কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে : এক সপ্তাহে নিহত-৭ 

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে : এক সপ্তাহে নিহত-৭ 
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার, ২০ জুন।। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপকহারে বেড়েছে গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে হতাহতের ঘটনা। গত একসপ্তাহে ৯ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়েছেন ২১ ব্যক্তি। গত মাসের শেষ পনের দিনে ঘটেছে এমন আরও ১১টি দুর্ঘটনা।

সোমবার (২০জুন) সকাল ৮টার দিকে কক্সবাজার টেকনাফ হাইওয়ে সড়কে কাভার ভ্যানের ধাক্কায় টমটম গাড়ি’র দু’জন যাত্রী ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন এবং এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৪জন।
কক্সবাজার-টেকনাফ হাইওয়ে সড়ক হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকার সামনে এ দু’ঘটনা ঘটে। নিহত দু’জনই বাস্তচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক।
তারা হলেন, উনচিপ্রাং ২২নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মৃত আব্দুল গফুরের পুত্র আমির হামজা(৫০) ও একই ক্যাম্পের মো. ইদ্রিসের মেয়ে ইসমত আরা বেগম(১০)।
এরআগে ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় পিকআপের ধাক্কায় একই পরিবারের ৬ সহোদর ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
নিহতরা পিতার মৃত্যুর দশম দিন ধর্মীয় রীতিনীতি পালন শেষে ফেরার পথে চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
গত কয়েক দিনে সড়ক দূর্ঘটনার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত ১৭জুন রাত ৯ টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সালওয়া রেস্টুরেন্টের সামনে চট্টগ্রামমুখি মোটরসাইকেল আরোহী মারুফুল ইসলাম (২৪)কে যাত্রীবাহি হানিফ পরিবাহণের একটি বাস চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এসময় ঘটনাস্থলেই মারা যায় চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কনস্টেবল মারুফ।
এর দুদিন আগে ১৫ জুন দিবাগত রাত ২টার দিকে চকরিয়া পৌরশহরের চিরিংগা কাঁচা রাস্তার মাথাস্থ বক্স রোডে মালবাহি ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী মো.ফরহাদ (২৫) নামের এক ব্যবসায়ী নিহত হয়।
গত ১৫ জুন পুটিবিলায় অভ্যন্তরীণ সড়কে বেপরোয়া ডাম্পট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিক্সা আরোহী শিশুসহ ২ জন ঘটনাস্থলে নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ৪ জন।
গত ১৬ জুন মহাসড়কের চুনতিতে দুই যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
১৭ জুন সদর ইউনিয়নের পুরাতন থানা গেট এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে দুই ব্যাটারি চালিত রিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪ জন আহত হয়েছেন।
গত ১৩ জুন সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হারবাং বুড়ির দোকান এলাকায় চট্টগ্রামুখি একটি পিকআপ বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী লেগুনার উপর তুলে দেয়। এসময় লেগুনা সড়কের পাশে খাদে উল্টে গিয়ে চালক ঘটনাস্থলে লেগুনার চালক মো.নোমান (২০) নিহত হয়।

গত ১২ জুন আমিরাবাদ ইউনিয়নের সিমেন্ট মিক্সার মেশিন বহনকারী গাড়ির সঙ্গে মিনিট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ জন গুরুতর আহত হন। গত ১৩ জুন সদর ইউনিয়নের পুরাতন থানা গেইটের দক্ষিণ পাশে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সর্বশেষ গত ১৮ জুন ভোররাতে বটতলী স্টেশনে ট্রাক ও নোয়াহ গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে এক পরিচ্ছন্ন কর্মী গুরতর আহত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। এরমধ্যে একইমুখী-বিপরীতমুখী গাড়ির সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক থেকে ছিটকে পড়া, পথচারীকে চাপা দেয়াসহ নানাভাবে ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি বহু মানুষ আহত হচ্ছেন। দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে যেসব কারণ পরিলক্ষিত হয় তাহল- চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, হেল্পারকে দিয়ে গাড়ি চালানো, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতা, ওভারটেকিং, দীর্ঘক্ষণ বিরতিহীন গাড়ি চালানো, জনবহুল এলাকাসহ দূরপাল্লার সড়কে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, সড়কের উপর গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করা, অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, মহাসড়কে ধীর গতির ছোট যানবাহন চলাচল, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে গাড়ি চলাচল, সড়কের দু’পাশে অনেকগুলো হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া প্রতিবছর সংস্কারের ফলে মহাসড়কের দু’পাশে অসমান অংশের দূরত্ব বৃদ্ধিও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

পরিবহণ শ্রমিক নেতা ও কক্সবাজার মোটর ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক নুরুল আমিন জানান, দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালকের বেপরোয়া গতি। দুর্ঘটনার আরও একটি অন্যতম কারণ হলো, ঘুমের ঘোরে গাড়ি চালানো। বিশ্রাম ব্যতীত গাড়ি চালানোর ফলে তাদের চোখে অনেক সময় ঘুম চলে আসে। ফলে ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা।চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ হলেও নিয়মের তোয়াক্কা না করে চলছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এ ছাড়া নছিমন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন চলে এ সড়কে। অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে চলে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
মহাসড়ক ছাড়াও জেলার উপসড়কের মধ্যে
চকরিয়া-বদরখালী সড়ক, পেকুয়া-চকরিয়া সড়ক, ঈদগাঁও-চৌফলদন্ডী সড়ক, গোমাতলী-ইসলামপুর সড়ক, রামু থেকে কালিরছড়া থেকে চকরিয়া হারবাং পর্যন্ত মহাসড়কের অবস্থা খুবই বিপজ্জনক। 
চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে হারবাং, বরইতলী, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী ও ইসলামপুর ইউনিয়নের বিশাল এলাকা মহাসড়কের মধ্যে পড়েছে। এসব ইউনিয়নের ৩০ টি স্পটে সড়ক দখল করে দৈনিক বাজার বসার কারণে গাড়ি চলাচলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও মহাসড়কের উভয় পাশে ফুটপাতে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ ঝুপড়ি দোকান। 
প্রায় সময় দূরপাল্লার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ছোট গাড়িগুলো প্রধান সড়কে চলাচলে নিষিদ্ধ করলেও এসবের তোয়াক্কা করছে না গাড়ি চালকরা। এছাড়াও পর্যটন শহর কক্সবাজারে গাড়ি আসাও ব্যাপকহারে বাড়ছে। এসব কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, বৃষ্টিপাত, অপ্রশস্ত মহাসড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, ওভারটেকিং, অপ্রশিক্ষিত চালক, বেপরোয়া গতি ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা চালকদের এই সড়ক সম্পর্কে ধারণা না থাকা ইত্যাদি কারণে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ (ওসি) ইমন কান্তি নাথ জানান, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কিছু স্থানে আঁকা-বাঁকা সড়ক, অতিরিক্ত বাঁক, সরুপথ, অদক্ষ চালক ও ছোট সড়কগুলোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। 
তিনি আরও জানান,হাইওয়ে থানার উদ্যোগে প্রতি মাসে চালক ও সহকারীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভার আয়োজন চলমান আছে। এছাড়া দুর্ঘটনারোধে বিভিন্ন সময় চালকদের মাঝে সচেতনামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়। মহাসড়কে ধীরগতির নিষিদ্ধ গাড়ির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ জানান, পর্যায়ক্রমে মহাসড়কের মূল অংশের সাথে অসমান অংশ মাটি দ্বারা ভরাট করা হবে। এছাড়া মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে।