অনলাইন বিজনেস,অনভিজ্ঞতায় ব্যাবসার নামে ইন্টারনেট সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া!

অনলাইন বিজনেস,অনভিজ্ঞতায় ব্যাবসার নামে ইন্টারনেট সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া!
ছবিঃ সংগৃহীত

মাহমুদুল হাসান/ নরসিংদী প্রতিনিধিঃ-  সুমনা ভাবী অনলাইনে ব্যাবসা করেন। তার দুইটি ফেইজবুক আইডি, তিনটি পেইজ, এবং দুইটি গ্রুপ রয়েছে। প্রতিটি পেইজ বা গ্রুপে কমপক্ষে হলেও  2k মেম্বার অর্থাৎ ০২ হাজার মানুষ যুক্ত আছেন। এর কোনোটি নিজের নামে, কোনোটি তার বাচ্চাদের নামে।নিজেদের নামের পরে ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন, বিজনেস কর্নার, ফ্যাশন হাউজ, বিজনেস এসোসিয়েশন ইত্যাদি চমকপ্রদ ও বাহারি নামে এসব আইডি, পেইজ এবং গ্রুপের নামকরন করেছেন তিনি।

আজ কাব্য রানী নামের আইডি থেকে নতুন একটি বিজনেস গ্রুপের ইনভাইট পাঠিয়েছেন সুমনা ভাবীর বাচ্চার স্কুলের অভিভাবিকা জুলেখা বেগম। গ্রুপের সদস্য সংখ্যা 1.5m অর্থাৎ  দেড় লাখ। 

ও ভাবী!ওমাই গড!এত মোম্বার! সুমনা ভাবীর আহ্লাদি অভিব্যাক্তিতে ফোনের ওপাশে কাব্যরানীস্ কিচেন এর ওনার জুলেখা ভাবী দু একদিন পূর্বে এর সদস্য হয়ে সেলার কোড পেয়েছেন বলে জানান।

সেলার কোড হচ্ছে যে কোন গ্রুপে পন্য বিক্রি করার লাইসেন্স নাম্বার। এগুলো গ্রুপের এডমিনগন দিয়ে থাকেন। তবে সেলার কোড নিতে গেলে গ্রুপগুলোয় অজস্র নিয়মের মহরত পালন করে তবেই সেলার কোড অর্জন করা যায়।যে যার পছন্দসই নিয়ম বানিয়ে গ্রুপের এডমিন পোস্ট ও রুলস অপশনে দিয়ে রাখেন। যে গ্রুপ যত বড় তার নিয়মও তত বেশি।  ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধরনের নিয়ম বিভিন্ন স্থানে প্রত্যক্ষ করা যায়। তার মধ্যে কিছু নিয়ম যা প্রতিটি গ্রুপের এডমিনগনই প্রত্যাশা করে থাকেন। আর সেগুলো হলো মেম্বার ইনভাইট, এডমিনকে স্যার বলে সম্মোধন বা যার পরনেই সম্মান করা, যত্রতত্র যেমন তেমন পোস্ট না করা, গ্রুপ মেম্বারগন একে অন্যের সাথে দুর্ব্যাবহার না করা, গ্রুপ পোস্টে নিয়মিত লাইক কমেন্ট করা ইত্যাদি।

আইডির নাম বিল্লিবাবু ওরফে শাস্তা ইসলাম ওনার অব শান্তাস কালেকশন হাউজ। এ নামে তিনি একটি পেইজও খুলেছেন। গত সপ্তাহে আইটি এক্সপার্ট  এক্সওয়াইজেড বিজনেস আইটি সল্যুশন থেকে বুস্ট করিয়েছিলেন। বর্তমানে তার লাইক ত্রিশ হাজার, এটা যে কোন গ্রুপে পোস্ট দাতা হিসেবে অনেক গর্ব আর আত্মবিশ্বাসের ব্যাপার।ক্রেতাগন অনেকেই মনে করেন, পেইজে লাইকের পরিমান বেশি থাকা মানে সে পেইজের গ্রহনযোগ্যতা এক ধাপ এগিয়ে। আর  এজন্য অনেকেই টাকা দিয়ে বুস্ট করিয়ে এক রকম জোর করে পেইজের লাইক এবং ভিউ বাড়িয়ে থাকেন। 

সুমনা ভাবী, জুলেখা ভাবী এবং শান্তা ইসলাম এরা প্রত্যেকেই তরুন উদ্যোক্তা। দেশে করোনার প্রভাবে বাহিরে কাজকর্ম, স্কুল কলেজ বন্ধ থাকাতে এখন অনলাইনেই বেশি সময় কাটান। সারাদিন বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করে, আইডিতে ইনভাইট পাঠিয়ে গ্রুপ এডমিনগনের সুদৃস্টিতে থাকার চেস্টা সহ বিভিন্ন পেইজে নিজের এবং অন্যের পন্যের দরদাম নিয়ে মেসেঞ্জারে কথোপকথন করে দিনটি বেশ ভালই কেটে যায়।

গত সপ্তাহে শান্তা বুটিক হাউজ থেকে তিনশত টাকায় এক সেট হ্যান্ডমেইড গহনা ক্রয় করেছিল সুমনা ভাবী। সাত দিন যেতে না যেতেই রং উঠে গেছে। এ নিয়ে জুলেখা ভাবী, সেতু এন্টারপ্রাইজের ওনার বিলকিস আপা, ফরেন কসমেটিক্স এর ওনার বিথী রানী এবং আরো কয়েক উদ্যোক্তা ভাবী মিলে সকাল থেকে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে বিশ্লেষন চলছে। ইতিমধ্যে বিথী রানী একই ধরনের গহনা একশত পঞ্চাশটাকায় দিতে পারবেন বলে প্রস্তাবও করেছেন। তবে এ চ্যাটিং গ্রুপে শান্তা ইসলাম কে না রাখলেও ইতিমধ্যে এই গ্রুপের চ্যাটিং এর স্ক্রিন সর্ট যে তার কাছে পৌঁছে নাই সে বিষয়ে কেউ গ্যারান্টি দিতে নারাজ।

যাই হোক, দোষে গুনেই মানুষ। আজ ইন্টারনেট দুনিয়ায় ফেইজবুক, মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোঢাটসআপ বা এ ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম আছে বলেই আমরা ঘরের কোনে বন্দি থেকেও সারা পৃথিবীর খোঁজ নিতে পারছি অনায়াসে। দেশের এক এলাকার পন্য পৌঁছে দিচ্ছি অন্য এলাকায়। আজ ঘরে ঘরে তৈরী হচ্ছে উদ্যোক্তা। পন্য বিক্রি হোক বা না হোক ফেইজবুকে অনেকেই বিশাল গ্রুপ অব কোম্পানীর মালিক হয়ে নিজের একটা পরিচয় দিচ্ছি। একজনের নামে চারপাঁচটি ফেইজবুক আইডি, পাঁচ সাতটা পেইজ আর কয়েকশত গ্রুপের সদস্য হিসেবে সারাদিন স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপে বুথ হয়ে থাকি। ইদানিং বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক সহিংসতা, বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ। খুন, ধর্ষন, শিশু নির্যাতন, বিবাহ বিচ্ছেদের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে অতীতের সকল রেকর্ড।ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে তাদের উপর।বাবা মাকে বিরক্ত না করার বিকল্প হিসেবে তাদের হাতেও তুলে দিচ্ছি ইলেকট্রনিক্স ডিভাইজ। অভিভাবকদের সাথে তারাও আসক্ত হয়ে যাচ্ছে ক্ষতিকর অনলাইন গেইম সহ বিভিন্ন সাইটের প্রতি। শারিরীক ও মানসিক সমস্যা সহ দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন সমস্যা। করোনার প্রভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাতে এই প্রভাবের মাত্রা আরো বেড়ে যাচ্ছে বহুগুন।

এখানে যাদের কথা বলা হলো তারা বর্তমান সময়ের একটা প্রতিচ্ছবি মাত্র।  এসব অনলাইন বিজনেসের নামে সারা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠি হাবুডুবু খাচ্ছেন ইন্টারনেটের বিশাল সমুদ্রে। পর্যাপ্ত পুঁজি ও সঠিক ধারনার অভাবে কাংখিত লক্ষে পৌঁছার আগে অনেকেই তলিয়ে যাচ্ছেন বিফলতার অতল গভীরে। 

বর্তমানে এ থেকে পরিত্রানের উপায় খোঁজার কোন পদক্ষেপ চোখে না পড়লেও খুব অচিরেই হয়ত দেশের বিশেষ মহল এ নিয়ে ভাবনায় পড়ে যাবেন। অনেকের মতে এসব তরুন উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত প্রশিক্ষন এবং সহজ শর্তে আর্থিক প্রনোদনার আওতায় নিয়ে আসতে পারলে এক অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হতে পারে। নতুবা দীর্ঘ সময় অপচয়ের ফলে নতুন দিগন্তে ফেরার দারুন ঘোরপাকে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠি হয়ত একদিন চরম স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখিন হবে সে দিন আর খুব বেশি দুরে নয়।