দেশ-বিদেশে আলোচিত ইসলামী ব্যক্তিত্বঃ মুহাম্মাদ আবদুল মান্নান (পর্ব-১)

দেশ-বিদেশে আলোচিত ইসলামী ব্যক্তিত্বঃ মুহাম্মাদ আবদুল মান্নান  (পর্ব-১)
ছবিঃ সংগৃহীত

আল্লামা আবদুর রহমান আস-সুদাইস: আবদুর রহমান ইবনে আবদুল আজিজ আস-সুদাইস সৌদি আরবের আনাজ্জাহ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬০ সালে। তিনি সৌদি আরবের প্রধান মসজিদ ‘মাসজিদুল হারাম’ এর ইমাম। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় পবিত্র স্থান পবিত্র কাবা শরিফকে ঘিরে এটি অবস্থিত। দুবাই আন্তর্জাতিক হলি কোরআন অ্যাওয়ার্ড থেকে ২০০৫ সালে তিনি সেরা ইসলামিক ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হন।

আল-সুদাইস সন্ত্রাসবাদ নিরাময়ে করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি ইসলাম বিরোধীদের কাছে বোমা হামলা এবং সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে ভুল ধারণা খণ্ডন করেছেন। তিনি শান্তিপূর্ণ আন্ত:ধর্ম সংলাপেরও আয়োজন করেছেন। মাত্র বারো বছর বয়সেই তিনি সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে ফেলেন। তার কৌশর কাটে রিয়াদে। রিয়াদ সায়েন্টিফিক ইনস্টিটিউশন থেকে তিনি স্নাতক এবং পরবর্তীতে ইসলামিক শরিয়াহর ওপর ডক্টরেট করেন।
আল্লামা ড. মোহাম্মদ তাহেরুল কাদেরী: ড. আল্লামা মোহাম্মদ তাহেরুল কাদেরীকে অন্যতম মুসলিম ধর্মীয় নেতা বলে মানা হয়। তিনি শাইখুল ইসলাম নামেও বহুল পরিচিত। তাঁর ভক্তগন তাঁকে কিবলা হুজুর বলে অভিহিত করেন।  বহুগুণের অধিকারী এই ইসলামিক ব্যক্তিত্ব একই সঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ, সুবক্তা, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টারিয়ান। 

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। যৌবনেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি। আশির দশকে শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান মিনহাজুল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০২ সালে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর কিছু বছর  টরন্টোতে কাটানোর পর ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নিজ দেশে পাকিস্তানে ফিরে আসেন। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন।
শাইখ আল্লামা হুসাইন ইয়ে: হুসাইন ইয়ে একজন বিখ্যাত চীনা বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান ইসলামিক পণ্ডিত এবং ইসলামী বক্তা। ১৯৫০ সালে চিনে একটি বৌদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও ১৯৬৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তিনি সৌদি আরবের মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদিস বিভাগে অধ্যয়ন করেন। 

এ সময় তিনি বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানীর অধীনে পড়াশোনা করার সুযোগ পান। ১৯৭৮ সালে স্নাতক হওয়ার পর তিনি মালয়েশিয়া ফিরে আসেন এবং মুসলিম কল্যাণ সংস্থায় যোগদান করেন। এই সংস্থাটি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিতদের কল্যাণে কাজ করে আসছে। পরবর্তীতে তিনি হংকংয়ের একটি ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আল্লামা জয়নুল আবেদীন  জুবাইর: আল্লামা জয়নুল আবেদীন জুবাইর ১৯৬০ইং সালের ১ মার্চ লক্ষীপুর জেলার সদর থানার অন্তর্গত মুসলিমাবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন । নাম- অধ্যক্ষ আল্লামা মুহাম্মাদ জয়নুল আবেদীন জুবাইর, পিতা- মরহুম আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা, মাতা মরহুমা আনোয়ারা বেগমের ৫ ছেলে ও ৫ মেয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয় সন্তান ।


১৯৬৬ সালে রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরিকত আওলাদে রাসুল (দ:) হাফেজ ছৈয়দ আহমদ শাহ ছিরিকোটি (রহঃ) প্রতিষ্ঠিত পাঁচলাইশ ষোলশহরস্থ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নীয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে জীবনের বারটি বছর তাঁর এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা জীবন অতিবাহিত করেন  আল্লামা জুবাইর।
১৯৭৮সালে স্কলারশিপসহ কামিল (হাদিছ) পরিক্ষায় তিনি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ণের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনারেল হিস্ট্রিতে বি.এ. (অনার্স) ও মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জণ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে চন্দ্রঘোনা জামেয়া অদুদীয়া সুন্নীয়া মাদরাসায় আরবী প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৮৮ ইং সন পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। মাঝখানে ১ বছর তিনি আঞ্জুমানে রহমানীয়া আহমদিয়া সুন্নীয়া পরিচালনাধীন হালিশহর তৈয়্যবীয়া ইসলামীয়া সুন্নীয়া মাদরাসায় সুপারিন্টেনডেন্ট ছিলেন।
১৯৮৯ইং সালে চট্টগ্রাম নেছারিয়া কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন। ২০১১ ইং সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি অবসরে আছেন।  তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আগ্রাবাদ সি.ডি.এ-১ আ/এ জামে মসজিদের খতিব হিসেবে ১৯৮৫ সন থেকে অদ্যাবদি খেদমত করে যাচ্ছেন।

বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সেবামুলক প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা লক্ষ্যনীয়। তিনি চট্টগ্রাম মা-শিশু জেনারেল হসপিটালের আজীবন সদস্য। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৮৯ সালে ইসলামী যুবসেনায় যোগদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম মহানগরী ইসলামী ফ্রন্ট সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে নিয়োগ পান আল্লামা জুবাইর । ওই বছর কেন্দ্রীয় আহবায়ক কমিটির সদস্যও পদ লাভ করেন। তিনি  বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রথম কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব হিসেবে ২০০০ সাল নাগাদ প্রায় ১০ বছর সংগঠনের প্রচার-প্রসার ও পরিব্যাপ্তিতে অবদান রাখেন তিনি।

২০০১ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে সংগঠনের মধ্যবর্তী কাউন্সিলে তিনি যুগ্ম-মহাসচিব নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে সংগঠনের নাম ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ -এ রূপান্তরিত হলে তিনি কেন্দ্রীয় মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

কুরআন-সুন্নাহর সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবীতে সুসংঘবদ্ধ আন্দোলনকে গণমনে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মাওলানা জুবাইর এর অবদান অবিস্মরণীয়। বাগ্গী, সদালাপী, সহনশীল, পরমতসহিষ্ণু, রুচিশীল এবং মানোত্তীর্ণ এক সংগঠক হিসেবে সংগঠনের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মাঝে তিনি দারুণভাবে সমাদৃত। দলমত নির্বিশেষে এ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে একজন সফল, নন্দিত, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক হিসেবে তাদের আন্তরিক ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি।

বিশেষত যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ প্রাঞ্জল ভাষার সাবলীল বক্তৃতা তাঁকে বাংলাদেশে

সুন্নীয়তের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অনলবর্ষী বক্তা ও বাগ্মী নেতা হিসেবে সুখ্যাতি দিয়েছে। ২০০৪ সালে থেকে অদ্যাবদি তিনি চট্টগ্রাম জমিয়তুল ফালাহ ময়দানসহ দেশের সর্বত্র বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে পবিত্র কুরআন মাহফিলে ধারাবাহিক কুরআনের দরস(পাঠ) দিয়ে আসছেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আল্লামা জুবাইর সাহেব তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে প্রকাশনা জগতকেও দারুনভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর গবেষণাধর্মী অসংখ্য প্রবন্ধ, সুন্নীয়তের আকিদাগত বিষয়ের উপর প্রণীত ও অনুদিত বই পুস্তক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে লিখিত নিবন্ধ, সর্বোপরি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জন্য প্রণীত আন্দোলনের সহায়ক বই-পুস্তক ও আক্বিদা বিষয়ক তাঁর লিখিত ও অনুধিত অসংখ্য কিতাব সর্বস্তরের মানুষের কাছে সর্বাধিক সমাদৃত। [ চলবে]

লেখক: মুহাম্মাদ আবদুল মান্নান,

সম্পাদক, চট্টগ্রাম ট্রিবিউন