেছি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ফলে তরুণ উদ্যোক্তারা এগিয়ে যাচ্ছে। খোঁজখবর নিয়ে ওই তরুণ উদ্যোক্তাকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে।’

এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানান, রোবট তৈরির বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বিষয়টি খোঁজ নেবেন।