দাম্পত্য জীবনের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং সমাধান

আকদ করার পর স্ত্রীকে বিয়ের পর নিজের বাড়ি তুলে না নিয়ে স্ত্রীর বাবার বাড়ীতে দীর্ঘ দিন রেখে দেয় বিভিন্ন কারনবশত।এতে পরবর্তীতে কয়েকটা সমস্যা দেখা দিতে পারে

দাম্পত্য জীবনের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং সমাধান
ছবিঃ ফেরদৌস নাহার

ফেরদৌস নাহারঃ আপনি নতুন বিয়ে করেছেন।আর্থিক অস্বচ্ছলতা বা যে কোন কারনেই হোক আপনি বিয়ে করে বউকে বউয়ের বাবার বাড়ী রেখে দিয়েছেন অথবা পড়াশোনা শেষ করার জন্য বাবার বাড়ী রেখে দিয়েছেন। এরপর যা ঘটে অনেকের জীবনে...

বিয়ের আগে একটা মেয়ে যেভাবে স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করে, বিয়ের পর সে তেমনটা স্বাধীন জীবন চাইলেই পাবেনা। এটা একজন নারীকে মানতেই হবে। কিন্তু বর্তমানে বিয়ে হবার পর বছর না পেরুতেই সংসার ভেঙে যাচ্ছে। এমনও দেখা যাচ্ছে বিয়ের পর পর সংসার আলাদা করার অর্থাৎ শ্বশুর শাশুড়ি থেকে স্ত্রী আলাদা থাকতে চাইছে। এটা কেন?
 
আকদ করার পর স্ত্রীকে বিয়ের পর নিজের বাড়ি তুলে না নিয়ে স্ত্রীর বাবার বাড়ীতে দীর্ঘ দিন রেখে দেয় বিভিন্ন কারনবশত। এতে পরবর্তীতে কয়েকটা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন -

১.স্ত্রী যদি শহুরে মেয়ে হয় তবে সে তার জন্মস্থান  পরিবর্তন করতে চাইতে নাও পারে।
২.পড়াশোনা জন্য অনেকে বিয়ের পর বাবার বাড়ীতে দীর্ঘদিন থাকার পর শ্বশুরবাড়ি দায়িত্ব নিতে অনেকে আলসেমি অথবা ভয়ে থাকে।
৩.ভার্চুয়্যাল জীবনে কিছু সঙ্গদোষে বিবাহিত জীবনটাকে বাক্স বন্দি এমনটা ব্রেইনওয়াশ করানো হয়।
৪.কিছু নারী আছেন যারা কোন কারণ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে অবাধ্য মনে করেন নিজেকে।

 একজন স্বামীর যা করণীয়:

★আপনার স্ত্রী যদি পড়াশোনার খাতিরে বিয়ের পর বাবার বাড়ী থাকে তবে আপনার উচিত বিয়ের আগেই অভিভাবকসহ পরিকল্পনা করে পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে কোথায় স্যাটেলম্যান্ট হবে। যাতে বিয়ের পর আপনার স্ত্রী যেকোন পরিস্থিতিতে শ্বশুরবাড়ীতে আসতে বাধ্য থাকে। আপনার স্ত্রীকে পড়াতে চান, আপনি চান আপনার স্ত্রী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সুযোগ দেয়ার পর আপনার স্ত্রী আপনার শহরে আপনার পরিবারের সাথে থাকবে কিনা তা বিয়ের আগেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করুন। কারণ পরবর্তীতে এমন কিছু হলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এতে দুই পরিবারে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
 
★স্ত্রীকে যদি বাবার বাড়ী রেখে পড়াশোনা করান তাহলে মাঝে মাঝে বিভিন্ন অকেশনে নিজের বাড়ী নিয়ে আসুন। নিজের পরিবার আত্মীয় স্বজনের সাথে মিশতে দিন।এতে আপনার স্ত্রীরও পরবর্তীতে স্থায়ীই ভাবে আসলে নিজেকে নতুন পরিবেশে মানাতে সমস্যা হবেনা।বরং তাকে কিছু দায়িত্ব বুঝিয়ে দিন সংসারের।

★আপনার স্ত্রী পড়াশোনা চলাকালীন তার বন্ধু বান্ধব সম্পর্কে খোঁজ নিন।এমন কারো সাথে চলতে নিষেধ করুন যার সঙ্গদোষে আপনার স্ত্রী অবাধ্য হতে পারে।

★রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ কর। কেননা তাদেরকে পাঁজরের হাড্ডি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড্ডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা হল উপরেরটি। সুতরাং তুমি যদি তা সোজা করতে যাও তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি একেবারে ছেড়ে দাও তাহলে বাঁকাই থেকে যাবে। তাই স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ কর।’-সহীহ বুখারী ও মুসলিম

আরেকটি হাদীসে আছে,"তুমি যদি স্ত্রীকে সোজা করতে যাও তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে। আর ভাঙ্গার অর্থ তাকে তালাক প্রদান করা। -সহীহ মুসলিম

এবার স্বামীদের সম্পর্কে কিছু কথা বলবো আমার বোনদের:
এমন বহু স্বামী আছে যারা গুরুতর কোন কারণ ছাড়া বিভিন্ন অজুহাতে বিয়ের পর স্ত্রীকে স্ত্রীর বাবার বাড়ী বছরের পর বছর ফেলে রাখে।স্ত্রীকে ঠিকমত ভরণপোসন দেয়না।যোগাযোগ রাখেনা।এমনকি স্বামীর পরিবার থাকতেও তাদের কাছে স্ত্রীকে রাখেনা।আমি এমন একজনকে দেখেছি যার বিয়ে হয়েছিল ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও কলে।মেয়েটাকে এক প্রবাসী ভিডিও কলে বিয়ে করে ফেলে রেখেছে।তাকে নিয়মিত ভরণপোসণ তো দিতোই না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই ৪ বছর পার হয়ে গেল স্বামীর সাথে একবারও স্ত্রীর দেখা হয়নি।একটা সময় মেয়েকে শ্বশুরবাড়ী তুলে নেয়ার জন্য ছেলের পরিবারকে চাপ দিলে তারা অসম্মতি জানায় এবং প্রয়োজনে ডিভোর্স দিতে বলে মেয়েকে।অবশেষে ডিভোর্স হয়ে যায়।

আপনার অভিভাবক হয়ে এতো বড় ভুল কেন করেন?যার মাশুল আপনার সন্তানকে দিতে হয়? ভাল পাত্র হাত ছাড়ার ভয়ে এমন অনেক অভিভাবক অাছেন যারা ছেলে সম্পর্কে খোঁজ ভাল করে না নিয়ে না দেখে মোবাইল,ভাইবার,হোয়াটস আপে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন।তারপর ছেলে মেয়েকে প্রবাসে নিয়ে যাবে সেই অাশায় থেকে বছরের পর বছর মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখেন।এমন সিদ্ধান্ত আপনার মেয়ের জীবনের জন্য কতোটা ঝুকিপূর্ণ তা আপনার বুঝেও বুঝেন না।

সেক্ষেত্রে স্ত্রীর করণীয়:

★স্বামীর পরিবারের সাথে সবসময় যোগাযোগ করুন।যদি তারা আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে নিতে চায় তব একটা সময় নির্দিষ্ট করুন।বিয়ের পর দেখা যাক, হতে পারে এমন চুক্তিপত্রে রাজি হবেন না।

★স্বামী ভরণপোষন দিতে না চাইলে অাইনের ব্যবস্থা নিতে পারেন।

★পারিবারিক ভাবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শ্বশুর বাড়ী গিয়ে উঠুন।স্বামী আসুক বা না আসুক।আপনি আপনার হক স্বামীর বাড়ী গিয়েও আদায় করতে পারেন।

★প্রয়োজনে পড়াশোনা শ্বশুর বাড়ী গিয়ে করুন।

★চরিত্রহীনা নারী চরিত্রহীন পুরুষের জন্য, আর চরিত্রহীন পুরুষ চরিত্রহীনা নারীর জন্য। সৎ চরিত্রবতী নারী সৎ চরিত্রবান পুরুষের জন্য, আর সৎ চরিত্রবান পুরুষ সৎ চরিত্রবতী নারীর জন্য।

—আল কুরআন (সূরা আন-নুর, আয়াত ২৬)

অভিভাবকদের করণীয়:

★ ছেলে অথবা মেয়ের জীবন সঙ্গী খুঁজতে তাড়াহুড়া করবেন না।
★ছেলে মেয়ে দুজনের মতামত নিয়ে বিবাহ দিন।
★ছেলে মেয়ে দুজনকেই বিয়ের পরের জীবন এবং দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত করুন।
★দুই পরিবারের মাঝে যোগাযোগ রাখুন।
★ভার্চুয়্যাল জীবনের সাথে তাল মিলিয়ে অথবা অতি আধুনিকতার ছোঁয়ায় ছেলে মেয়েকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিয়ে দেবেন না।
★ছেলে মেয়ে সম্পর্কে ভাল করে খোঁজ খবর নিন।

মনে রাখবেন,স্বামী স্ত্রী মানেই একটি পারিবারিক ব্যবস্থার মধ্যে অঙ্গিকারবদ্ধ।স্বামী স্ত্রী একে অপরকে উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি থাকলেও প্রাধান্য দেবেন।একে অপরের প্রশংসা পাবার যোগ্য হোন।তবেই সুখি হবেন সাংসারিক জীবনে।